শিক্ষাখাতে সময়োপযোগী ও মানসম্মত সংস্কার বাস্তবায়নে সরকারের দৃঢ় অঙ্গীকারের কথা জানিয়েছেন শিক্ষামন্ত্রী ড. আ ন ম এহছানুল হক মিলন। বুধবার শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে অনুষ্ঠিত এক বৈঠক শেষে সাংবাদিকদের তিনি এ কথা বলেন। এ সময় প্রতিমন্ত্রী ববি হাজ্জাজ উপস্থিত ছিলেন।
শিক্ষামন্ত্রী বলেন, অতীতে বিশেষ পরিস্থিতির প্রেক্ষিতে কিছু অনাকাঙ্ক্ষিত সিদ্ধান্ত—যেমন পরীক্ষা বন্ধ বা অটোপাস—নেওয়া হয়েছিল। তবে সেগুলো কখনোই কাঙ্ক্ষিত বা স্থায়ী সমাধান ছিল না। বর্তমান সরকারের লক্ষ্য শিক্ষা ব্যবস্থাকে সময়োপযোগী, মানসম্মত ও জবাবদিহিমূলক কাঠামোর মধ্যে আনা।
আসন্ন এসএসসি পরীক্ষা সুষ্ঠু, স্বচ্ছ ও নির্বিঘ্নভাবে সম্পন্ন করতে প্রয়োজনীয় সব প্রস্তুতি সম্পন্ন হয়েছে জানিয়ে তিনি বলেন, প্রশ্নপত্র প্রণয়ন ও বিতরণ প্রক্রিয়ায় কোনো ধরনের অনিয়ম বা প্রতিবন্ধকতা যেন না ঘটে, সে বিষয়ে সংশ্লিষ্ট বিভাগগুলোকে স্পষ্ট নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
শিক্ষকদের দলীয়করণ এবং শ্রেণিকক্ষ ছেড়ে রাজনৈতিক কর্মসূচিতে অংশগ্রহণের বিষয়ে মন্ত্রী বলেন, শিক্ষকতার মূল দায়িত্ব শিক্ষার্থীদের পাঠদান। দাবি-দাওয়া থাকলে তা আলোচনার মাধ্যমে সমাধান করা হবে; তবে ক্লাস ফেলে রাজপথে নামা গ্রহণযোগ্য নয়। সরকার শিক্ষকদের যথাযথ সম্মান বজায় রেখে দাবি বিবেচনায় সমাধানের পথেই অগ্রসর হবে।
শিক্ষার মান রক্ষায় নকলবিরোধী অবস্থান অব্যাহত থাকবে উল্লেখ করে তিনি আশা প্রকাশ করেন, ভবিষ্যতে আর বিশেষ অভিযানের প্রয়োজন হবে না; বরং শিক্ষার্থীদের মধ্যে নৈতিকতা ও অধ্যয়নচর্চা জোরদারের মাধ্যমে স্বাভাবিকভাবেই নকল প্রবণতা কমে আসবে।
উপকূলীয়, চর ও হাওর অঞ্চলে বন্যা ও প্রাকৃতিক দুর্যোগে শিক্ষাব্যবস্থায় বিঘ্ন ঘটার বিষয়ে প্রশ্নের জবাবে মন্ত্রী বলেন, সংশ্লিষ্ট অঞ্চলের বাস্তবতা বিবেচনায় নিয়ে বিশেষ ব্যবস্থাপনা গ্রহণ করা হবে। প্রয়োজন অনুযায়ী বিকল্প ব্যবস্থা ও সময়োপযোগী সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।
জাতীয় শিক্ষাক্রম পর্যালোচনা ও পরিমার্জনের বিষয়ে তিনি জানান, জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ডের কারিকুলাম বিশেষজ্ঞদের সমন্বয়ে প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি চলছে। শিক্ষা কমিশন গঠনের বিষয়ে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী জনাব তারেক রহমানের সঙ্গে আলোচনা করে সিদ্ধান্ত জানানো হবে।
এমপিওভুক্ত বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে প্রয়োজনীয় বিধিমালা প্রণয়ন ও মনিটরিং জোরদার করা হবে। শিক্ষক নিয়োগ, বদলি ও শৃঙ্খলাজনিত বিষয়ে জাতীয় শিক্ষক নিবন্ধন ও প্রত্যয়ন কর্তৃপক্ষের কার্যক্রম পুনর্বিন্যাস ও শক্তিশালী করার উদ্যোগ নেওয়া হবে।
ইংরেজি মাধ্যম শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোকে সরকারি নীতিমালার আওতায় আনতে পর্যায়ক্রমে পদক্ষেপ নেওয়া হবে বলেও জানান তিনি। কোনো প্রতিষ্ঠান সরকারি বিধিবিধানের বাইরে পরিচালিত হতে পারবে না। অনিবন্ধিত বা অস্থায়ী অবকাঠামোয় স্কুল পরিচালনা গ্রহণযোগ্য নয় উল্লেখ করে মন্ত্রী বলেন, অগ্নি নিরাপত্তা ও অবকাঠামোগত মানদণ্ড বাধ্যতামূলক করা হবে এবং নিবন্ধন ছাড়া কোনো শিক্ষা প্রতিষ্ঠান পরিচালনার সুযোগ থাকবে না।
তফসিল ঘোষণার সময়কালে ব্যাপক বদলি ও সম্ভাব্য অনিয়মের বিষয়ে প্রশ্নের জবাবে শিক্ষামন্ত্রী বলেন, প্রশাসনিক সিদ্ধান্তগুলো খতিয়ে দেখা হবে। নির্বাচন কমিশনের বিধান লঙ্ঘন বা আর্থিক লেনদেনের অভিযোগ পাওয়া গেলে তদন্ত করা হবে। প্রায় ১,৭০০ এমপিও আবেদন চূড়ান্ত হওয়ার প্রেক্ষাপটে বিষয়টি পর্যালোচনা করে বাজেট বরাদ্দ ও প্রয়োজনীয় যাচাই-বাছাই শেষে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। দুর্নীতির প্রমাণ মিললে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
বেসরকারি শিক্ষকদের অবসর ও কল্যাণ ভাতা দীর্ঘদিন বন্ধ থাকার বিষয়ে মন্ত্রী গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে জানান, সংশ্লিষ্ট ট্রাস্ট দ্রুত পুনর্গঠন এবং বকেয়া ভাতা পরিশোধের ব্যবস্থা নেওয়া হবে। এটি সরকারের তাৎক্ষণিক অগ্রাধিকার তালিকায় রয়েছে।
দক্ষ জনশক্তি গড়ে তুলতে কারিগরি ও প্রযুক্তিভিত্তিক শিক্ষাকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়া হবে উল্লেখ করে তিনি বলেন, বর্তমান কারিগরি শিক্ষায় তত্ত্বের তুলনায় ব্যবহারিক শিক্ষার ঘাটতি রয়েছে—এটি সমন্বয় করা হবে। পলিটেকনিক ও কারিগরি প্রতিষ্ঠানে প্র্যাকটিক্যাল অংশ বৃদ্ধি, শিল্পখাতের সঙ্গে সংযোগ জোরদার এবং আধুনিক প্রযুক্তি ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা সংযুক্ত করার উদ্যোগ নেওয়া হবে।
মন্ত্রী সরকারের তাৎক্ষণিক তিনটি অগ্রাধিকার তুলে ধরেন—শিক্ষার্থীদের শ্রেণিকক্ষে ফিরিয়ে আনতে উপযোগী পরিবেশ সৃষ্টি, জাতীয় কারিকুলাম রিভিউ ও পরিমার্জন এবং কারিগরি শিক্ষার আধুনিকায়ন।
ঘোষিত ‘ওয়ান টিচার ওয়ান ট্যাব’ কর্মসূচি ধাপে ধাপে বাস্তবায়ন করা হবে জানিয়ে তিনি বলেন, প্রাথমিক ও মাধ্যমিক—সব পর্যায়ের শিক্ষকদের অন্তর্ভুক্ত করা হবে। ১৮০ দিনের রোডম্যাপের মাধ্যমে কোন পর্যায়ে কীভাবে বাস্তবায়ন হবে, তা শিগগিরই প্রকাশ করা হবে।
শিক্ষা প্রতিষ্ঠানসমূহের মান ও কার্যক্রম পর্যবেক্ষণে সংশ্লিষ্ট নিয়ন্ত্রক সংস্থার মাধ্যমে মনিটরিং জোরদার করা হবে জানিয়ে শিক্ষামন্ত্রী পুনর্ব্যক্ত করেন, শিক্ষা খাতে দুর্নীতির কোনো সুযোগ থাকবে না। শিক্ষা মন্ত্রণালয় নৈতিকতা, জবাবদিহিতা ও মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিত করতে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ।