২০২৮ সাল থেকে মাধ্যমিক ও প্রাথমিক স্তরে যুগোপযোগী নতুন কারিকুলাম চালু করা হবে। এ লক্ষ্যে ইতোমধ্যে কারিকুলাম প্রণয়ন কমিটি গঠন করা হয়েছে বলে জানিয়েছেন শিক্ষা, প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রী আ ন ম এহছানুল হক মিলন।
বুধবার (১ জুলাই) সচিবালয়ে এইচএসসি ও সমমানের পরীক্ষা উপলক্ষে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে তিনি এসব কথা বলেন।
শিক্ষামন্ত্রী বলেন, সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর মাত্র সাড়ে চার মাস হয়েছে। তাই আগামী শিক্ষাবর্ষে বড় ধরনের কারিকুলাম পরিবর্তন সম্ভব নয়। তবে ২০২৮ সাল থেকে প্রয়োজন অনুযায়ী বিভিন্ন শ্রেণিতে নতুন কারিকুলাম চালু করা হবে। তিনি বলেন, অতীতের পুরোনো ধ্যানধারণা থেকে বেরিয়ে শিক্ষাব্যবস্থাকে আধুনিক ও কর্মমুখী করা হবে।
মন্ত্রী জানান, নতুন কারিকুলামে শিক্ষার্থীদের সৃজনশীলতা, নৈতিকতা, সামাজিক ও পারিবারিক মূল্যবোধ, কর্মদক্ষতা এবং উদ্যোক্তা হওয়ার সক্ষমতা গড়ে তোলার ওপর গুরুত্ব থাকবে। একই সঙ্গে ষষ্ঠ শ্রেণি থেকে বাধ্যতামূলকভাবে কারিগরি ও ভোকেশনাল শিক্ষার ব্যবস্থা করা হবে। প্রথমে তাত্ত্বিক, পরে ব্যবহারিক শিক্ষা যুক্ত হবে। এছাড়া আন্তর্জাতিক কর্মবাজারে প্রতিযোগিতার সক্ষমতা বাড়াতে তৃতীয় ভাষা শিক্ষাও পর্যায়ক্রমে চালু করা হবে। এ জন্য প্রয়োজন হলে সরকারি সহায়তা ও স্টুডেন্ট লোন দেওয়ার বিষয়ও বিবেচনা করা হবে।
তিনি বলেন, চলতি বছরের এইচএসসি পরীক্ষা সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন করতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদের বডি ক্যামেরা ব্যবহারের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি পরীক্ষা নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে গুজব বা বিভ্রান্তিকর তথ্য ছড়ালে নতুন সাইবার আইনে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
আ ন ম এহছানুল হক মিলন জানান, পাবলিক পরীক্ষা আইন, ১৯৮০ সম্পূর্ণ সংশোধন করা হয়েছে। নতুন আইনে প্রশ্নফাঁস, প্রশ্নপত্র পরিবর্তন, পরীক্ষা কেন্দ্রে হামলা, শিক্ষক বা সংশ্লিষ্টদের অনিয়মসহ বিভিন্ন অপরাধের জন্য কঠোর শাস্তির বিধান রাখা হয়েছে। কোনো অনিয়ম করে কেউ যেন পার না পায়, সে লক্ষ্যেই আইনটি কঠোর করা হয়েছে।
পরীক্ষার মূল্যায়ন ব্যবস্থায়ও বড় পরিবর্তনের কথা জানান শিক্ষামন্ত্রী। তিনি বলেন, আগে শিক্ষার্থীরা শুধু ট্যাবুলেশন শিট যাচাইয়ের সুযোগ পেত। এখন উত্তরপত্র পুনঃনিরীক্ষণের সুযোগ রাখা হয়েছে। পাশাপাশি পরীক্ষকদের খাতা মূল্যায়নও নমুনাভিত্তিকভাবে পুনরায় যাচাই করা হবে, যাতে অতিরিক্ত বা কম নম্বর দেওয়ার প্রবণতা শনাক্ত করা যায়। পরীক্ষকদের সংখ্যা বাড়ানো, প্রশিক্ষণ দেওয়া এবং একজন পরীক্ষকের ওপর অতিরিক্ত খাতা মূল্যায়নের চাপ কমানোর উদ্যোগও নেওয়া হয়েছে।
মন্ত্রী বলেন, ভুল প্রশ্নপত্র বিতরণ বা অবহেলার ঘটনা ঘটলে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে জবাবদিহির আওতায় আনা হবে। প্রাকৃতিক দুর্যোগে কোনো এলাকায় সমস্যা সৃষ্টি হলে স্থানীয় প্রশাসন পরিস্থিতি অনুযায়ী তাৎক্ষণিক সিদ্ধান্ত নেবে। তবে পরীক্ষা স্থগিতের পরিবর্তে বিকল্প ব্যবস্থা গ্রহণকে অগ্রাধিকার দেওয়া হবে।
একাদশ শ্রেণিতে ভর্তি হওয়ার পর বিপুলসংখ্যক শিক্ষার্থীর পরীক্ষায় অংশ না নেওয়ার বিষয়ে এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, সরকার বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিশ্লেষণ করছে। কেন শিক্ষার্থীরা ঝরে পড়ছে, তার কারণ অনুসন্ধান করে ভবিষ্যতে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
ডিজিটাল প্রশ্নপত্র চালুর বিষয়ে শিক্ষামন্ত্রী বলেন, বিশ্বের অনেক উন্নত দেশেও ডিজিটাল প্রশ্নপত্র হ্যাকিংয়ের ঘটনা ঘটেছে। তাই বাংলাদেশে বিদ্যমান ব্যবস্থার নিরাপত্তা আরও শক্তিশালী করার পাশাপাশি প্রশ্নফাঁস রোধে কঠোর আইন প্রয়োগ করা হচ্ছে। তিন সেট প্রশ্নপত্র প্রস্তুত রাখা হয়েছে, যাতে যেকোনো পরিস্থিতি মোকাবিলা করা যায়।
এহছানুল হক মিলন জানান, বিশ্ববিদ্যালয় ভর্তি পরীক্ষায় শিক্ষার্থীদের ভোগান্তি কমাতে সমন্বিত ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। এসএসসি পরীক্ষার সূচি যেমন অনেক আগে ঘোষণা করা হয়েছে, তেমনি ভর্তি পরীক্ষাগুলোও সমন্বয় করে সেশনজট কমানোর উদ্যোগ নেওয়া হবে। ফল প্রকাশের পর এ বিষয়ে সরকারের পরিকল্পনা জানানো হবে।
কোচিং নির্ভরতা কমানোর বিষয়েও সরকারের পরিকল্পনার কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, শিক্ষকদের প্রশিক্ষণের ওপর সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া হবে। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে অতিরিক্ত পাঠদান বা ইন-হাউস কোচিং চালুর উদ্যোগ নেওয়া হবে, যাতে শিক্ষার্থীদের বাইরে কোচিংয়ের ওপর নির্ভর করতে না হয়। এছাড়া যেসব প্রতিষ্ঠানের অধিকাংশ শিক্ষার্থী কোচিংমুখী হয়ে পড়ে, সেগুলোকে নজরদারির আওতায় আনা হবে। কোচিং সেন্টার পরিচালনায়ও সরকারি অনুমোদন ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করার পরিকল্পনা রয়েছে।
মন্ত্রী আরও জানান, শিক্ষা খাতে এবার জিডিপির প্রায় ২ শতাংশ বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে, যা অতীতের তুলনায় বেশি। সরকার ধাপে ধাপে এই বরাদ্দ আরও বাড়াবে। তবে অর্থ বরাদ্দের পাশাপাশি সেই অর্থ কার্যকরভাবে ব্যবহার নিশ্চিত করাই এখন সরকারের প্রধান লক্ষ্য।
সংবাদ সম্মেলনে তিনি সাংবাদিকদেরও পরীক্ষা নিয়ে দায়িত্বশীল ভূমিকা পালনের আহ্বান জানান। শিক্ষামন্ত্রী বলেন, এইচএসসি শিক্ষার্থীদের জীবনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা। তাই গুজব বা বিভ্রান্তি এড়িয়ে সুষ্ঠু পরিবেশ বজায় রাখতে সবাইকে সহযোগিতা করতে হবে।