রংপুরের তারাগঞ্জ উপজেলার হারিয়ারকুটি ও সয়ার ইউনিয়নের মাঝ দিয়ে বয়ে চলেছে যমুনেশ্বরী নদী। এর দুই পাশের চিলাপাক ও কালুরঘাটে স্থায়ী একটি সেতুর অভাবে ২৫ গ্রামের মানুষ চরম দুর্ভোগের শিকার হচ্ছেন। প্রতিদিন ঝুঁকি নিয়ে নদী পার হতে হচ্ছে অর্ধ লক্ষাধিক মানুষকে। বিপাকে পড়ছে স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থীরা।
জানা গেছে, তারাগঞ্জ উপজেলা সদর থেকে ১৮ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত চিলাপাক-কালুরঘাট দীর্ঘদিন ধরে এলাকার একমাত্র যোগাযোগের মাধ্যম। স্থানীয় গ্রামবাসীরা জানান, বছরের পর বছর ধরে তারা খেয়াঘাটের ওপর নির্ভর করে চলাচল করছেন। শুকনো মৌসুমে বাঁশের সাঁকো তৈরি করে নদী পার হন গ্রামবাসী। কিন্তু বর্ষায় সেই সাঁকো তলিয়ে যায়। নদীর পানি বেড়ে গেলে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হয়ে ওঠে। তখন নৌকায় পার হতে হয় যা নারী, শিশু ও বৃদ্ধদের জন্য সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিপূর্ণ। রাতে জরুরি প্রয়োজনেও নদী পার হওয়া প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়ে।
স্থানীয়রা জানান, বর্ষার সময় ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করেও নৌকা পাওয়া যায় না। নদীর স্রোত বেশি থাকলে মাঝিরাও পারাপারে অনীহা প্রকাশ করেন। এতে জরুরি পরিস্থিতিতে মানুষের দুর্ভোগ আরও বেড়ে যায়।
সেতুর অভাবে সবচেয়ে বেশি ক্ষতির মুখে পড়ছেন কৃষকরা। এ অঞ্চলে ধান, আলু, ভুট্টা ও শাকসবজি উৎপাদন হলেও সময়মতো বাজারে পৌঁছাতে না পারায় ন্যায্যমূল্য থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন তারা। অনেক সময় পণ্য নষ্ট হয়ে লোকসানে পড়তে হয় তাদের। ফলে কৃষির ওপর নির্ভরশীল পরিবারগুলো পড়েন আর্থিক সংকটে।
এলাকার শিক্ষার্থীদের প্রতিদিন নদী পার হয়ে স্কুল-কলেজে ও মাদরাসায় যেতে হয়। বর্ষায় ঝুঁকির কারণে অনেক অভিভাবক সন্তানদের স্কুলে পাঠাতে চান না। ফলে পড়াশোনায়ও ক্ষতির সম্মুখীন হচ্ছে শিক্ষার্থীরা।
তারাগঞ্জের কুর্শা ইউনিয়নে কর্মরত প্রশাসনিক কর্মকর্তা (সচিব) মতিনুজামান বলেন, আমার বাড়ি নদীর ওপারে। এখানে একটি স্থায়ী সেতু না থাকায় এ এলাকার লোকজনের চলাচলে চরম কষ্ট করতে হয়। বিশেষ করে বর্ষা মৌসুমে এ কষ্ট আরও বেড়ে যায়। তখন এ এলাকার লোকজনের চলাচল ভীষণ কষ্টকর । অসুস্থ রোগীদের জন্যও ঘাট যেন এক দুঃস্বপ্ন। হঠাৎ অসুস্থ হলে দ্রুত উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স বা জেলা শহরে নেওয়া প্রায় অসম্ভব হয়ে দাঁড়ায়। দেরিতে চিকিৎসা পাওয়ায় রোগীর অবস্থা আরও জটিল হয়ে যায়।
চাকরিজীবী ও ছোট ব্যবসায়ীরাও বিপাকে পড়ছেন। নির্দিষ্ট সময়ে কর্মস্থলে পৌঁছাতে না পারায় পেশাগত জীবনে নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে। ব্যবসায়ীরা সময়মতো পণ্য পরিবহন করতে না পারায় আর্থিক ক্ষতির সম্মুখীন হচ্ছেন।
হারিয়ারকুটি ও সয়ার ইউনিয়নের চিলাপাক, পাটানিপাড়া, দোলাপাড়া, বানিয়াপাড়া, উজিয়াল, মামুনপাড়া, মেনানগর, কালুরঘাট, ডাঙ্গাপাড়া, প্রামাণিক পাড়া, মণ্ডলপাড়া, মাসুয়াপাড়াসহ প্রায় ২৫ গ্রামের অর্ধ লক্ষাধিক মানুষ সরাসরি এ ঘাটের ওপর নির্ভরশীল।
স্থানীয়দের অভিযোগ, বিগত বছরগুলোতে একাধিক জনপ্রতিনিধি ও রাজনৈতিক নেতা সেতু নির্মাণের প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন, তবে বাস্তবে কোনো অগ্রগতি হয়নি।
হারিয়ারকুটি ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান কুমারেশ রায় এবং সয়ার ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আল ইবাদাত হোসেন পাইলট জানান, কালুরঘাটে স্থায়ী সেতু নির্মাণের বিষয়টি একাধিকবার উপজেলা সমন্বয় সভায় উত্থাপন করা হয়েছে এবং সংশ্লিষ্ট দপ্তরে প্রস্তাব পাঠানো হয়েছে। কিন্তু কাজের কাজ কিছুই না হওয়ায় আমরাও হতাশ।
এলাকাবাসীর দাবি, কালুরঘাটে দ্রুত একটি স্থায়ী সেতু নির্মাণ করা হলে, এখানে শুধু যাতায়াতের দুর্ভোগ কমবে না, বরং এ অঞ্চলের শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা, কৃষি ও সামগ্রিক অর্থনৈতিক উন্নয়নও ত্বরান্বিত হবে।
এ ব্যাপারে রংপুর এলজিইডির নিবার্হী প্রকৌশলী আবু মুসা বলেন, ওই সেতু নির্মানের জন্য মন্ত্রণালয়ে প্রস্তাবনা পাঠানো হয়েছে । আশা করছি দ্রুত একটা ব্যবস্থা হবে।