সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয়
সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় প্রতিষ্ঠার রায় আপিল বিভাগে স্থগিত
অধস্তন আদালতের জন্য সুপ্রিম কোর্টের অধীনে তিন মাসের মধ্যে পৃথক সচিবালয় প্রতিষ্ঠার নির্দেশনা দিয়ে হাইকোর্টের রায়ের কার্যকারিতা স্থগিত করেছেন আপিল বিভাগ।
রাষ্ট্রপক্ষের আবেদন শুনে মঙ্গলবার (৯ জুন) প্রধান বিচারপতি জুবায়ের রহমান চৌধুরীর নেতৃত্বাধীন চার বিচারপতির আপিল বেঞ্চ এ আদেশ দেন।
একইসঙ্গে সুপ্রিম কোর্টের জন্য পৃথক স্বাধীন সচিবালয় প্রতিষ্ঠার রায়ের বিরুদ্ধে আপিল শুনানির জন্য আগামী ১৬ জুন নির্ধারণ করেছেন আদালত। আপিল নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত হাইকোর্টের রায় স্থগিত থাকবে।
আদালতে রাষ্ট্রপক্ষে শুনানি করেন অ্যাটর্নি জেনারেল মো. রুহুল কুদ্দুস কাজল। রিট আবেদনকারীদের পক্ষে জ্যেষ্ঠ আইনজীবী মোহাম্মদ শিশির মনির শুনানি করেন, সঙ্গে ছিলেন আইনজীবী মোহাম্মদ সাদ্দাম হোসেন। অপর আপিলকারী জ্যেষ্ঠ আইনজীবী আহসানুল করিম ও বদিউল আলম মজুমদারের পক্ষে আইনজীবী কারিশমা জাহান শুনানি করেন।
এর আগে, সাত আইনজীবীর করা এক রিট আবেদনের চূড়ান্ত শুনানি শেষে গত বছরের ২ সেপ্টেম্বর হাইকোর্ট ওই রায় দেন। রায়ে বিদ্যমান সংবিধানের ১১৬ অনুচ্ছেদ সংবিধানের সঙ্গে সাংঘর্ষিক ও বাতিল ঘোষণা করা হয়। সুপ্রিম কোর্টের জন্য স্বাধীন পৃথক সচিবালয় তিন মাসের মধ্যে প্রতিষ্ঠা করতে নির্দেশ দেওয়া হয়।
রায়ে সংবিধান ও আইনের গুরুত্বপূর্ণ ব্যাখ্যা জড়িত থাকায় আপিলের জন্য সংবিধানের ১০৩ অনুচ্ছেদ অনুসারে সার্টিফিকেট ইস্যু করা হয়। ফলে সরাসরি আপিল করার সুযোগ তৈরি হয়।
হাইকোর্টের পূর্ণাঙ্গ রায় গত ৭ এপ্রিল প্রকাশিত হয়। সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয়ের কার্যক্রম চলমান রাখতে স্থিতাবস্থা ও সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় (রহিতকরণ) আইনের বিধানগুলোর কার্যক্রম স্থগিত চেয়ে আবেদনসহ গত ২০ এপ্রিল আপিল করেন সুশাসনের জন্য নাগরিকের (সুজন) সম্পাদক বদিউল আলম মজুমদার।
আর হাইকোর্টের রায় বাতিল চেয়ে গত ২১ মে আপিল করে রাষ্ট্রপক্ষ। এই আপিলের নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত হাইকোর্টের রায়ের কার্যকারিতা স্থগিত চেয়েও আবেদন করে রাষ্ট্রপক্ষ। সেদিন চেম্বার আদালত রাষ্ট্রপক্ষের আপিল ৯ জুন আপিল বিভাগের নিয়মিত বেঞ্চে শুনানির জন্য নির্ধারণ করেন। এ ছাড়া ১১৬ অনুচ্ছেদের বিষয়ে হাইকোর্টের রায়ের বিরুদ্ধে সুপ্রিম কোর্টের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী আহসানুল করিম আরেকটি আপিল করেন।
রাষ্ট্রপক্ষের করা আপিল ও আবেদনের সঙ্গে বদিউল আলম মজুমদার ও আইনজীবী আহসানুল করিমের করা পৃথক আপিল একসঙ্গে শুনানির জন্য আপিল বিভাগের আজকের কার্যতালিকায় ৪ নম্বর ক্রমিকে ওঠে। শুনানি নিয়ে আপিল বিভাগ হাইকোর্টের রায় স্থগিত করেন।
আইনজীবীরা জানান, হাইকোর্টের রায় স্থগিত চেয়ে রাষ্ট্রপক্ষের আবেদন এবং সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয়ের কার্যক্রম চলমান রাখতে স্থিতাবস্থা ও সচিবালয় রহিতকরণ আইনের বিধান স্থগিত চেয়ে বদিউল আলম মজুমদারের করা আবেদনের ওপর আজ শুনানি হয়।
পরে বদিউল আলম মজুমদারের আইনজীবী কারিশমা জাহান সাংবাদিকদের বলেন, হাইকোর্টের রায় স্থগিত চেয়ে রাষ্ট্রপক্ষের করা আবেদন মঞ্জুর করেছেন আপিল বিভাগ। আপিল শুনানির জন্য ১৬ জুন তারিখ নির্ধারণ করেছেন আদালত। এই সময়ের মধ্যে বিবাদীপক্ষকে আপিলের সারসংক্ষেপ জমা দিতে বলা হয়েছে। স্থগিতাবস্থা ও স্থগিতাদেশ চেয়ে তাদের করা আবেদনটি নথিতে রাখা হয়েছে।
উল্লেখ্য, ২০২৪ সালের ২৫ আগস্ট সংবিধানের ১১৬ অনুচ্ছেদ, ২০১৭ সালের জুডিসিয়াল সার্ভিস (শৃঙ্খলা) বিধিমালার বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে এবং বিচার বিভাগীয় পৃথক সচিবালয় প্রতিষ্ঠার নির্দেশনা চেয়ে সুপ্রিম কোর্টের সাত আইনজীবী রিটটি করেন। পরে একই বছরের ২৭ অক্টোবর হাইকোর্ট রুল জারি করেন।
সংবিধানের ১১৬ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, বিচার-কর্ম বিভাগে নিযুক্ত ব্যক্তিদের এবং বিচার বিভাগীয় দায়িত্ব পালনরত ম্যাজিস্ট্রেটদের নিয়ন্ত্রণ (কর্মস্থল-নির্ধারণ, পদোন্নতি ও ছুটি মঞ্জুরিসহ) ও শৃঙ্খলা বিধান রাষ্ট্রপতির ওপর ন্যস্ত। সুপ্রিম কোর্টের সঙ্গে পরামর্শক্রমে রাষ্ট্রপতি তা প্রয়োগ করে থাকেন।
রিটকারীদের আইনজীবীর মতে, ১১৬ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী অধস্তন আদালতের দায়িত্ব পালনরত ম্যাজিস্ট্রেটদের নিয়ন্ত্রণ (কর্মস্থল নির্ধারণ, পদোন্নতিদান ও ছুটি মঞ্জুরিসহ) শৃঙ্খলা বিধানের দায়িত্ব রাষ্ট্রপতির ওপর ন্যস্ত রয়েছে।
একই অনুচ্ছেদ রাষ্ট্রপতি এ দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে সুপ্রিম কোর্টের সঙ্গে পরামর্শ করবেন বলে উল্লেখ রয়েছে। মূলত রাষ্ট্রপতির ওপর ন্যস্ত এ দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে রাষ্ট্রের নির্বাহী বিভাগের সরাসরি হস্তক্ষেপ দেখা যায়, যা বিচার বিভাগের স্বাধীনতাকে খর্ব করে।
১৯৭২ সালের সংবিধানে অধস্তন আদালতের দায়িত্ব পালনরত ম্যাজিস্ট্রেটদের নিয়ন্ত্রণ (কর্মস্থল নির্ধারণ, পদোন্নতিদান ও ছুটি মঞ্জুরিসহ) শৃঙ্খলা বিধানের এ দায়িত্ব সুপ্রিম কোর্টের ওপর ন্যস্ত ছিল।
১৯৭৪ সালে সংবিধানের চতুর্থ সংশোধনীর মাধ্যমে ম্যাজিস্ট্রেটদের নিয়ন্ত্রণ (কর্মস্থল নির্ধারণ, পদোন্নতিদান ও ছুটি মঞ্জুরিসহ) শৃঙ্খলা বিধানের দায়িত্ব রাষ্ট্রপতির ওপর ন্যস্ত করা হয়। পরে সংবিধানের পঞ্চম সংশোধনীর মাধ্যমে এবং ‘সুপ্রিমকোর্টের সহিত পরামর্শক্রমে রাষ্ট্রপতি কর্তৃক তাহা প্রযুক্ত হইবে’ শব্দগুলো সন্নিবেশিত করা হয়।
এরপর সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ পঞ্চম সংশোধনী আইন অসাংবিধানিক মর্মে ঘোষণা করলে পঞ্চদশ সংশোধন আইন, ২০১১-এর মাধ্যমে ১১৬ অনুচ্ছেদের বর্তমান একই বিধানটি প্রতিস্থাপন করা হয়। বর্তমানে সংবিধানের ১১৬ অনুচ্ছেদে এ বিধানটিই বিদ্যমান রয়েছে। হাইকোর্ট রিটের চূড়ান্ত শুনানি করে পৃথক সচিবালয় প্রতিষ্ঠার জন্য রায় দেন।
৩ ঘণ্টা আগে