জাতীয় প্রেস ক্লাবের সভাপতি কবি হাসান হাফিজ অভিযোগ করেছেন, আওয়ামী লীগ মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে দলীয়করণ করে প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধাদের খলনায়ক বানিয়েছিল।
শনিবার (২৮ মার্চ) রাজধানীর বাংলাদেশ চলচ্চিত্র উন্নয়ন করপোরেশনে (এফডিসি) স্বাধীনতা দিবস উপলক্ষে আয়োজিত ছায়া সংসদ বিতর্ক প্রতিযোগিতায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এ কথা বলেন।
হাসান হাফিজ বলেন, আওয়ামী লীগ একাই দেশ স্বাধীন করে নাই। স্বাধীনতার পর মুক্তিযুদ্ধের সার্টিফিকেট বিক্রির মাধ্যমেই গলদটা শুরু হয়েছে। বিগত সময়ে ক্ষমতায় টিকে থাকার জন্য আওয়ামী লীগ মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে নিকৃষ্টভাবে দলীয়করণ করেছে। স্বার্থ হাসিলের জন্য প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধাদের তারা খলনায়ক বানিয়ে মুক্তিযুদ্ধকে কলঙ্কিত করেছিল।
তিনি বলেন, ‘বিরোধী মতকে কথায় কথায় স্বাধীনতাবিরোধী বলা হতো। ভুয়া মুক্তিযোদ্ধাদের চিহ্নিত করে আইনের আওতায় এনে তাদের সকল অবৈধ সুবিধা বাতিল করতে হবে। আওয়ামী সরকার মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে কুক্ষিগত করে পারিবারিকীকরণ করেছিল। এমনকি, তারা নামমাত্র মূল্যে গণভবন লিখে নিয়েছিল। বীর মুক্তিযোদ্ধাদের সম্মান প্রদানের মাধ্যমে মুক্তিযুদ্ধের প্রকৃত ইতিহাস প্রনয়ন করতে হবে।’
তিনি সতর্ক করে বলেন, ‘এ দেশে যাতে আর কখনও ফ্যাসিস্ট ফিরে আসতে না পারে, সে ব্যাপারে আমাদের সজাগ থাকতে হবে।’
অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন ডিবেট ফর ডেমোক্রেসির চেয়ারম্যান হাসান আহমেদ চৌধুরী কিরণ।
সভাপতির বক্তব্যে তিনি বলেন, মুক্তির আন্দোলন শেষ হয়নি। শোষণমুক্ত বৈষম্যহীন সমাজ বিনির্মাণ হওয়ার আগপর্যন্ত মুক্তির আন্দোলন চালিয়ে যেতে হবে। স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে আমরা একটি মানচিত্র, একটি পতাকা, একটি ভূখন্ড পেলেও স্বাধীনতার সুফল এখনও পুরোপুরি অর্জিত হয়নি। স্বাধীনতার অঙ্গীকার অনুযায়ী এখনো সাম্য ও মানবিক মর্যাদা সম্পন্ন রাষ্ট্র গঠন করা যায়নি। সামাজিক সুবিচার প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব হয়নি। বৈষম্যহীন সমাজ প্রতিষ্ঠা করা যায়নি।
তিনি আরও বলেন, স্বাধীনতার ৫৫ বছরেও মুক্তিযোদ্ধাদের সঠিক তালিকা তৈরি করা সম্ভব হয়নি। যে তালিকা আছে সেই তালিকায় ৮ থেকে ১০ শতাংশ ভূয়া মুক্তিযোদ্ধা রয়েছে। ১৪ লাখ সরকারি চাকরিজীবির মধ্যে ৯০ হাজার ৫২৭ জন মুক্তিযোদ্ধা কোটায় সরকারি চাকরি করছে। এর মধ্যে মুক্তিযোদ্ধা সনদ নিয়ে সরকারি চাকরিতে কর্মরত ৮ হাজার জনের সনদই সন্দেহজনক। ভুয়া মুক্তিযোদ্ধাদের শনাক্ত করে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করা জরুরি।
কিরণ বলেন, মুক্তিযোদ্ধদের সঠিক তালিকা প্রণয়ন করে এর সঠিক সংখ্যা জাতিকে জানাতে হবে। স্বাধীনতার প্রকৃত সুফল পেতে সুশাসন প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে ইতিহাস থেকে প্রাপ্ত শিক্ষা কাজে লাগাতে হবে। অতীত অভিজ্ঞতাকে মাথায় রেখে বর্তমান ও ভবিষ্যতের রাজনীতি পরিচালনা করতে হবে, যাতে এদেশে আর কোন স্বৈরাচার ফ্যাসিস্টের আবির্ভাব না ঘটে।
তিনি আরও বলেন, ৭১ ও ২৪ একই সুতায় গাঁথা হলেও ২৪—এর গণঅভ্যুত্থান ও ৭১—এর মুক্তিযুদ্ধকে মুখোমুখি করা ঠিক হবে না। মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে দলীয়করণের মাধ্যমে ক্ষমতায় টিকে থাকার অপপ্রয়াস করেছিল একটি গোষ্ঠী। ২৪-এর জুলাই অভ্যুত্থানে সেই অপশক্তির পতন ঘটেছে।
স্বাধীনতার সুফল নিশ্চিত করতে আইনের শাসন, মানবাধিকার এবং রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সামাজিক মুক্তি নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্বারোপ করে তিনি তরুণ প্রজন্মের মাঝে স্বাধীনতার প্রকৃত ইতিহাস তুলে ধরার আহ্বান জানান।
স্বাধীনতা দিবস উপলক্ষে ডিবেট ফর ডেমোক্রেসির আয়োজনে অনুষ্ঠিত ছায়া সংসদ বিতর্ক প্রতিযোগিতায় সোনারগাঁও ইউনিভার্সিটির বিতার্কিকদের পরাজিত করে স্যার সলিমুল্লাহ মেডিকেল কলেজের বিতার্কিকরা বিজয়ী হন।
প্রতিযোগিতায় বিচারক ছিলেন অধ্যাপক আবু মোহাম্মদ রইস, ড. তাজুল ইসলাম চৌধুরী তুহিন, সাংবাদিক সাইদুল ইসলাম, সাংবাদিক মাইদুর রহমান রুবেল ও সাংবাদিক মো. আল-আমিন। প্রতিযোগিতা শেষে অংশগ্রহণকারী দলগুলোর মধ্যে ট্রফি, ক্রেস্ট ও সনদপত্র প্রদান করা হয়।