ঈদুল আজহাকে কেন্দ্র করে বিভিন্ন রুটে বাস ও মিনিবাসে অতিরিক্ত ভাড়া আদায়ের নৈরাজ্য চলছে বলে অভিযোগ করেছে বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতি।
সংগঠনটির দাবি, ঈদযাত্রায় পর্যবেক্ষণ করা ২৭টি দূরপাল্লার রুটের মধ্যে ২৬টিতেই অতিরিক্ত ভাড়া আদায় করা হয়েছে। এসব রুটে প্রায় দুই লাখ ৩৪ হাজার যাত্রীর কাছ থেকে মোট ৫ কোটি ৬১ লাখ ৯৩ হাজার টাকা বাড়তি ভাড়া নেওয়া হয়েছে।
বুধবার (২৭ মে) গণমাধ্যমে পাঠানো এক বার্তায় বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতির মহাসচিব মো. মোজাম্মেল হক চৌধুরী এ তথ্য জানান।
তিনি বলেন, বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন মালিক সমিতি ঈদযাত্রায় অতিরিক্ত ভাড়া আদায় না করার ঘোষণা দিলেও বাস্তবে রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় সিটিসার্ভিস ও দূরপাল্লার বাসে অতিরিক্ত ভাড়া আদায় করা হচ্ছে। একই ধরনের নৈরাজ্য নৌপথের বেশিরভাগ রুটেও দেখা যাচ্ছে। তবে সরকার ও বাস মালিক সমিতি এসব অভিযোগ বরাবরই অস্বীকার করছে।
যাত্রী কল্যাণ সমিতির দাবি, প্রাকৃতিক দুর্যোগ, বৃষ্টি-বাদল ও কালবৈশাখীর পাশাপাশি অতিরিক্ত ভাড়া আদায়ের কারণে ঈদযাত্রায় মানুষের দুর্ভোগ অসহনীয় হয়ে উঠেছে।
সংগঠনটির পর্যবেক্ষকদের কাছে বিভিন্ন বাসের চালক ও হেলপাররা অভিযোগ করেছেন, পরিবহন শ্রমিকদের বেতন ও ঈদ বোনাস কার্যকর না থাকায় তারা অতিরিক্ত ভাড়া আদায়ে বাধ্য হচ্ছেন।
সমিতির তথ্য অনুযায়ী, এবার ঈদে ঢাকা থেকে প্রায় ৯৫ লাখ যাত্রী দেশের বিভিন্ন জেলায় যাতায়াত করছেন। এছাড়া আন্তঃজেলা পর্যায়ে আরও প্রায় ৩ কোটি ট্রিপ যাত্রী যাতায়াত করতে পারেন। দীর্ঘদিন ধরে পরিবহন খাতে কাঠামোগত সংস্কার না হওয়া, চালকদের বেতন ও কর্মঘণ্টা নির্ধারিত না থাকা, ভাড়া আদায়ের অনিয়ম এবং পরিবহন ব্যবস্থাপনায় দুর্বলতার কারণে প্রতিবছর ঈদে যাত্রীরা এমন ভোগান্তির শিকার হচ্ছেন বলে সংগঠনটি উল্লেখ করেছে।
এতে আরও বলা হয়, ঈদযাত্রা মনিটরিং কমিটিতে বাস মালিক সমিতি ও সড়ক পরিবহন শ্রমিক ফেডারেশনের প্রভাব থাকায় সরকারের বিভিন্ন উদ্যোগ সত্ত্বেও যাত্রীদের স্বস্তি নিশ্চিত করা সম্ভব হচ্ছে না।
পর্যবেক্ষণে দেখা গেছে, বিভিন্ন রুটে নির্ধারিত ভাড়ার তুলনায় অনেক বেশি অর্থ আদায় করা হচ্ছে। ঢাকা-খুলনা রুটে ৫৪১ টাকার ভাড়া ১ হাজার টাকা, ঢাকা-বরিশাল রুটে ৫৯২ টাকার ভাড়া ৮৫০ টাকা এবং একই রুটে বিআরটিসির দোতলা বাসে ৭০০ টাকা আদায় করা হচ্ছে। ঢাকা-পটুয়াখালী রুটে ৫৭০ টাকার ভাড়া নেওয়া হচ্ছে ১ হাজার টাকা এবং ঢাকা-শরীয়তপুর রুটে ২৩৩ টাকার ভাড়া আদায় করা হচ্ছে ৫০০ টাকা।
এছাড়া চট্টগ্রাম-বরগুনা রুটে ১ হাজার ১৯৭ টাকার ভাড়া ১ হাজার ৮০০ টাকা, ঢাকা-মাদারীপুর রুটে ২৫০ টাকার ভাড়া ৫০০ টাকা, ঢাকা-ফরিদপুর রুটে ৩০০ টাকার ভাড়া ৫০০ টাকা এবং ঢাকা-দিনাজপুর রুটে ৬০০ টাকার ভাড়া ৯০০ টাকা নেওয়ার তথ্য পাওয়া গেছে।
চট্টগ্রাম-বগুড়া রুটে ১ হাজার টাকার ভাড়া ১ হাজার ৮০০ টাকা এবং চট্টগ্রাম-গাইবান্ধা রুটে ১ হাজার ১০০ টাকার ভাড়া ২ হাজার ২০০ টাকা আদায় করা হচ্ছে বলেও জানিয়েছে সংগঠনটি।
এছাড়া ঢাকা-চট্টগ্রাম, ঢাকা-ফেনী, ঢাকা-কুমিল্লা, ঢাকা-যশোর, ঢাকা-ঝিনাইদহ, ঢাকা-মাগুরা, ঢাকা-কুষ্টিয়া, ঢাকা-ভাঙ্গা, ঢাকা-পিরোজপুর, ঢাকা-টেকেরহাটসহ বিভিন্ন রুটেও অতিরিক্ত ভাড়া আদায়ের অভিযোগ পাওয়া গেছে।
পর্যবেক্ষণে আরও দেখা গেছে, ৫২ আসনের বাসে জালিয়াতির মাধ্যমে ৪০ আসনের ভাড়ার তালিকা টানানো হয়েছে। আবার স্বল্প দূরত্বের যাত্রীদের কাছ থেকেও শেষ গন্তব্য পর্যন্ত পূর্ণ ভাড়া আদায় করা হচ্ছে।
তবে সরকারের কঠোর অবস্থান এবং বাস মালিক সমিতির কিছু তৎপরতার কারণে গত ঈদুল ফিতরের তুলনায় এবারের পরিস্থিতি কিছুটা নিয়ন্ত্রণে রয়েছে বলেও উল্লেখ করেছে যাত্রী কল্যাণ সমিতি।
সংগঠনটি বলেছে, অতিরিক্ত ভাড়া আদায়ের কারণে দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধি, পরিবহনে চাঁদাবাজি, সামাজিক অস্থিরতা, অনিয়ম-দুর্নীতি, বিশৃঙ্খলা ও সড়ক দুর্ঘটনা বাড়ছে। নিম্নআয়ের মানুষ কম ভাড়ায় যাতায়াতের জন্য বাস ও ট্রেনের ছাদে, পণ্যবাহী ট্রাক কিংবা খোলা ট্রাকে ভ্রমণে বাধ্য হচ্ছেন।
এ পরিস্থিতি থেকে উত্তরণে গণপরিবহনে ডিজিটাল পদ্ধতিতে ভাড়া আদায় চালু, নগদ লেনদেন কমানো, চালকদের বেতন ও ঈদ বোনাস নিশ্চিত, সড়ক-মহাসড়কে সিসি ক্যামেরার মাধ্যমে ই-প্রসিকিউশন চালু এবং আইনের সুশাসন নিশ্চিত করার সুপারিশ করেছে সংগঠনটি।
এছাড়া ঈদযাত্রা মনিটরিং কমিটি থেকে বাস মালিক সমিতি ও শ্রমিক ফেডারেশনকে বাদ দিয়ে পুরো নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা সরকারের হাতে রাখার দাবি জানিয়েছে বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতি।