ইরান-যুক্তরাষ্ট্র সংঘাত
ইরান যুদ্ধে ব্যয় করা মার্কিন অর্থে প্রাণ বাঁচত ৮ কোটি ৭০ লাখ মানুষের: জাতিসংঘ
জাতিসংঘের মানবিক সহায়তাবিষয়ক সংস্থার (ওসিএইচএ) প্রধান টম ফ্লেচার বলেছেন, ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানের বিরুদ্ধে তার ‘বেপরোয়া’ যুদ্ধে প্রতি সপ্তাহে যে ২০০ কোটি ডলার ব্যয় করছেন, তা দিয়ে ৮ কোটি ৭০ লাখেরও বেশি মানুষের প্রাণ বাঁচানো সম্ভব ছিল।
স্থানীয় সময় সোমবার (২০ এপ্রিল) লন্ডনের চ্যাথাম হাউসে দেওয়া এক বক্তৃতায় সাবেক ব্রিটিশ কূটনীতিক ও একাধিক প্রধানমন্ত্রীর পররাষ্ট্র নীতিবিষয়ক উপদেষ্টা ফ্লেচার এ কথা বলেন।
ফ্লেচারের বরাত দিয়ে দ্য গার্ডিয়ানের এক প্রতিবেদনে বলা হয়, ‘ইরানকে বোমা মেরে প্রস্তর যুগে পাঠিয়ে দেওয়ার’ হুমকির মতো সহিংস ভাষার স্বাভাবিকীকরণ অত্যন্ত বিপজ্জনক। কারণ এটি প্রতিটি ‘সম্ভাব্য স্বৈরাচারীকে’ একই ধরনের হুমকি এবং কৌশল ব্যবহারে উৎসাহিত করে।
এ সময় ব্রিটিশ রাজনীতিবিদদেরও সমালোচনা করেছেন তিনি। ফ্লেচারের অভিযোগ, ব্রিটিশ রাজনীতিবিদরা গত ১০ বছরেরও বেশি সময় ধরে নিজেদের মধ্যে কাদা ছোঁড়াছুড়িতে লিপ্ত যা যুক্তরাজ্যকে একটি ‘রক্ষণাত্মক অবস্থানে’ ফেলে দিয়েছে।
তিনি বলেন, যুক্তরাজ্যের বৈদেশিক সাহায্য খাতে কাটছাঁট এতটাই ভয়াবহ ছিল যে, এখন বিভিন্ন সম্মেলনে যখন যুক্তরাজ্য এই বিষয়ে নিজেদের ‘নেতৃস্থানীয়’ বলে দাবি করে, তখন উপস্থিতরা মুচকি হাসে।
মানবিক বিষয় ও জরুরি ত্রাণবিষয়ক আন্ডার-সেক্রেটারি-জেনারেল এবং ওসিএইচএর প্রধান ফ্লেচার বর্তমানে মানবিক সহায়তা তহবিলের চরম সংকটের সঙ্গে লড়াই করছেন। তিনি একে ‘বিপর্যয়কর’ হিসেবে বর্ণনা করেছেন, কারণ তার বাজেট ৫০ শতাংশ কমানো হয়েছে।
তিনি জানান, এটি কেবল যুক্তরাষ্ট্রের কারণে নয়, বরং আদর্শগত কারণ এবং প্রতিরক্ষা বাজেটের চাহিদার সংমিশ্রণে আন্তর্জাতিকভাবে বৈদেশিক সাহায্যে যে কাটছাঁট করা হয়েছে, তারই ফল।
ফ্লেচার বলেন, ইরানের যুদ্ধের প্রভাব বিশ্বজুড়ে অনুভূত হচ্ছে। খাদ্য ও জ্বালানি মুদ্রাস্ফীতি ২০ শতাংশের কাছাকাছি পৌঁছানোর পূর্বাভাস দিয়ে তিনি বলেন, সাব-সাহারা আফ্রিকা এবং পূর্ব আফ্রিকায় আমরা আগামী কয়েক বছর এর প্রভাব অনুভব করব, যা আরও বহু মানুষকে দারিদ্র্যের দিকে ঠেলে দেবে।
ফ্লেচার বলেন, এই যুদ্ধের প্রতিটি দিনের জন্য ২০০ কোটি ডলার ব্যয় করা হচ্ছে। অথচ ৮ কোটি ৭০ লাখ মানুষের প্রাণ বাঁচানোর জন্য আমার তৈরি করা ‘অত্যন্ত অগ্রাধিকারমূলক পরিকল্পনা’র পুরো লক্ষ্যমাত্রা হলো ২ হাজার ৩০০ কোটি ডলার। এই বেপরোয়া যুদ্ধের দুই সপ্তাহের কম সময়ের খরচ দিয়ে আমরা সেই অর্থায়ন করতে পারতাম। কিন্তু এখন আমরা তা পারছি না।
তিনি আরও বলেন, হঠাৎ করেই এই ধারণাটি স্বাভাবিক হয়ে গেছে যে ‘আমরা সবকিছু উড়িয়ে দেব, আমরা তোমাদের বোমা মেরে প্রস্তর যুগে পাঠিয়ে দেব, তোমাদের সভ্যতা ধ্বংস করে দেব’। এই ধরনের ভাষার স্বাভাবিকীকরণকে বিপজ্জনক বলে উল্লেখ করেন তিনি।
তিনি বলেন, এটি বিশ্বের অন্যান্য স্বৈরাচারী হতে চাওয়া ব্যক্তি, যারা আন্তর্জাতিক আইন সম্পূর্ণ লঙ্ঘন করে বেসামরিক অবকাঠামো এবং বেসামরিক নাগরিকদের লক্ষ্যবস্তু বানায়, তাদের এই ধরনের ভাষা এবং কৌশল ব্যবহার করতে আরও সুযোগ করে দেয়।
ট্রাম্প প্রশাসনের সঙ্গে জাতিসংঘের সম্পর্ককে একটি ‘চরম অনিশ্চয়তা বা রোলারকোস্টার রাইড’ হিসেবে বর্ণনা করেন ফ্লেচার। তবে তিনি বলেন, ‘মার্কিন প্রেসিডেন্টের টিমকে এটি বোঝাতে কিছুটা সফল হয়েছি যে জাতিসংঘ কেবল একদল অযোগ্য, অকেজো ও ক্লান্ত আমলাদের আস্তানা নয়।’
যুক্তরাষ্ট্র প্রশাসনের সমালোচনা করে ওসিএইচএর প্রধান বলেন, রাষ্ট্র পরিচালনা এবং আবাসন ব্যবসা পরিচালনার মধ্যে পার্থক্য রয়েছে। আমি ট্রাম্প প্রশাসনে যাদের সঙ্গে কাজ করছি, তাদের বেশিরভাগই আবাসন ব্যবসা থেকে আসা। বিশ্বের প্রতি তাদের দৃষ্টিভঙ্গি ভিন্ন।
রাষ্ট্র পরিচালনার সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিরা সব কাজ শেষ করার পর প্রক্রিয়ার শেষে করমর্দন করে। কিন্তু আবাসন ব্যবসার সঙ্গে যুক্তরা আগে করমর্দন করে দেখে যে ‘আমি কি এই ব্যক্তিকে বিশ্বাস করতে পারি?’ এবং তারপর বলে ‘চলুন চুক্তি করি’... এটি ব্যক্তিগত সম্পর্কের ওপর অনেক বেশি গুরুত্ব দেয়। তারা প্রতিষ্ঠানের প্রতি কম আগ্রহী, তাই জাতিসংঘের পতাকা নিয়ে প্রবেশ করলে তা আপনাকে খুব একটা সাহায্য করবে না।
তিনি আরও বলেন, রাষ্ট্র পরিচালনার সঙ্গে আমরা যারা যুক্ত, তারা নিশ্চয়তা, স্থিতিশীলতা এবং প্রক্রিয়া পছন্দ করি। আমাদের প্রোটোকল, মানচিত্র এবং পতাকার দিকে তাকালেই তা বোঝা যায়। আমরা শৃঙ্খলা পছন্দ করি, কিন্তু ট্রাম্প প্রশাসনের ধারণা, বিশৃঙ্খলা বেশি কার্যকর। তারা মনে করে অনিশ্চয়তা, প্রতিপক্ষ ও বন্ধুকে অপ্রস্তুত করে দেওয়ার মাধ্যমে তারা বেশি ফলাফল পান। আমরা দেখব শেষ পর্যন্ত কী হয়।
ফ্লেচার বলেন, ট্রাম্প যদি ১৪টি যুদ্ধ শেষ করেন, তবে তাকে এর জন্য নোবেল শান্তি পুরস্কার দেওয়া হোক; তবে কেবল কথা না বলে কাজগুলো আসলে শেষ করা প্রয়োজন।
তিনি আরও জানান, গর্ভপাত বা ট্রান্সজেন্ডার অধিকারের মতো বিষয়গুলোতে যদি নতুন কোনো শর্ত জুড়ে দেওয়া হয়, তবে মার্কিন সহায়তা গ্রহণ করবেন কি না—এই সিদ্ধান্ত নিতে গিয়ে তিনি রাতে ঘুমাতে পর্যন্ত পারছেন না।
তিনি বলেন, প্রশ্ন হলো, সেই শর্ত মেনে আমরা কি সেই টাকা নেব, এটা জেনেও যে তা লাখ লাখ মানুষের প্রাণ বাঁচাবে? নাকি নেব না? শর্ত মেনে নেওয়ার কোনো ইচ্ছে আমার নেই।
ফ্লেচারের দাবি, যুদ্ধোত্তর আন্তর্জাতিক কাঠামোটি ক্রমাগত আক্রমণের শিকার হচ্ছে এবং জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদ সম্পূর্ণরূপে মেরুকৃত। তার ভাষ্য, আমরা এখন একটি লেনদেনমূলক ভূ-রাজনৈতিক মুহূর্তে রয়েছি যেখানে সদস্য দেশগুলো নিরাপত্তা পরিষদকে এমন একটি যন্ত্র হিসেবে দেখে না যার মাধ্যমে তাদের বিশ্ব শান্তির জন্য কাজ করা উচিত।
বাজেট কাটছাঁটের ফলে এর প্রভাব বিশাল হবে মন্তব্য করে তিনি বলেন, আমি যদি কোনো সংস্থা বা এজেন্সির প্রধান হতাম এবং আমার ৫০ বিলিয়ন ডলারের সংস্থাটি যদি এই বছর ২০ বিলিয়ন ডলারে নেমে আসত, তবে সম্ভবত এতক্ষণে আমি বরখাস্ত হতাম।
আমার পরিসংখ্যানগুলো সুখকর নয়। একদিকে অর্থ কমে আসছে, অন্যদিকে প্রয়োজন বেড়ে বাড়ছে। এটি মূলত ব্যর্থতার একটি ধরন, তাই আমাদের ভিন্ন কিছু করতে হবে।
যদিও তিনি স্বীকার করেছেন যে মার্কিন কাটছাঁট অসামঞ্জস্যপূর্ণভাবে কঠিন ছিল (কারণ অতীতে তারা তহবিলের ৪০ শতাংশ থেকে ৪৫ শতাংশ সরবরাহ করত), তবে পুরো ইউরোপজুড়েই এ সাহায্য কমছে।
বিগত সময়ে মোট জাতীয় আয়ের শূন্য দশমিক ৭ শতাংশ বৈদেশিক সাহায্যে ব্যয় করার বিষয়ে যুক্তরাজ্যের যে প্রতিশ্রুতি ছিল, সে প্রসঙ্গে তিনি বলেন, যুক্তরাজ্যের জন্য কয়েক দশক ধরে এ ব্যয় করার বিষয়টি ছিল একটি পবিত্র দলীয় প্রতিশ্রুতি যা গত কয়েক বছরে ধুলোয় মিশে গেছে।
তিনি বলেন, এই কাটছাঁট যুক্তরাজ্যের সামগ্রিক বাজেটের তুলনায় খুবই সামান্য, কিন্তু এর ফলে অসামঞ্জস্যপূর্ণভাবে মানুষের প্রাণহানি ঘটবে। কারণ যুক্তরাজ্যের এই সিদ্ধান্ত অন্যান্য দেশকেও একই অজুহাত দেওয়ার সুযোগ করে দেয়।
যুক্তরাজ্য প্রসঙ্গে তিনি আরও বলেন, যুক্তরাজ্য এখন নিজেদের মধ্যে বিবাদে লিপ্ত এবং গত ১০ বছর ধরে এটিই চলছে। একপর্যায়ে তাদের এই রক্ষণাত্মক অবস্থা থেকে বেরিয়ে আসতে হবে।
তিনি উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেন যে, ২০১৬ সাল থেকে যুক্তরাজ্যের প্রকৃত সম্পদ যেমন: ত্রাণকার্যে নেতৃত্ব, বিবিসি, সৃজনশীল শিল্প, প্রভাব বিস্তারের ক্ষমতা এবং সামরিক শক্তির মতো জায়গাগুলো ধ্বংস করার প্রবণতা দেখা যাচ্ছে।
তিনি আরও বলেন, যেখানে আমাদের বিনয়ী হওয়া উচিত, সেখানে আমরা অতিরিক্ত আত্মবিশ্বাসী এবং যেখানে আমাদের আত্মবিশ্বাসী হওয়া উচিত, সেখানে আমরা অতিরিক্ত বিনয়ী হওয়ার প্রবণতা দেখাই। তবে এই মুহূর্তে শান্তভাবে দক্ষতা দেখানোই শ্রেয় বলে মন্তব্য করেন তিনি।
মানবতাকর্মীদের সুরক্ষার বিষয়ে তিনি বলেন, গত তিন বছরে ১ হাজার জনেরও বেশি কর্মী নিহত হয়েছেন যাদের মধ্যে অনেকেই ড্রোন হামলার শিকার।
ফ্লোচার বলেন, আমরা হচ্ছি জরুরি সেবা সংস্থা, আমরা ফায়ার ইঞ্জিন বা অ্যাম্বুলেন্সকর্মীর মতো যারা বেঁচে যাওয়া মানুষদের সাহায্য করতে যাই। কিন্তু কেন জানি এটি এখন এমনই গ্রহণযোগ্য হয়ে গেছে যে আমাদের বিপুল সংখ্যায় হত্যা করা হচ্ছে। আবার যারা আমাদের হত্যা করছে, তাদের কোনো জবাবদিহিতাও নেই।
নিরাপত্তা পরিষদের এক সদস্যকে উদ্দেশ্য করে তিনি বলেন, আমাদের কেবল সাধারণ কোনো বিবৃতি দেবেন না যে ‘মানবিক কর্মীদের সুরক্ষা দেওয়া উচিত’, বরং ফোন তুলুন। যারা আমাদের মারছে, তাদের নাম ধরে ডাকুন; যারা এই কাজ করছে, তাদের অস্ত্র দেওয়া বন্ধ করুন।
১১ দিন আগে
ইরানের সঙ্গে আলোচনায় সোমবার পাকিস্তানে যাচ্ছে মার্কিন প্রতিনিধিদল: ট্রাম্প
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প জানিয়েছেন, ইরানের সঙ্গে আলোচনার লক্ষ্যে সোমবার মার্কিন প্রতিনিধি দল পাকিস্তানের উদ্দেশ্যে রওনা হবে। হরমুজ প্রণালি ইস্যুতে ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যে অচলাবস্থা অব্যাহত থাকলেও এই সফরের খবরে চলতি সপ্তাহে শেষ হতে যাওয়া যুদ্ধবিরতির মেয়াদ বৃদ্ধি নিয়ে নতুন করে আশার সঞ্চার হয়েছে।
সম্ভাব্য এই আলোচনার বিষয়টি তাৎক্ষণিকভাবে নিশ্চিত করেনি তেহরান। এদিকে, বর্তমানে হরমুজ প্রণালির মতো গুরুত্বপূর্ণ জলপথে জাহাজ চলাচল কার্যত বন্ধ রয়েছে। একদিকে ইরানের হামলার হুমকি, অন্যদিকে ইরানি বন্দরে যাতায়াতকারী জাহাজের ওপর যুক্তরাষ্ট্রের অবরোধ—সব মিলিয়ে পরিস্থিতি অত্যন্ত জটিল হয়ে পড়েছে।
এর আগে, রবিবার ইরানি কর্মকর্তারা জানান, তারা আলোচনার জন্য প্রস্তুত। তবে, মার্কিন নৌ-অবরোধ বহাল থাকা অবস্থায় হরমুজ প্রণালি দিয়ে কোনো জাহাজ চলাচল করতে দেওয়া হবে না।
শনিবার রাতে দেশটির রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে ইরানের পার্লামেন্ট স্পিকার মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফ বলেন, ‘আমরা নিজেরা (প্রণালি দিয়ে) চলাচল করতে না পারলে অন্যদের জন্য হরমুজ প্রণালি উন্মুক্ত করা সম্ভব নয়।’
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নতুন দফা আলোচনার ঘোষণা দেওয়ার সময় ট্রাম্প অভিযোগ করেন, ইরান প্রণালি দিয়ে চলাচলকারী জাহাজে গুলি চালিয়ে যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘন করেছে।
তিনি হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, ইরান যদি যুক্তরাষ্ট্রের দেওয়া প্রস্তাব গ্রহণ না করে, তবে দেশটির বেসামরিক অবকাঠামো ধ্বংস করা হবে। ট্রাম্প লেখেন, ‘তারা যদি চুক্তি না করে, তবে যুক্তরাষ্ট্র ইরানের প্রতিটি বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্র এবং সেতু গুঁড়িয়ে দেবে।’
তবে ইসলামাবাদে দ্বিতীয় দফার এই সরাসরি আলোচনায় যুক্তরাষ্ট্রের কোন কোন কর্মকর্তা অংশ নেবেন, সে বিষয়ে বিস্তারিত জানাননি ট্রাম্প। প্রথম দফার আলোচনায় নেতৃত্ব দিয়েছিলেন মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স। হোয়াইট হাউস বা ভ্যান্সের কার্যালয় থেকেও এ বিষয়ে কোনো মন্তব্য পাওয়া যায়নি।
পারমাণবিক সমৃদ্ধকরণ কর্মসূচি, আঞ্চলিক মিত্রগোষ্ঠী এবং হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণ—এই অমীমাংসিত বিষয়গুলোর কারণে প্রথম দফার আলোচনা ভেস্তে গিয়েছিল। এসব বিষয়ে দুই পক্ষ তাদের অবস্থানে কোনো পরিবর্তন এনেছে কি না, তা এখনও স্পষ্ট নয়।
ট্রাম্পের সর্বশেষ মন্তব্যের আগেই ইরানের প্রধান আলোচক গালিবাফ বলেন, অবরোধ এবং ওয়াশিংটনের প্রতি গভীর অবিশ্বাস থাকা সত্ত্বেও শান্তি চায় তেহরান। তবে কূটনীতির ক্ষেত্রে কোনো পশ্চাদপসরণ হবে না বলেও সতর্ক করেন তিনি।
লেবাননে ইসরায়েল ও ইরান-সমর্থিত হিজবুল্লাহর মধ্যে ১০ দিনের যুদ্ধবিরতি কার্যকর হওয়ার পর শুক্রবার প্রণালিটি পুনরায় খুলে দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছিল ইরান। কিন্তু ট্রাম্প যখন ঘোষণা দেন, কোনো চূড়ান্ত চুক্তিতে না পৌঁছানো পর্যন্ত ইরানের ওপর মার্কিন অবরোধ ‘পুরোদমে বহাল থাকবে’, তখন ইরানও জানায় যে তারা প্রণালিতে নিজেদের বিধিনিষেধ বহাল রাখবে।
শনিবার সাময়িকভাবে জাহাজ চলাচলের চেষ্টা হলেও দুটি ভারতীয় পতাকাবাহী জাহাজে গুলি চালানোর পর অন্য জাহাজগুলো পারস্য উপসাগরে নিজেদের অবস্থানে ফিরে যায়। এর ফলে হরমুজ প্রণালিতে আবারও অচলাবস্থা তৈরি হয়। এটি বৈশ্বিক জ্বালানি সংকটকে আরও ঘনীভূত করার পাশাপাশি পক্ষগুলোকে নতুন করে সংঘাতের দিকে ঠেলে দিচ্ছে।
যুদ্ধবিরতির মেয়াদ শেষ হতে আর মাত্র কয়েক দিন বাকি। এর মধ্যেই শনিবার ইরান জানিয়েছে, তারা যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে নতুন কিছু প্রস্তাব পেয়েছে এবং পাকিস্তানি মধ্যস্থতাকারীরা আগামী কয়েক দিনের মধ্যে সরাসরি আলোচনার আয়োজন করতে কাজ করছেন।
দ্বিতীয় দফার আলোচনা ঘিরে আবারও ইসলামাবাদে নিরাপত্তা জোরদার করা হয়েছে। মধ্যস্থতা প্রক্রিয়ার সঙ্গে যুক্ত এক আঞ্চলিক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানিয়েছেন, প্রস্তুতির কাজ শেষ পর্যায়ে এবং যুক্তরাষ্ট্রের একটি অগ্রবর্তী নিরাপত্তা দল ইতোমধ্যেই সেখানে পৌঁছেছে।
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে আলোচনা চলাকালেই যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ইরানে হামলা শুরু করে। তার পর থেকেই হরমুজ প্রণালির ওপর নিয়ন্ত্রণকে ইরান তাদের সবচেয়ে বড় অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করছে। তেহরানের জন্য এটি বিশ্ব অর্থনীতি ও ট্রাম্পের ওপর রাজনৈতিক চাপ সৃষ্টির অন্যতম হাতিয়ার। অন্যদিকে, ইরানকে চাপে ফেলতে অবরোধ দিয়ে দেশটির অর্থনীতিকে পঙ্গু করে দেওয়ার কৌশল অবলম্বন করছে যুক্তরাষ্ট্র।
যুদ্ধবিরতি এখনও টিকে থাকলেও হরমুজ প্রণালিকে কেন্দ্র করে এই অচলাবস্থা আবারও পুরো অঞ্চলকে যুদ্ধের দিকে ঠেলে দিতে পারে। এই যুদ্ধে এখন পর্যন্ত ইরানে অন্তত ৩ হাজার জন এবং লেবাননে ২ হাজার ২৯০ জনেরও বেশি মানুষ নিহত হয়েছেন। এছাড়া ইসরায়েলে ২৩ জন এবং উপসাগরীয় আরব দেশগুলোতে আরও বেশ কয়েকজন প্রাণ হারিয়েছেন। যুদ্ধে এ পর্যন্ত ১৫ জন ইসরায়েলি এবং ১৩ জন মার্কিন সেনা নিহত হওয়ারও খবর পাওয়া গেছে।
নতুন চুক্তির পথে অগ্রগতির চেষ্টায় পাকিস্তান
হরমুজ প্রণালিকে কেন্দ্র করে নতুন করে সৃষ্ট অচলাবস্থার কয়েক ঘণ্টা আগে পাকিস্তানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ইসহাক দার বলেন, তার দেশ যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে মতপার্থক্য ‘দূর করার’ চেষ্টা করছে।
রবিবার ট্রাম্পের সর্বশেষ পোস্টের আগে ইরানের সর্বোচ্চ জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদ জানায়, পাকিস্তানের সেনাপ্রধানের ইরান সফরের সময় যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে দেওয়া ‘নতুন প্রস্তাব’ তারা পর্যালোচনা করছে।
তবে সাইদ খাতিবজাদেহ স্পষ্ট করেছেন যে, ইরান তাদের ৪৪০ কেজি সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম যুক্তরাষ্ট্রের কাছে হস্তান্তর করবে না এবং এ ধারণাকে তিনি ‘শুরু করার মতো কোনো বিষয়ই নয়’ বলে অভিহিত করেন। এ সময় ইউরেনিয়াম-সংক্রান্ত অন্যান্য প্রস্তাব নিয়ে তিনি মন্তব্য করতে রাজি না হলেও বলেন, ‘যেকোনো উদ্বেগ নিয়ে আলোচনা করতে আমরা প্রস্তুত।’
১৩ দিন আগে
ট্রাম্প ও তেহরানের অদূরদর্শী প্রচারণায় থমকে গেছে শান্তি প্রক্রিয়া
মার্কিন প্রেডিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং তেহরানের পক্ষ থেকে একের পর এক অদূরদর্শী ও অবিবেচনাপ্রসূত বার্তার কারণে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে শান্তি চুক্তির পথে অর্জিত অগ্রগতি থমকে গেছে।
এই ভুল পদক্ষেপগুলোর চূড়ান্ত পরিণতি হিসেবে ইরান ঘোষণা করেছে যে, তারা হরমুজ প্রণালি দিয়ে বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচলের ওপর পুনরায় সম্পূর্ণ অবরোধ আরোপ করবে। দেশটি তাদের উচ্চমাত্রার সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের কোনো অংশই দেশের বাইরে রপ্তানি করতে দেবে না।
দ্য গার্ডিয়ানের এক প্রতিবেদনে বলা হয়, ঘটনাপ্রবাহের সূত্রপাত হয় গত শুক্রবার। সেদিন যুক্তরাষ্ট্রের বাজার খোলার পরপরই ইরানি পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে একটি পোস্ট দেন। তিনি লিখেছিলেন, লেবাননে যুদ্ধবিরতির সঙ্গে সঙ্গতি রেখে ইসলামি প্রজাতন্ত্র ইরানের বন্দর ও সমুদ্রবিষয়ক সংস্থা কর্তৃক পূর্বঘোষিত সমন্বিত রুট অনুযায়ী যুদ্ধবিরতির বাকি সময়ের জন্য হরমুজ প্রণালি দিয়ে সকল বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল সম্পূর্ণ উন্মুক্ত ঘোষণা করা হলো।
তার এই ঘোষণার ফলে প্রতি ব্যারেল তেলের দাম এক ধাক্কায় ১২ ডলার কমে যায়। দুপক্ষকে ফের আলোচনার টেবিলে নেওয়ার চেষ্টায় থাকা পাকিস্তানও এই পদক্ষেপকে স্বাগত জানায়। যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আলোচনার জন্য ইরানের শর্তাবলি নির্ধারণের লক্ষ্যে ইসলামাবাদের কর্মকর্তারা তিন দিন ধরে তেহরানে অবস্থান করছিলেন।
দ্য গার্ডিয়ানের কূটনীতিক সম্পাদক প্যাট্রিক উইন্টুরের ভাষ্য, আরাগচির পোস্টটি সম্ভবত ভুলভাবে সাজানো অথবা অসম্পূর্ণ ছিল, যা ইরানে তীব্র প্রতিক্রিয়ার জন্ম দেয়। পরিস্থিতিকে আরও শোচনীয় করে তোলে তেলের দরপতন এবং ডোনাল্ড ট্রাম্পের পক্ষ থেকে খবরটিকে অতিরঞ্জিতভাবে ব্যাখ্যা করা। ট্রাম্প ইরানকে ধন্যবাদ জানিয়ে দাবি করেন, হরমুজ প্রণালি খুলে দিতে এবং তাদের ইউরেনিয়ামের মজুদ যুক্তরাষ্ট্রে পাঠাতে রাজি হয়েছে তেহরান।
ইরানের ভেতরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কেউ কেউ দাবি করেছেন যে, আরাগচির পোস্টটি বাজার নিয়ন্ত্রণের উদ্দেশ্যে দেওয়া হয়েছিল। ইরানি সংসদ সদস্য মোর্তজা মাহমুদী বলেন, যুদ্ধ পরিস্থিতি না থাকলে আরাগচিকে তার এই অসময়ের বক্তব্যের জন্য অভিশংসনের মুখোমুখি হতে হতো।
১৩ দিন আগে
হরমুজ প্রণালি আবারও বন্ধ ঘোষণা ইরানের
যুক্তরাষ্ট্রের অবরোধ বহাল থাকায় কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালিতে আবারও নৌযান চলাচলে নিষেধাজ্ঞা আরোপের ঘোষণা দিয়েছে ইরান। তেহরান জানিয়েছে, ইরানের বন্দরগুলোর ওপর যুক্তরাষ্ট্রের অবরোধ অব্যাহত থাকা পর্যন্ত এই গুরুত্বপূর্ণ জলপথ দিয়ে নৌযান চলাচল বন্ধ রাখা হবে।
এর এক দিন আগেই (শুক্রবার) বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচলের জন্য প্রণালিটি খুলে দিয়েছিল ইরান। তবে শনিবার যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ঘোষণার পর পাল্টে যায় তাদের অবস্থান।
ট্রাম্প বলেন, তেহরান যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে, বিশেষ করে তার পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে চুক্তিতে না পৌঁছানো পর্যন্ত অবরোধ ‘পূর্ণমাত্রায় বহাল থাকবে’।
তবে ট্রাম্পের ঘোষণার পর ইরানের যৌথ সামরিক কমান্ড জানায়, হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণ আগের অবস্থায় ফিরে এসেছে... এবং এটি সশস্ত্র বাহিনীর কঠোর ব্যবস্থাপনা ও নিয়ন্ত্রণে রয়েছে।
তারা আরও জানায়, ইরানের বন্দরগুলোর ওপর যুক্তরাষ্ট্রের অবরোধ বহাল থাকা পর্যন্ত প্রণালিতে নৌযান চলাচল বন্ধ রাখা হবে।
বিশ্বের মোট তেলের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ এই প্রণালি দিয়ে পরিবাহিত হয়। ফলে এতে অতিরিক্ত বিধিনিষেধ আরোপ বৈশ্বিক সরবরাহে আরও চাপ সৃষ্টি করতে পারে এবং তেলের দাম আবারও বাড়তে পারে। লেবাননে ইসরায়েল ও ইরান-সমর্থিত হিজবুল্লাহর মধ্যে ১০ দিনের যুদ্ধবিরতি কার্যকর হয়েছে বলে যখন ধারণা করা হচ্ছে, তার মধ্যেই এই গুরুত্বপূর্ণ জলপথ খোলার ঘোষণা দিয়েছিল ইরান।
অন্যদিকে, উত্তেজনা বাড়লেও পাকিস্তানি কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, ২২ এপ্রিলের যুদ্ধবিরতির সময়সীমার আগে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান এখনও একটি চুক্তির দিকে অগ্রসর হচ্ছে।
চলমান সংঘাতে ইরানে অন্তত ৩ হাজার জন, লেবাননে প্রায় ২ হাজার ৩০০ জন, ইসরায়েলে ২৩ জন এবং উপসাগরীয় আরব দেশগুলোতে ডজনখানেকের বেশি মানুষ নিহত হয়েছে। এছাড়া ১৩ জন মার্কিন সেনাসদস্যও নিহত হয়েছেন।
১৪ দিন আগে
ইসরায়েল নয়, ‘আমেরিকা ফার্স্ট’ নীতিতে যুক্তরাষ্ট্রের মনোযোগ দেওয়া উচিত: ইরান
ইরানের প্রথম ভাইস প্রেসিডেন্ট মোহাম্মদ রেজা আরিফ বলেছেন, ইসলামাবাদে চলমান মার্কিন-ইরান উচ্চপর্যায়ের আলোচনার ফলাফল সম্পূর্ণভাবে নির্ভর করছে যুক্তরাষ্ট্রের অগ্রাধিকারের ওপর।
শনিবার (১১ এপ্রিল) আল জাজিরার বরাত দিয়ে পাকিস্তানের সংবাদমাধ্যম ডন এ তথ্য জানিয়েছে।
আরিফ সামজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে লিখেছেন, যদি মার্কিন প্রতিনিধিরা তাদের ‘আমেরিকা ফার্স্ট’ (আগে আমেরিকা) নীতির দিকে মনোনিবেশ করেন, তবে একটি পারস্পরিক সুবিধাজনক চুক্তিতে পৌঁছানো সম্ভব।
তিনি আরও বলেন, তবে, যদি আমরা ‘ইসরায়েল ফার্স্ট’ (আগে ইসরায়েল) নীতি অনুসরণকারী প্রতিনিধিদের মুখোমুখি হই, তবে কোনো চুক্তি হবে না। সেক্ষেত্রে আমরা অনিবার্যভাবে আগের চেয়ে আরও জোরালোভাবে আমাদের প্রতিরক্ষা বজায় রাখব এবং বিশ্ব আরও বড় ধরনের ক্ষতির সম্মুখীন হবে।
যুদ্ধবিরতি নিয়ে টেলিভিশনে ভাষণ না দেওয়ার সিদ্ধান্ত হোয়াইট হাউসের
এদিকে, তিনজন মার্কিন কর্মকর্তা জানিয়েছেন, ইরানের সঙ্গে যুদ্ধবিরতি চুক্তি নিয়ে গত মঙ্গলবার প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের একটি জাতীয় টেলিভিশন ভাষণ দেওয়ার কথা ভাবা হলেও শেষ পর্যন্ত তা বাতিল করেছে হোয়াইট হাউস। এর কারণ হিসেবে জানা গেছে, ট্রাম্পের কিছু সহকারী ও উপদেষ্টা ব্যক্তিগতভাবে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন যে, প্রাথমিক পর্যায়ের চুক্তিটি নিয়ে এখনই অতিরিক্ত প্রচারণা হিতে বিপরীত হতে পারে।
সূত্রগুলো জানায়, ট্রাম্পকে এই ভাষণ না দেওয়ার জন্য বুঝিয়ে রাজি করানো হয়েছিল। তবে হোয়াইট হাউস এক বিবৃতিতে এই আলোচনার বিষয়টি অস্বীকার করে বলেছে, এটি একটি ভুয়া খবর। প্রেসিডেন্টের সঙ্গে এ ধরনের কোনো বিষয় নিয়ে কখনোই আলোচনা হয়নি।
এই সিদ্ধান্তটি ট্রাম্প প্রশাসনের এক ধরনের ভারসাম্য রক্ষার প্রচেষ্টাকেই ইঙ্গিত করে। প্রশাসন একদিকে লড়াই থামানো এবং হরমুজ প্রণালি খুলে দেওয়ার এই চুক্তির বিষয়ে আত্মবিশ্বাস দেখাতে চেয়েছিল, আবার অন্যদিকে উপদেষ্টারা আলোচনার ব্যর্থতা সম্পর্কেও সচেতন ছিলেন। ট্রাম্পের এই জাতীয় ভাষণের আলোচনার বিষয়টি এর আগে সংবাদমাধ্যমে আসেনি।
২১ দিন আগে
শান্তি আলোচনার উদ্দেশ্যে পাকিস্তানে পৌঁছেছেন জেডি ভ্যান্স
ইরানি কর্মকর্তাদের সঙ্গে আলোচনার মাধ্যমে অস্থিতিশীল যুদ্ধবিরতি রক্ষা এবং স্থায়ীভাবে যুদ্ধ বন্ধের পথ প্রশস্ত করতে মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্সের নেতৃত্বে একটি প্রতিনিধিদল পাকিস্তানে পৌঁছেছে। গত ফেব্রুয়ারিতে যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর এটিই এ ধরনের প্রথম বৈঠক।
শনিবার (১১ এপ্রিল) থেকে শুরু হওয়া পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় এই যুদ্ধবিরতি আলোচনা বেশকিছু বাধার সম্মুখীন হয়েছে। কারণ, দক্ষিণ লেবানন সীমান্তে ইসরায়েল ও হিজবুল্লাহর মধ্যে পাল্টাপাল্টি বোমাবর্ষণ অব্যাহত রয়েছে এবং ইরান আলোচনার আগে কিছু শর্ত জুড়ে দিয়েছে।
শনিবার ভোরে ইরানের প্রতিনিধিদলটি দেশটির পার্লামেন্ট স্পিকার মোহাম্মদ বাঘের কালিবাফের নেতৃত্বে ইসলামাবাদে পৌঁছায়। কালিবাফ এক্সে জানিয়েছেন, লেবাননে ইসরায়েলের যুদ্ধবিরতি এবং ইরানের আটকে থাকা সম্পদ ফেরত দিলেই কেবল আলোচনা সম্ভব।
কয়েক ঘণ্টা আগে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ভ্যান্সের সাফল্য কামনা করে বলেন, দেখা যাক কী হয়। ওরা (ইরান) সামরিকভাবে পরাজিত।
আজ (শনিবার) ইসলামাবাদের ব্যস্ত সড়কগুলো জনশূন্য ছিল। কারণ আলোচনার আগে পাকিস্তানের নিরাপত্তাবাহিনী রাস্তাগুলো বন্ধ করে দিয়েছে।
মার্কিন প্রতিনিধি দলকে স্বাগত জানিয়েছে পাকিস্তান
পাকিস্তানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, পররাষ্ট্রমন্ত্রী ইসহাক দার, সেনাপ্রধান ফিল্ড মার্শাল আসিম মুনির এবং স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মহসিন নকভি মার্কিন প্রতিনিধিদল ও ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্সকে অভ্যর্থনা জানিয়েছেন।
ইসহাক দার আঞ্চলিক শান্তি ও স্থিতিশীলতায় মার্কিন প্রতিশ্রুতির প্রশংসা করেন। তিনি আশা প্রকাশ করেন যে, পক্ষগুলো গঠনমূলকভাবে আলোচনায় বসবে। সেই সঙ্গে সংঘাতের একটি স্থায়ী ও টেকসই সমাধানের লক্ষ্যে প্রচেষ্টা সহজতর করার জন্য পাকিস্তানের আকাঙ্ক্ষা পুনর্ব্যক্ত করেন তিনি।
লেবাননে ইসরায়েলি হামলায় নিহত ৩
লেবাননের রাষ্ট্রীয় সংবাদ সংস্থা জানিয়েছে, দক্ষিণ লেবাননের নাবাতিহ প্রদেশের মাইফাদুন শহরে একটি আবাসিক ভবনে ইসরায়েলি বিমান হামলায় অন্তত ৩ জন নিহত হয়েছেন।
অন্যদিকে, হিজবুল্লাহ উত্তর ইসরায়েলের একটি সামরিক স্থাপনা লক্ষ্য করে রকেট ছোড়ার দাবি করেছে।
ইসলামাবাদে জেডি ভ্যান্সের আগমন
জেডি ভ্যান্সের নেতৃত্বাধীন প্রতিনিধি দলে রয়েছেন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের বিশেষ দূত স্টিভ উইটকফ এবং জামাতা জ্যারেড কুশনার।
পাকিস্তানে রওনা হওয়ার আগে ইরানকে সতর্ক করে ভ্যান্স বলেছিলেন, তারা যেন আমেরিকার সঙ্গে খেলা না করে।
জবাবে কালিবাফ শর্ত দিয়েছেন যে, লেবাননে যুদ্ধবিরতি না হলে আলোচনা হবে না।
অন্যদিকে, ইরানি প্রতিনিধিদলটির আজ দুপুরে প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফের সঙ্গে সাক্ষাৎ করার কথা রয়েছে।
এর আগে, শুক্রবার রাতে তারা সেনাপ্রধান আসিম মুনিরের সঙ্গে বৈঠক করেছেন। এই উচ্চপর্যায়ের আলোচনার মূল লক্ষ্য হলো মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধের স্থায়ী সমাপ্তি ঘটানো।
অত্যাধুনিক মিডিয়া সেন্টার স্থাপন
পাকিস্তানের তথ্যমন্ত্রী আতাউল্লাহ তারার জানিয়েছেন, ইসলামাবাদে অনুষ্ঠিত শান্তি আলোচনা প্রচার করতে আসা দেশি-বিদেশি সাংবাদিকদের জন্য জিন্নাহ কনভেনশন সেন্টারে উচ্চগতির ইন্টারনেটসহ একটি অত্যাধুনিক মিডিয়া সেন্টার স্থাপন করা হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান থেকে আসা সাংবাদিক ও কর্মকর্তাদের জন্য ‘ভিসা-অন-অ্যারাইভাল’ সুবিধাও ঘোষণা করেছে পাকিস্তান।
যুদ্ধ বন্ধের এই আলোচনার আগে ইসলামাবাদের রাস্তাঘাট পুরোপুরি জনশূন্য। কর্তৃপক্ষ বাসিন্দাদের বাড়ির ভেতরে থাকার পরামর্শ দেওয়ায় শহরটিতে অনেকটা কারফিউর মতো পরিবেশ বিরাজ করছে।
পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ বলেছেন, সংঘাতটি একটি কঠিন পর্যায়ে প্রবেশ করছে। কারণ পক্ষগুলো লড়াইয়ের সাময়িক বিরতি থেকে একটি আরও স্থায়ী সমাধানের দিকে এগোচ্ছে। তিনি এই সময়টিকে ‘হয় জয়, না হয় পরাজয়’ হিসেবে বর্ণনা করেছেন।
২১ দিন আগে
ইরানে বিমান হামলায় ২৫ জনের বেশি নিহত, নতুন যুদ্ধবিরতি প্রস্তাব ঘিরে উত্তেজনা
ইসরাইল ও যুক্তরাষ্ট্র ইরানের ওপর আবারও একাধিক হামলা চালিয়েছে। এসব ঘটনায় ২৫ জনের বেশি নিহত হয়েছে। হামলার জবাবে ইসরাইল ও তার উপসাগরীয় আরব প্রতিবেশীদের দিকে ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করেছে ইরান।
স্থানীয় সময় সোমবার (৬ মার্চ) এ হামলা চালানো হয়েছে বলে জানিয়েছে ইরানের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম।
আজ (সোমবার) সকাল থেকে তেহরানে বিস্ফোরণের শব্দ শোনা গেছে এবং ঘণ্টার পর ঘণ্টা নিচু দিয়ে উড়তে থাকা যুদ্ধবিমানের বিকট শব্দ শোনা যাচ্ছিল। রাজধানীর শরিফ ইউনিভার্সিটি অব টেকনোলজি এলাকার আজাদি স্কয়ারের কাছে বিমান হামলার কারণে ঘন কালো ধোঁয়ার কুণ্ডলী পাকিয়ে উঠতে দেখা যায়।
হামলায় বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসের একটি ভবন এবং পাশের একটি প্রাকৃতিক গ্যাস বিতরণ স্থাপনায় ক্ষয়ক্ষতির খবর দিয়েছে ইরানের গণমাধ্যম। অবশ্য, যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান অনলাইনে পরিচালিত হওয়ায় বিশ্ববিদ্যালয়ে কোনো শিক্ষার্থী ছিল না।
বিশ্ববিদ্যালয় প্রাঙ্গণে ঠিক কী লক্ষ্যবস্তু করা হয়েছে, তাৎক্ষণিকভাবে সে বিষয়ে স্পষ্ট হওয়া যায়নি। তবে অতীতে সামরিক কার্যক্রম, বিশেষ করে ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচিতে সংশ্লিষ্টতার অভিযোগে বিভিন্ন দেশ প্রতিষ্ঠানটিকে নিষেধাজ্ঞার আওতায় রেখেছিল। এই কর্মসূচি নিয়ন্ত্রণ করে দেশটির আধাসামরিক বাহিনী ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস।
এদিকে, ইরানের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম ও ইসরাইলের প্রতিরক্ষামন্ত্রীর তথ্য অনুযায়ী, আজকের এই হামলায় নিহতদের মধ্যে ইরানের আধাসামরিক বিপ্লবী গার্ডের গোয়েন্দা প্রধান মেজর জেনারেল মাজিদ খাদেরমিও ছিলেন।
খাদেরমির মৃত্যুর বিষয়টি নিশ্চিত করে ইসরায়েলের প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইসরায়েল কাটজ শীর্ষ ইরানি কর্মকর্তাদের লক্ষ্য করে হামলা অব্যাহত রাখার ঘোষণা দিয়েছেন। তিনি বলেন, ‘ইরানের নেতারা এখন নিজেদের লক্ষ্যবস্তু মনে করছেন। আমরা একে একে তাদের খুঁজে বের করব।’
এ ছাড়াও তেহরানের দক্ষিণ-পশ্চিমে এসলামশাহর এলাকায় একটি হামলায় অন্তত ১৫ জন নিহত হয়েছেন বলে জানিয়েছে স্থানীয় কর্তৃপক্ষ। পাশাপাশি কোম শহরের একটি আবাসিক এলাকায় হামলায় আরও অন্তত ৫ জন নিহত হয়েছেন। অন্যান্য শহরে হামলায় অন্তত ৬ জনের মৃত্যু হয়েছে বলে জানিয়েছে রাষ্ট্রীয় দৈনিক ডেইলি ইরান।
তেহরানের একটি বাড়িতে বিমান হামলায় আরও ৩ জন নিহত হয়েছেন বলে জানিয়েছে দেশটির রাষ্ট্রীয় টেলিভিশন।
অন্যদিকে, এ ঘটনার পর ইরান উত্তর ইসরাইলের হাইফা শহরে ক্ষেপণাস্ত্র দ্বারা পাল্টা হামলা চালালে একটি আবাসিক ভবনের ধ্বংসস্তূপ থেকে দুজনের মরদেহ উদ্ধার করা হয় এবং আরও দুজনের খোঁজে তল্লাশি চালানো হয়।
তেহরান তার উপসাগরীয় প্রতিবেশী দেশগুলোর ওপর চাপ অব্যাহত রেখেছে। ফলে কুয়েত, সংযুক্ত আরব আমিরাত এবং সৌদি আরব তাদের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা আরও বেশি সক্রিয় করে ইরানের নিক্ষিপ্ত ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন প্রতিহত করছে।
বর্তমানে আঞ্চলিক জ্বালানি অবকাঠামোর ওপর ইরানের নিয়মিত হামলা এবং হরমুজ প্রণালির ওপর তার নিয়ন্ত্রণ বিশ্ববাজারে জ্বালানির দাম বাড়িয়ে দিয়েছে। উল্লেখ্য, এই অস্থিতিশীল অবস্থার আগে বিশ্বের এক-পঞ্চমাংশ তেলই পরিবাহিত হতো এই প্রণালি দিয়ে।
দেশের ভেতরে জ্বালানি তেলের ভোক্তাদের উদ্বেগ বাড়তে থাকায় চাপের মুখে ট্রাম্প তেহরানকে আজ (সোমবার) রাত পর্যন্ত একটি সময়সীমা বেঁধে দিয়েছেন। তিনি বলেন, যদি প্রণালি পুনরায় খোলার কোনো চুক্তি না হয়, তাহলে যুক্তরাষ্ট্র ইরানের বিদ্যুৎকেন্দ্র ও অন্যান্য অবকাঠামোতে হামলা চালাবেন এবং দেশটিকে ‘আদিম প্রস্তর যুগে’ ফিরিয়ে দেবেন।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ট্রাম্প হুমকি দিয়ে বলেন, ‘মঙ্গলবার হবে বিদ্যুৎকেন্দ্র দিবস এবং সেতু দিবস—সবই একসঙ্গে, ইরানে।’ তিনি আরও যোগ করেন, যদি ইরান প্রণালি না খোলে, তাহলে তারা নরকে বসবাস করবে।’
মধ্যপ্রাচ্যের দুই কর্মকর্তা ব্যক্তিগত আলোচনার বিষয় হওয়ায় নাম প্রকাশ না করার শর্তে অ্যাসোসিয়েটেড প্রেসকে জানিয়েছেন, সংঘাত থামানোর প্রচেষ্টায় মিসর, পাকিস্তান ও তুরস্কের মধ্যস্থতাকারীরা ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের কাছে একটি প্রস্তাব পাঠিয়েছে, যেখানে ৪৫ দিনের যুদ্ধবিরতি এবং হরমুজ প্রণালি পুনরায় খোলার আহ্বান জানানো হয়েছে। এই সময়ের মধ্যে যুদ্ধ বন্ধের উপায় খোঁজার জন্যও সময় পাওয়া যাবে।
কর্মকর্তারা আরও জানান, রবিবার গভীর রাতে পাঠানো এই প্রস্তাবে ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি এবং যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যপ্রাচ্য বিষয়ক দূত স্টিভ উইটকফকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। তবে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্র এখনও এই প্রস্তাবে সাড়া দেয়নি।
উল্লেখ্য, যুদ্ধ শুরুর পর থেকে ইরানে এখন পর্যন্ত ১ হাজার ৯০০ জনের বেশি মানুষের মৃত্যু হয়েছে, তবে কয়েকদিন ধরে সরকারিভাবে হালনাগাদ কোনো তথ্য দেওয়া হয়নি।
অন্যদিকে, লেবানন-এ স্থল অভিযান চালিয়ে ইসরায়েলি বাহিনীর হামলায় ১ হাজার ৪০০ জনের বেশি নিহত এবং ১০ লাখেরও বেশি মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছেন। সেখানে ইরান-সমর্থিত হিজবুল্লাহ যোদ্ধাদের লক্ষ্য করে অভিযানে ১১ জন ইসরায়েলি সেনাও নিহত হয়েছেন।
এছাড়া উপসাগরীয় আরব দেশগুলো ও অধিকৃত পশ্চিম তীরে দুই ডজনের বেশি মানুষ নিহত হয়েছেন। ইসরায়েলে ২৩ জন এবং যুক্তরাষ্ট্রের ১৩ জন সেনাসদস্য নিহত হওয়ার খবর পাওয়া গেছে।
২৬ দিন আগে
ইরান যুদ্ধে বৈশ্বিক কূটনীতিতে নেতৃত্ব দিতে চাইছে চীন
ইরান যুদ্ধ নিয়ে চীন তাদের কূটনৈতিক তৎপরতা জোরদার করেছে। পাকিস্তানের সঙ্গে যৌথভাবে পাঁচ দফা প্রস্তাব পেশ করা, উপসাগরীয় দেশগুলোর সমর্থন আদায় এবং হরমুজ প্রণালি খুলে দিতে জাতিসংঘে সামরিক শক্তি ব্যবহারের প্রস্তাবের বিরোধিতা করার মধ্য দিয়ে বেইজিং বিশ্বমঞ্চে নিজের অবস্থান আরও সংহত করতে চাইছে। তবে চীনের এই প্রচেষ্টায় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের খুব একটা আগ্রহ নেই বলেই মনে হচ্ছে।
ওয়াশিংটনভিত্তিক থিঙ্কট্যাঙ্ক স্টিমসন সেন্টারের চীন কর্মসূচির পরিচালক সান ইউন বলেন, ইরান যুদ্ধ বর্তমানে মধ্যপ্রাচ্যের ভেতরে ও বাইরে সকল দেশের জন্য অগ্রাধিকার। চীন তার নেতৃত্ব ও কূটনৈতিক সক্ষমতা প্রদর্শনের এই সুযোগটি হাতছাড়া করতে চাচ্ছে না।
তবে এশিয়া সোসাইটি পলিসি ইনস্টিটিউটের ফেলো ড্যানি রাসেল চীনের এই কূটনীতিকে ‘প্রদৰ্শনমূলক’ বলে অভিহিত করেছেন। তিনি ২০২৩ সালে ইউক্রেন যুদ্ধের জন্য চীনের দেওয়া ১২ দফা প্রস্তাবের সঙ্গে এর তুলনা করে বলেন, চীন দেখাতে চায় যে ওয়াশিংটন যেখানে বেপরোয়া ও আক্রমণাত্মক, সেখানে চীন শান্তি ও নীতির পক্ষে। আসলে আমরা যা দেখছি তা মধ্যস্থতা নয়, বরং নিজেদের একটি ইতিবাচক ভাবমূর্তি প্রচারের চেষ্টা।
ওয়াশিংটনে চীনা দূতাবাসের মুখপাত্র লিউ পেংইউ জানিয়েছেন, যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকেই বেইজিং শান্তির জন্য অক্লান্ত পরিশ্রম করে যাচ্ছে।
চীনের কূটনীতিকে যেভাবে দেখছে যুক্তরাষ্ট্র
মার্কিন কর্মকর্তাদের মতে, ট্রাম্প প্রশাসন চীনের মধ্যস্থতার বিষয়ে তেমন কোনো উৎসাহ দেখাচ্ছে না। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক তিনজন মার্কিন কর্মকর্তা জানিয়েছেন, মধ্যপ্রাচ্যে চীনের আন্তর্জাতিক মর্যাদা বৃদ্ধি পায় বা তারা কোনো সাফল্যের কৃতিত্ব পায়—এমন কোনো সুযোগ দিতে রাজি নয় ওয়াশিংটন।
চীন-পাকিস্তানের উদ্যোগে যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থানকে নিরপেক্ষ হিসেবে বর্ণনা করেছেন এক কর্মকর্তা। তবে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প যদি চীনা প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের সঙ্গে বৈঠকের আগে এ বিষয়ে মত দেন, তাহলে অবস্থান বদলাতে পারে।
বেইজিংয়ের জন্য মে মাসের মাঝামাঝি সময়ে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের চীন সফরের আগেই যুদ্ধ থামানো একটি বড় লক্ষ্য। যুদ্ধের কারণে ট্রাম্প তার মার্চের নির্ধারিত সফরটি ইতোমধ্যে পিছিয়ে দিয়েছেন।
সান ইউন বলেন, যুদ্ধ চলতে থাকলে ট্রাম্প আবারও যে তার চীন সফর পিছিয়ে দেবেন না, তার কোনো নিশ্চয়তা নেই।
হরমুজ প্রণালি বন্ধের প্রভাব ও চীনের অবস্থান
জ্বালানির উৎস বহুমুখীকরণ এবং জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর নির্ভরশীলতা কমানোর ফলে হরমুজ প্রণালি বন্ধ হওয়ার প্রভাবে অন্যান্য দেশের তুলনায় চীন বর্তমানে কিছুটা সুবিধাজনক অবস্থানে রয়েছে। চীন তার তেলের মাত্র ১৩ শতাংশ ইরানের কাছ থেকে আমদানি করে। এছাড়া তারা নিজস্ব কৌশলগত তেলের মজুদও বজায় রেখেছে।
বিশ্লেষকরা বলছেন, স্বল্প মেয়াদে সামলে নিলেও চীন দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধ নিয়ে উদ্বিগ্ন। কারণ দীর্ঘমেয়াদী জ্বালানি সংকট ও নৌ-চলাচল ব্যাহত হওয়া চীনের রপ্তানিনির্ভর অর্থনীতির জন্য ক্ষতির কারণ হতে পারে।
ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইসিস গ্রুপের যুক্তরাষ্ট্র-চীন সম্পর্কবিষয়ক জ্যেষ্ঠ গবেষণা ও পরামর্শক উপদেষ্টা আলি ওয়াইন বলেন, ট্রাম্প প্রশাসনের সুনির্দিষ্ট কৌশলের অভাব যখন স্পষ্ট হচ্ছে, তখন চীন এই সংকট নিরসনে নিজেকে সহায়তাকারী হিসেবে উপস্থাপনের সুযোগটি কাজে লাগাচ্ছে।
চীনের কূটনৈতিক তৎপরতা
যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে চীনা পররাষ্ট্রমন্ত্রী ওয়াং ই রাশিয়া, ওমান, ইরান, ফ্রান্স, ইসরায়েল, সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের সঙ্গে কথা বলেছেন। গত সপ্তাহে তিনি বেইজিংয়ে পাকিস্তানি পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে পাঁচ দফা প্রস্তাব নিয়ে আলোচনা করেন, যেখানে যুদ্ধ বন্ধ এবং হরমুজ প্রণালি পুনরায় খুলে দেওয়ার আহ্বান জানানো হয়েছে।
লিউ বলেছেন, তিনি আঞ্চলিক পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের সঙ্গে ২০টিরও বেশি ফোনালাপ করেছেন। শান্তি প্রতিষ্ঠা ও উত্তেজনা প্রশমনের লক্ষ্যে একজন বিশেষ দূত এই অঞ্চলের বেশ কয়েকটি দেশ সফর করেছেন।
চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, ওয়াং ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) পররাষ্ট্রনীতি প্রধান কায়া কাল্লাসের কাছে চীনের পরিকল্পনার জন্য সমর্থন চেয়েছেন এবং তাকে বলেছেন যে এটি ব্যাপক, আন্তর্জাতিক ঐকমত্যের প্রতিনিধিত্ব করে। ওয়াং সৌদির পররাষ্ট্রমন্ত্রী প্রিন্স ফয়সাল বিন ফারহানকে বলেছেন যে যুদ্ধ বন্ধ করাই সবচেয়ে জরুরি বিষয়।
আবার বাহরাইন কর্তৃক জাতিসংঘে উত্থাপিত ‘সামরিক শক্তি প্রয়োগ করে হরমুজ প্রণালি খোলার’ প্রস্তাবেরও বিরোধিতা করেছে চীন। এ বিষয়ে ওয়াং ই বলেন, জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের পদক্ষেপ উত্তেজনা কমানোর জন্য হওয়া উচিত, আগুনে ঘি ঢালার জন্য নয়।
কূটনৈতিক আলোচনা নিয়ে কথা বলার জন্য নাম প্রকাশ না করার শর্তে জাতিসংঘের একজন কূটনীতিক বলেন, চীন ও রাশিয়া যুক্তি দিয়েছে যে, যুক্তরাষ্ট্র বা অন্য কোনো দেশ জাতিসংঘ-সমর্থিত একটি ব্যবস্থাকে কাজে লাগিয়ে এই প্রাণঘাতী যুদ্ধকে আরও বাড়িয়ে তুলতে পারে।
উভয় দেশেরই প্রণালিটি পুরোপুরি খুলে দেওয়ার তেমন কোনো তাগিদ নেই বলেই মনে হচ্ছে। চীন যেখানে অর্থ দিয়ে তার কিছু জাহাজ পার করতে সক্ষম হয়েছে, সেখানে রাশিয়া তার প্রধান রপ্তানি পণ্য তেলের উচ্চমূল্য থেকে লাভবান হচ্ছে।
বেইজিং বলছে, যুদ্ধ বন্ধে একটি চুক্তি দরকার। তবে পাকিস্তানের সঙ্গে চীনের এই শান্তি পরিকল্পনা নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র এখন পর্যন্ত একপ্রকার নীরবই রয়েছে।
মার্কিন কর্মকর্তাদের একজন বলেছেন, এই পরিকল্পনাটি মূল্যায়ন করা কঠিন, কারণ এটি শান্তির একটি রূপরেখার চেয়ে আন্তর্জাতিক আইনের প্রতি সম্মান, কূটনীতির গুরুত্ব এবং জাতিসংঘের ভূমিকার প্রতি একটি অস্পষ্ট আবেদন মাত্র।
২৭ দিন আগে