গত ছয় বছর ১০ মাসে দেশজুড়ে সড়ক দুর্ঘটনায় প্রায় ৩০০ পরিবার নিশ্চিহ্ন হয়ে গেছে। একই সঙ্গে ভ্রমণরত একই পরিবারের একাধিক সদস্য নিহত হওয়ার দুর্ঘটনাও ক্রমশ বাড়ছে।
রবিবার (৮ নভেম্বর) রোড সেফটি ফাউন্ডেশন (আরএসএফ) প্রকাশিত এক প্রতিবেদন থেকে এসব তথ্য জানা গেছে।
২০২০ সালের জানুয়ারি থেকে ২০২৬ সালের অক্টোবর পর্যন্ত সময়ের তথ্য বিশ্লেষণ করে তৈরি ওই প্রতিবেদনে দেখা গেছে, মোটরসাইকেল, অটোরিকশা, ব্যক্তিগত গাড়ি, মাইক্রোবাস, অ্যাম্বুলেন্স ও বাসের দুর্ঘটনায় পুরো পরিবার অথবা একই পরিবারের একাধিক সদস্য নিহত হয়েছে।
৯টি জাতীয় দৈনিক, ১৭টি অনলাইন নিউজ পোর্টাল, ইলেকট্রনিক মিডিয়া ও নিজস্ব তথ্যের ভিত্তিতে প্রতিবেদনটি তৈরি করেছে আরএসএফ।
এ ধরনের প্রাণহানির উল্লেখযোগ্য অংশই ঘটেছে মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায়। প্রতিবেদনে ১৯৩টি দুর্ঘটনার কথা উল্লেখ করা হয়েছে, যেখানে স্বামী-স্ত্রী একসঙ্গে নিহত হয়েছেন। এসব দুর্ঘটনায় মোট ৩৮৬ জনের প্রাণহানি ঘটেছে। এছাড়া বাবা ও সন্তান জড়িত আরও ১৫৯টি মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় ৩১৮ জনের মৃত্যু হয়েছে।
৫২৫টি অটোরিকশা দুর্ঘটনায় একই পরিবারের একাধিক সদস্য নিহত হয়েছে, যেখানে মোট মৃতের সংখ্যা এক হাজার ৭২৮ জন। এর মধ্যে ২১১টি দুর্ঘটনায় একই পরিবারের দুজন করে, ১১৮টিতে তিনজন, ৯২টিতে চারজন, ৫৩টিতে পাঁচজন, ৩৮টিতে ছয়জন ও ১৩টিতে সাতজন সদস্য নিহত হয়।
১৮৬টি মাইক্রোবাস দুর্ঘটনায় একই পরিবারের একাধিক সদস্য নিহত হয়েছে, যেখানে মোট ৭০৮ জন প্রাণ হারিয়েছে। এর মধ্যে ৪৮টি দুর্ঘটনায় একই পরিবারের দুজন, ৪৬টিতে তিনজন, ৩৯টিতে চারজন, ২৮টিতে পাঁচজন, ২০টিতে ছয়জন, চারটিতে ১১ জন ও একটিতে ১৪ জন সদস্য নিহত হয়েছে।
ব্যক্তিগত গাড়ির ক্ষেত্রে এ ধরনের ১০৮টি দুর্ঘটনায় ৩৫২ জন নিহত হয়েছে, যার মধ্যে ৩৪টি দুর্ঘটনায় প্রতিটিতে দুজন করে, ৩১টিতে তিনজন, ২৪টিতে চারজন ও ১৯টিতে পাঁচজন সদস্য নিহত হয়।
প্রতিবেদনে একই পরিবারের একাধিক সদস্য নিহত হওয়ার ৪৫টি অ্যাম্বুলেন্স দুর্ঘটনার কথাও উল্লেখ করা হয়েছে। এসব দুর্ঘটনায় প্রাণ হারিয়েছে ১৬২ জন, যার মধ্যে ১১টি দুর্ঘটনায় একই পরিবারের দুজন করে, ১৫টিতে তিনজন, ৯টিতে চারজন, সাতটিতে পাঁচজন ও তিনটিতে আটজন সদস্য নিহত হয়।
৩২টি বাস দুর্ঘটনায় বিভিন্ন পরিবারের ৮৫ জন সদস্য নিহত হয়েছে, যার মধ্যে ১৭টি দুর্ঘটনায় প্রতিটিতে দুজন করে, ৯টিতে তিনজন ও ছয়টিতে চারজন করে পরিবারের সদস্য প্রাণ হারায়।
এছাড়া একটি দুর্ঘটনায় পিকআপ ভ্যান নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে উল্টে গেলে একই পরিবারের চার সদস্য নিহত হয়।
প্রতিবেদনে এ ধরনের দুর্ঘটনার পেছনে বেশ কয়েকটি কারণ চিহ্নিত করেছে আরএসএফ, যার মধ্যে রয়েছে কাজ ও অবসরের জন্য পরিবারের সদস্যদের একসঙ্গে যাতায়াতের প্রবণতা বৃদ্ধি, মহাসড়কে অটোরিকশার চলাচল এবং অনেক মাইক্রোবাস ও অ্যাম্বুলেন্সের ফিটনেস না থাকা।
মাইক্রোবাস ও অ্যাম্বুলেন্স চালকদের অদক্ষতা ও ক্লান্তি, মোটরসাইকেল চালকদের মানসম্মত হেলমেট ব্যবহার না করা, বেপরোয়া মোটরসাইকেল চালানো এবং সড়ক ব্যবহারকারীদের ট্রাফিক আইন না মানার প্রবণতাও এসব দুর্ঘটনার কারণ বলে উল্লেখ করেছে আরএসএফ।
এ ধরনের দুর্ঘটনা প্রতিরোধে মোটরসাইকেল চালকদের জন্য উন্নত মানের হেলমেটের ব্যবহার নিশ্চিত করা, ট্রাফিক আইন মেনে যানবাহন চালানো এবং মহাসড়কে রোড ডিভাইডার ও সার্ভিস রোড নির্মাণের সুপারিশ করেছে সংগঠনটি।
এছাড়া গ্রামীণ সড়ক যাতে সরাসরি মহাসড়কের সঙ্গে যুক্ত না হয়, সে জন্য নিরাপদ সড়ক নকশা প্রণয়ন, সড়ক ও মহাসড়কে যানবাহনের ওপর কঠোর নজরদারি এবং সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর প্রাতিষ্ঠানিক কার্যকারিতা, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করার আহ্বান জানানো হয়েছে।
সড়ক ব্যবহারকারীদের ট্রাফিক নিরাপত্তাবিধি মেনে চলার সক্ষমতা বাড়াতে শিক্ষা ও সচেতনতামূলক কর্মসূচি পরিচালনারও সুপারিশ করেছে আরএসএফ।