ইসরাইল ও যুক্তরাষ্ট্র ইরানের ওপর আবারও একাধিক হামলা চালিয়েছে। এসব ঘটনায় ২৫ জনের বেশি নিহত হয়েছে। হামলার জবাবে ইসরাইল ও তার উপসাগরীয় আরব প্রতিবেশীদের দিকে ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করেছে ইরান।
স্থানীয় সময় সোমবার (৬ মার্চ) এ হামলা চালানো হয়েছে বলে জানিয়েছে ইরানের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম।
আজ (সোমবার) সকাল থেকে তেহরানে বিস্ফোরণের শব্দ শোনা গেছে এবং ঘণ্টার পর ঘণ্টা নিচু দিয়ে উড়তে থাকা যুদ্ধবিমানের বিকট শব্দ শোনা যাচ্ছিল। রাজধানীর শরিফ ইউনিভার্সিটি অব টেকনোলজি এলাকার আজাদি স্কয়ারের কাছে বিমান হামলার কারণে ঘন কালো ধোঁয়ার কুণ্ডলী পাকিয়ে উঠতে দেখা যায়।
হামলায় বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসের একটি ভবন এবং পাশের একটি প্রাকৃতিক গ্যাস বিতরণ স্থাপনায় ক্ষয়ক্ষতির খবর দিয়েছে ইরানের গণমাধ্যম। অবশ্য, যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান অনলাইনে পরিচালিত হওয়ায় বিশ্ববিদ্যালয়ে কোনো শিক্ষার্থী ছিল না।
বিশ্ববিদ্যালয় প্রাঙ্গণে ঠিক কী লক্ষ্যবস্তু করা হয়েছে, তাৎক্ষণিকভাবে সে বিষয়ে স্পষ্ট হওয়া যায়নি। তবে অতীতে সামরিক কার্যক্রম, বিশেষ করে ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচিতে সংশ্লিষ্টতার অভিযোগে বিভিন্ন দেশ প্রতিষ্ঠানটিকে নিষেধাজ্ঞার আওতায় রেখেছিল। এই কর্মসূচি নিয়ন্ত্রণ করে দেশটির আধাসামরিক বাহিনী ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস।
এদিকে, ইরানের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম ও ইসরাইলের প্রতিরক্ষামন্ত্রীর তথ্য অনুযায়ী, আজকের এই হামলায় নিহতদের মধ্যে ইরানের আধাসামরিক বিপ্লবী গার্ডের গোয়েন্দা প্রধান মেজর জেনারেল মাজিদ খাদেরমিও ছিলেন।
খাদেরমির মৃত্যুর বিষয়টি নিশ্চিত করে ইসরায়েলের প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইসরায়েল কাটজ শীর্ষ ইরানি কর্মকর্তাদের লক্ষ্য করে হামলা অব্যাহত রাখার ঘোষণা দিয়েছেন। তিনি বলেন, ‘ইরানের নেতারা এখন নিজেদের লক্ষ্যবস্তু মনে করছেন। আমরা একে একে তাদের খুঁজে বের করব।’
এ ছাড়াও তেহরানের দক্ষিণ-পশ্চিমে এসলামশাহর এলাকায় একটি হামলায় অন্তত ১৫ জন নিহত হয়েছেন বলে জানিয়েছে স্থানীয় কর্তৃপক্ষ। পাশাপাশি কোম শহরের একটি আবাসিক এলাকায় হামলায় আরও অন্তত ৫ জন নিহত হয়েছেন। অন্যান্য শহরে হামলায় অন্তত ৬ জনের মৃত্যু হয়েছে বলে জানিয়েছে রাষ্ট্রীয় দৈনিক ডেইলি ইরান।
তেহরানের একটি বাড়িতে বিমান হামলায় আরও ৩ জন নিহত হয়েছেন বলে জানিয়েছে দেশটির রাষ্ট্রীয় টেলিভিশন।
অন্যদিকে, এ ঘটনার পর ইরান উত্তর ইসরাইলের হাইফা শহরে ক্ষেপণাস্ত্র দ্বারা পাল্টা হামলা চালালে একটি আবাসিক ভবনের ধ্বংসস্তূপ থেকে দুজনের মরদেহ উদ্ধার করা হয় এবং আরও দুজনের খোঁজে তল্লাশি চালানো হয়।
তেহরান তার উপসাগরীয় প্রতিবেশী দেশগুলোর ওপর চাপ অব্যাহত রেখেছে। ফলে কুয়েত, সংযুক্ত আরব আমিরাত এবং সৌদি আরব তাদের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা আরও বেশি সক্রিয় করে ইরানের নিক্ষিপ্ত ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন প্রতিহত করছে।
বর্তমানে আঞ্চলিক জ্বালানি অবকাঠামোর ওপর ইরানের নিয়মিত হামলা এবং হরমুজ প্রণালির ওপর তার নিয়ন্ত্রণ বিশ্ববাজারে জ্বালানির দাম বাড়িয়ে দিয়েছে। উল্লেখ্য, এই অস্থিতিশীল অবস্থার আগে বিশ্বের এক-পঞ্চমাংশ তেলই পরিবাহিত হতো এই প্রণালি দিয়ে।
দেশের ভেতরে জ্বালানি তেলের ভোক্তাদের উদ্বেগ বাড়তে থাকায় চাপের মুখে ট্রাম্প তেহরানকে আজ (সোমবার) রাত পর্যন্ত একটি সময়সীমা বেঁধে দিয়েছেন। তিনি বলেন, যদি প্রণালি পুনরায় খোলার কোনো চুক্তি না হয়, তাহলে যুক্তরাষ্ট্র ইরানের বিদ্যুৎকেন্দ্র ও অন্যান্য অবকাঠামোতে হামলা চালাবেন এবং দেশটিকে ‘আদিম প্রস্তর যুগে’ ফিরিয়ে দেবেন।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ট্রাম্প হুমকি দিয়ে বলেন, ‘মঙ্গলবার হবে বিদ্যুৎকেন্দ্র দিবস এবং সেতু দিবস—সবই একসঙ্গে, ইরানে।’ তিনি আরও যোগ করেন, যদি ইরান প্রণালি না খোলে, তাহলে তারা নরকে বসবাস করবে।’
মধ্যপ্রাচ্যের দুই কর্মকর্তা ব্যক্তিগত আলোচনার বিষয় হওয়ায় নাম প্রকাশ না করার শর্তে অ্যাসোসিয়েটেড প্রেসকে জানিয়েছেন, সংঘাত থামানোর প্রচেষ্টায় মিসর, পাকিস্তান ও তুরস্কের মধ্যস্থতাকারীরা ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের কাছে একটি প্রস্তাব পাঠিয়েছে, যেখানে ৪৫ দিনের যুদ্ধবিরতি এবং হরমুজ প্রণালি পুনরায় খোলার আহ্বান জানানো হয়েছে। এই সময়ের মধ্যে যুদ্ধ বন্ধের উপায় খোঁজার জন্যও সময় পাওয়া যাবে।
কর্মকর্তারা আরও জানান, রবিবার গভীর রাতে পাঠানো এই প্রস্তাবে ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি এবং যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যপ্রাচ্য বিষয়ক দূত স্টিভ উইটকফকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। তবে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্র এখনও এই প্রস্তাবে সাড়া দেয়নি।
উল্লেখ্য, যুদ্ধ শুরুর পর থেকে ইরানে এখন পর্যন্ত ১ হাজার ৯০০ জনের বেশি মানুষের মৃত্যু হয়েছে, তবে কয়েকদিন ধরে সরকারিভাবে হালনাগাদ কোনো তথ্য দেওয়া হয়নি।
অন্যদিকে, লেবানন-এ স্থল অভিযান চালিয়ে ইসরায়েলি বাহিনীর হামলায় ১ হাজার ৪০০ জনের বেশি নিহত এবং ১০ লাখেরও বেশি মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছেন। সেখানে ইরান-সমর্থিত হিজবুল্লাহ যোদ্ধাদের লক্ষ্য করে অভিযানে ১১ জন ইসরায়েলি সেনাও নিহত হয়েছেন।
এছাড়া উপসাগরীয় আরব দেশগুলো ও অধিকৃত পশ্চিম তীরে দুই ডজনের বেশি মানুষ নিহত হয়েছেন। ইসরায়েলে ২৩ জন এবং যুক্তরাষ্ট্রের ১৩ জন সেনাসদস্য নিহত হওয়ার খবর পাওয়া গেছে।