ছাত্র-আন্দোলন
ছাত্র-আন্দোলনের মুখে সার্বিয়ার প্রেসিডেন্টের পদত্যাগের ঘোষণা
টানা ১৮ মাস ধরে চলা সরকারবিরোধী আন্দোলনের পর পদত্যাগের ঘোষণা দিয়েছেন সার্বিয়ার প্রেসিডেন্ট আলেকসান্দার ভুচিচ।
সোমবার (২৯ জুন) তিনি বলেছেন, ‘কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই আমি পদত্যাগ করব।’ একই সঙ্গে দেশটিতে আগাম প্রেসিডেন্ট ও সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে বলে জানিয়েছেন তিনি।
২০২৪ সালের নভেম্বর মাসে সার্বিয়ার উত্তরাঞ্চলের নোভি সাদ শহরের একটি রেলস্টেশনের ছাউনি ধসে ১৬ জন নিহত হন। ওই ঘটনাকে কেন্দ্র করে ভুচিচ সরকারের বিরুদ্ধে আন্দোলনের সূচনা হয়। ওই রেলস্টেশন দুর্ঘটনার পর থেকে বিক্ষোভকারীরাসহ বিরোধী দল এবং মানবাধিকার সংগঠনগুলো সরকারের বিরুদ্ধে অভিযোগ করতে থাকে যে রেলস্টেশনে ছাউনি ধসের দুর্ঘটনার জন্য নির্মাণ প্রকল্পে সরকারের ব্যাপক অব্যবস্থাপনা ও দুর্নীতি দায়ী। এরপর চাপের মুখে অবশেষে পদত্যাগের ঘোষণা দিলেন গত ১২ বছর ধরে ক্ষমতায় থাকা ভুচিচ।
সার্বিয়ার রাজধানী বেলগ্রেদে সরকারপন্থিদের এক সমাবেশে তিনি বলেন, ‘আর মাত্র কয়েক সপ্তাহই আমি প্রেসিডেন্ট আছি, এরপর আমি পদত্যাগ করব।’
তবে আসন্ন প্রেসিডেন্ট নির্বাচন এবং আগাম সংসদ নির্বাচনে তার দল সার্বিয়ান প্রগ্রেসিভ পার্টিকে (এসএনএস) জয়ী করতে তিনি কাজ করবেন বলেও এ সময় তিনি উল্লেখ করেন।
সমাবেশে তিনি বলেন, ‘আমার প্রস্তাব হচ্ছে, আসন্ন নির্বাচনে আমাদের বিজয়ী জোটের নাম হবে “ইউনাইটেড সার্বিয়া”।’
অবশ্য তিনি কবে পদত্যাগ করবেন বা সংসদ ভেঙে দেবেন, সে বিষয়ে নির্দিষ্ট কোনো তারিখ জানাননি। বর্তমান সরকারের মেয়াদ শেষের আগেই আগাম সংসদ নির্বাচন আয়োজনের পূর্বশর্ত হলো সংসদ ভেঙে দেওয়া।
ভুচিচ সরকারের দ্বিতীয় মেয়াদে দায়িত্বগ্রহণের পর এর মেয়াদ ২০২৭ সালের মাঝামাঝি সময় পর্যন্ত ছিল।
এখানেই ভুচিচের রাজনৈতিক অধ্যায়ের শেষ নয়
কূটনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এখানেই ভুচিচের রাজনৈতিক জীবনের সমাপ্তি হচ্ছে না। তিনি পদত্যাগ করলেও আসন্ন সংসদ নির্বাচনে তার দল এসএনএস জয়ী হলে তিনি প্রধানমন্ত্রী হতে পারবেন। অর্থাৎ পদবী যাই হোক না কেন, এসএনএস সরকার গঠন করলে ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দুতে থাকবেন ভুচিচ।
বিশ্লেষকদের মতে, এসএনএস ক্ষমতায় এলে প্রেসিডেন্ট পদেও নিজের ঘনিষ্ঠ কাউকে বসানোর চেষ্টা করবেন তিনি। এর মাধ্যমে পর্দার আড়াল থেকে তিনিই ক্ষমতার নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখতে পারবেন।
এ ব্যাপারে ওয়ারশ-ভিত্তিক বিশ্লেষক রাদিভোয়ে গ্রুইচ বলেন, ‘এই সিদ্ধান্ত মোটেও ভুচিচের রাজনৈতিক জীবনের শেষ নয়। ইতোমধ্যেই তার একটি পরিকল্পনা রয়েছে। সেই পরিকল্পনা অনুযায়ী তিনি রাজনীতি থেকে অবসর নয়, বরং তিনি আবারও ক্ষমতায় আসার চেষ্টা করছেন।’
তবে শনিবার ভুচিচের পদত্যাগের ঘোষণা ইঙ্গিত দিচ্ছে, প্রেসিডেন্ট পদ থেকে তার সরে দাাঁড়ানোর পেছনে দুর্নীতিবিরোধী বিক্ষোভগুলো গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। ২০০০ সালে স্লোবোদান মিলোসেভিচের পতনের পর ভুচিচ সরকারবিরোধী আন্দোলনই সার্বিয়ার সবচেয়ে বড় আন্দোলন।
কয়েক দিন আগে দেশটির নোভি সাদ শহরে শিক্ষার্থীরা রেলস্টেশন দুর্ঘটনায় নিহতদের স্মরণ করেন। এ সময় আগাম সাধারণ নির্বাচনের দাবি জানান তারা। এছাড়া গতকাল (রবিবার) দক্ষিণ-মধ্য সার্বিয়ার ক্রালিয়েভো শহরে আরেকটি ছাত্র সমাবেশ হয়েছে।
ছাত্র নেতৃত্বাধীন এই আন্দোলনের কর্মীরা এবং বিরোধী দল উভয়েই জানিয়েছে, তারা নির্বাচনে ভুচিচ ও তার সমর্থিত দল এসএনএসের বিরুদ্ধে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে চায়।
ছাত্রসমর্থিত সরকারবিরোধী আন্দোলন ‘মুভ-চেঞ্জ’-এর প্রধান সাভো মানোইলোভিচ বলেন, ‘পদত্যাগ এবং আগাম প্রেসিডেন্ট ও সংসদ নির্বাচনের মাধ্যমে ভুচিচ তার অনিবার্য পতন ঠেকানোর চেষ্টা করছেন। কারণ বর্তমান পরিস্থিতিতে দেশটির জনসমর্থন ছাত্র আন্দোলনের প্রতি।’
রাজনৈতিক সমীকরণ
সার্বিয়া ইউরোপীয় ইউনিয়নে (ইইউ) যোগদানের প্রার্থী দেশ। তবে দেশটির সঙ্গে এখনও রাশিয়া ও চীনের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রয়েছে। ক্ষমতায় থাকার পুরো সময়জুড়ে ভুচিচকে এই ভারসাম্য বজায় রাখতে হয়েছে।
সার্বিয়ার সামনে চ্যালেঞ্জ হলো ইইউতে যোগ দেওয়ার আগে দেশটিতে আইনের শাসন আরও শক্তিশালী করতে হবে। এর মধ্যে রয়েছে অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচনের পরিবেশ নিশ্চিত করা, দুর্নীতি ও সংঘবদ্ধ অপরাধ দমন এবং পররাষ্ট্রনীতি ইইউর নীতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ করা।
শনিবার ভুচিচ প্রতিশ্রুতি দিয়ে বলেন, তার দল দুর্নীতির অবসান ঘটাবে। এছাড়া তিনি পেনশন বৃদ্ধি, দরিদ্রদের জন্য আর্থিক সহায়তা বাড়ানো এবং সরকারি স্বাস্থ্যসেবার উন্নয়নেরও প্রতিশ্রুতি দেন।
তবে বিরোধী দলীয় নেতারা অভিযোগ করেছেন, ভুচিচ এবং তার সহযোগীরা রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে সহিংসতা, ব্যাপক দুর্নীতি, সংঘবদ্ধ অপরাধচক্রের সঙ্গে সম্পর্ক এবং গণমাধ্যমের স্বাধীনতা দমনের সঙ্গে জড়িত। অবশ্য ভুচিচ এবং তার সহযোগীরা এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন।
১ দিন আগে