গঙ্গা পানি বণ্টন চুক্তি
গঙ্গা পানি বণ্টন চুক্তি: নবায়নের আগে প্রয়োজন ‘বড় ধরনের সংস্কার’
চলতি বছরের ডিসেম্বরে মেয়াদ শেষ হতে চলা বাংলাদেশ-ভারত গঙ্গা পানি বণ্টন চুক্তিটি নবায়নের আগে এর ‘সার্বিক পর্যালোচনা ও সংস্কার’ প্রয়োজন। এ বিষয়ে পরিকল্পনার ক্ষেত্রে অর্থনীতিবিদ, নগর পরিকল্পনাবিদ, সমাজবিজ্ঞানী ও পরিবেশবাদীদের অন্তর্ভুক্ত করা জরুরি। কারণ সঠিকভাবে বণ্টন না হলে এর ঝুঁকি বাংলাদেশের ওপরই বেশি পড়বে।
ইউএনবির সঙ্গে আলাপকালে আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক শাহাব এনাম খান বলেন, ‘পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে এ বিষয়ে প্রচুর কাজ (হোমওয়ার্ক) করতে হবে এবং তথ্য বিনিময়ই এখানে মূল বিষয়। আমাদের মনে রাখতে হবে যে, ১৯৯৬ সাল আর ২০২৬ সালের পরিস্থিতি এক নয়। বিষয়টিকে কেবল প্রকৌশল বা কূটনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি থেকে দেখলে চলবে না; পরিকল্পনায় অর্থনীতিবিদ, নগর পরিকল্পনাবিদ ও সমাজবিজ্ঞানীদেরও অন্তর্ভুক্ত করতে হবে।’
ঝুঁকি কোথায়?
ঢাকার কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, গঙ্গা পানি বণ্টন চুক্তির মেয়াদ শেষ হওয়ার পর যদি নতুন কোনো চুক্তি না হয়, তবে বাংলাদেশের কৃষি ও খাদ্য নিরাপত্তা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে এবং জলবায়ুগত ঝুঁকি উল্লেখযোগ্য হারে বৃদ্ধি পাবে।
১৯৯৬ সালের ১২ ডিসেম্বর ৩০ বছর মেয়াদি গঙ্গা পানি বণ্টন চুক্তি সই হয়। ফলে চলতি বছরই এর মেয়াদ শেষ হচ্ছে। তবে চুক্তিটি সংশোধন ও নবায়নের সম্ভাব্য বিষয়গুলো নিয়ে দুই দেশের মধ্যে এখনো আলোচনা শুরু হয়নি।
বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে গঙ্গার মতো আরও ৫৪টি অভিন্ন নদ-নদী রয়েছে। এ সংক্রান্ত সব বিষয় আলোচনার জন্য দুই দেশের মধ্যে ‘যৌথ নদী কমিশন’ নামক একটি দ্বিপাক্ষিক ব্যবস্থা রয়েছে।
পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমান বলেছেন, যেহেতু উভয় পক্ষই সম্পর্ক পুনর্গঠনে আগ্রহী, তাই গঙ্গার পানি বণ্টনে একটি ‘ন্যায্য ও জলবায়ু-সহিষ্ণু’ ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করা হবে এই সম্পর্কের অন্যতম প্রথম পরীক্ষা।
ভারতের পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী কীর্তি বর্ধন সিং ইতোপূর্বে দেশটির লোকসভায় জানিয়েছেন যে, খাবার পানি ও শিল্প কারখানার পানির প্রয়োজনীয়তা নিয়ে পশ্চিমবঙ্গ সরকারসহ সব অংশীজনের মতামত নেওয়া হয়েছে, যা ভারত সরকারের অবস্থান নির্ধারণে বিবেচনায় রাখা হয়েছে।
একটি কূটনৈতিক সূত্র ইউএনবিকে জানায়, পশ্চিমবঙ্গ সরকারের একজন অনুমোদিত প্রতিনিধি ২০২৩ সালের ৩০ অক্টোবর, ২০২৪ সালের ১৫ মার্চ ও ৩১ মে এবং ২০২৫ সালের ২৬ মার্চ অনুষ্ঠিত আন্তঃমন্ত্রণালয় সভাগুলোতে অংশ নেন, যেখানে ভারতের পক্ষ থেকে একটি সম্মিলিত অবস্থান তৈরি করা হয়।
২০২৪ সালের আগস্টে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর সম্পর্কের ক্ষেত্রে প্রকাশ্য টানাপোড়েন থাকলেও কর্মকর্তারা জানিয়েছেন যে যৌথ নদী কমিশনের আওতায় ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যে অভিন্ন স্বার্থসংশ্লিষ্ট পানিবিষয়ক সকল কারিগরি সভা অব্যাহত রয়েছে।
সংস্কার ও নবায়নের আহ্বান
বাংলাদেশ সেন্টার ফর ইন্দো-প্যাসিফিক অ্যাফেয়ার্সের নির্বাহী পরিচালক অধ্যাপক শাহাব বলেন, ‘আমি মনে করি, বাংলাদেশ ও ভারতের জন্য গঙ্গা চুক্তি নবায়ন করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তবে এটি সংশোধন করতে হবে। এর সহজ কারণ হলো, চুক্তিটি প্রায় তিন দশক আগে করা হয়েছিল।’
চুক্তিটি যখন স্বাক্ষরিত হয়েছিল, তখন জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে উদ্ভূত বহুমাত্রিক সমস্যাগুলো বর্তমানের মতো এতটা স্পষ্ট ছিল না, যা চুক্তির মূল পাঠে প্রতিফলিত হয়েছে। এই চুক্তিতে ‘জলবায়ু-সহিষ্ণু পরিবর্তনের’ পক্ষে যারা মত দিচ্ছেন, অধ্যাপক শাহাব তাদের অন্যতম।
এই আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশেষজ্ঞ বলেন, বর্তমান সময়ে বিজ্ঞান, প্রযুক্তি, ভূ-প্রকৃতি এবং অবশ্যই জলবায়ু-সংক্রান্ত ইস্যুগুলো বদলে গেছে। তাই বর্তমান বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির ভিত্তিতে চুক্তিটি পর্যালোচনা করতে হবে।
তিনি জোরালোভাবে পরামর্শ দেন যে, যৌথ নদী কমিশনকে পুনরুজ্জীবিত করা এবং একটি স্বচ্ছ ও জবাবদিহিমূলক তথ্য বিনিময়ব্যবস্থা চালুর মাধ্যমে চুক্তিটি সম্পন্ন করা উচিত। এটি দুই দেশের মধ্যে ‘হাইড্রো-ডিপ্লোমেসি’ বা পানি-কূটনীতি এবং পানি ব্যবস্থাপনা ও বণ্টনের ক্ষেত্রে আস্থা বৃদ্ধি করবে।
তিনি আরও বলেন, ‘কূটনৈতিক আলোচনার টেবিলে আমাদের কেবল কূটনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি থেকে নয়, বরং প্রকৌশল, বিজ্ঞান এবং অবশ্যই অর্থনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে অংশ নেওয়া খুবই গুরুত্বপূর্ণ।’
অধ্যাপক শাহাবের মতে, বিষয়টিকে কেবল কূটনীতি বা প্রকৌশল বিদ্যার ওপর ছেড়ে দিলে কোনো সামগ্রিক সমাধান পাওয়া যাবে না।
‘এই কারণেই আমি বিশ্বাস করি, বাংলাদেশ সরকারের যথেষ্ট কাজ (হোমওয়ার্ক) করা উচিত, যেখানে সমাজের বিভিন্ন স্তরের মানুষ— অর্থনীতিবিদ, ক্ষতিগ্রস্ত জনগোষ্ঠী এবং বিশেষ করে সমাজবিজ্ঞানীদের যুক্ত করা প্রয়োজন,’ উল্লেখ করে তিনি বলেন যে পরিবেশবাদীদেরও এতে অন্তর্ভুক্ত করা উচিত।
অধ্যাপক শাহাব বলেন, ‘পানিকে কেবল পানি, অথবা কেবল কূটনৈতিক বা আইনি দৃষ্টিকোণ থেকে দেখার ধারণাটি একটি পুরনো এবং সেকেলে পদ্ধতি।’
তিনি আরও বলেন, ‘যদি দুই দেশের মধ্যে বাস্তববোধ কাজ করে, তবে তারা অবশ্যই একটি সমগ্রিক পর্যালোচনা ও সংস্কারের মাধ্যমে এমন একটি চুক্তির দিকে যাবে, যা এই সহস্রাব্দে জলবায়ু পরিবর্তনসহ অন্যান্য বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হবে।’
মরিশাসে নবম ভারত মহাসাগরীয় সম্মেলনে অংশ নেওয়ার সময় পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমান বলেছিলেন, জনগণের মৌলিক চাহিদা নিশ্চিত করে এমন একটি নতুন বা সংশোধিত চুক্তি দেখতে চায় বাংলাদেশ।
সম্মেলনের ফাঁকে এনডিটিভিকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, ‘এগুলো অভিন্ন নদী এবং এখানে আমাদের অভিন্ন ঐতিহ্য ও স্বার্থ রয়েছে। আমি যেমনটি বলেছি, একটি টেকসই এবং জন-আস্থার প্রতিফলন ঘটায় এমন সমাধান খুঁজে বের করা ছাড়া আর কোনো বিকল্প নেই। আগামী ২৫ থেকে ৫০ বছরের সম্পর্কের ভিত্তি স্থাপনের জন্যও এটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হবে।’
পররাষ্ট্রমন্ত্রী আরও বলেন, দুই দেশের কূটনৈতিক সম্পর্কের ৫৫ বছর ইতোমধ্যে পার হয়েছে। তাই আমি মনে করি না যে আমাদের কেবল ৫ বা ১০ বছরের কথা ভাবা উচিত; আমাদের দীর্ঘমেয়াদি চিন্তা করতে হবে। তাই আমাদের পররাষ্ট্রনীতি বা বলা ভালো, জনকল্যাণমূলক নীতিতে পারস্পরিক জলবায়ু সহিষ্ণুতাকে অগ্রাধিকার দেওয়াই হবে ভবিষ্যতের মূল চালিকাশক্তি।’
১৭ ঘণ্টা আগে