জার্মানি থেকে হাজার হাজার মার্কিন সেনা প্রত্যাহারের বিষয়ে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের আকস্মিক সিদ্ধান্তে বিস্ময় প্রকাশ করেছেন ইউরোপীয় নেতারা। তবে সোমবার তাঁরা বলেছেন, এই পদক্ষেপ স্পষ্ট করে দিয়েছে যে ইউরোপকে এখন নিজের নিরাপত্তার দায়িত্ব নিজেকেই নিতে হবে। ।
গত সপ্তাহে পেন্টাগন ঘোষণা দেয়, তারা জার্মানি থেকে প্রায় ৫ হাজার সেনা সরিয়ে নেবে। তবে ট্রাম্প শনিবার (২ মে) সাংবাদিকদের বলেন, ‘আমরা সেনাসংখ্যা অনেক কমিয়ে আনছি। এই সংখ্যা ৫ হাজারের চেয়েও অনেক বেশি হবে।’
তবে কেন এই সিদ্ধান্ত, সে বিষয়ে ট্রাম্প কোনো নির্দিষ্ট কারণ উল্লেখ করেননি। আকস্মিক এই ঘোষণায় উত্তর আটলান্টিক নিরাপত্তা জোট—ন্যাটো অনেকটা অপ্রস্তুত অবস্থায় পড়েছে।
ইরান ও ইসরায়েলের মধ্যকার যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান নিয়ে জার্মান চ্যান্সেলর ফ্রিডরিখ মেয়ার্সের সঙ্গে ট্রাম্পের ক্রমবর্ধমান বিরোধের মধ্যেই এই ঘোষণা এল। মধ্যপ্রাচ্যের এই যুদ্ধে ইউরোপীয় মিত্রদের সম্পৃক্ত হতে অনাগ্রহের কারণে ট্রাম্প বেশ ক্ষুব্ধ বলে জানা গেছে।
সেনা প্রত্যাহারের বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে নরওয়ের প্রধানমন্ত্রী ইয়োনাস গার স্তোরে বলেন, ‘আমি এটাকে অতিরঞ্জিত করব না। তবে, আমরা আশা করছি, ইউরোপ নিজের নিরাপত্তার জন্য আরও বড় ভূমিকা নেবে।’
ইউরোপীয় ইউনিয়নের পররাষ্ট্রনীতি বিষয়ক প্রধান কায়া কাল্লাস বলেন, ‘ইউরোপ থেকে মার্কিন সেনা প্রত্যাহারের আলোচনা অনেক দিন ধরেই চলছে। তবে হঠাৎ এমন সিদ্ধান্ত সত্যিই বিস্ময়কর।’
তিনি বলেন, ‘আমার মনে হয় এখন থেকে ন্যাটোর ইউরোপীয় অংশকে আমাদের আরও শক্তিশালী করতে হবে।’
মেয়ার্সকে শাস্তি দিতে ট্রাম্প এই সিদ্ধান্ত নিয়েছেন কিনা এমন প্রশ্নে কাল্লাস বলেন, ‘প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের মনের ভেতরে কী চলছে, তা আমি জানি না। তাই বিষয়টি তাকেই ব্যাখ্যা করতে হবে।’
গত সপ্তাহের শেষে ন্যাটোর মুখপাত্র অ্যালিসন হার্ট বলেন, ৩২টি দেশের এই সামরিক জোটের কর্মকর্তারা জার্মানি থেকে মার্কিন সেনা প্রত্যাহার নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের সিদ্ধান্তের বিস্তারিত বুঝতে কাজ করছেন।’
গত বছর পুনরায় ক্ষমতায় আসার পর থেকেই ইউরোপীয় মিত্ররা এবং কানাডা জানত যে ট্রাম্প ইউরোপ থেকে সেনা প্রত্যাহার করবেন। অক্টোবরেই কিছু মার্কিন সেনা রোমানিয়া ছেড়েছিল। তবে যুক্তরাষ্ট্রের কর্মকর্তারা প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন, নিরাপত্তা শূন্যতা এড়াতে তারা ন্যাটো মিত্রদের সঙ্গে সমন্বয় করেই যেকোনো পদক্ষেপ নেবেন।
ন্যাটোর মহাসচিব মার্ক রুটে এই পদক্ষেপকে ছোট করে দেখিয়ে বলেন, ‘এই মুহূর্তে ইরান যুদ্ধ নিয়ে ইউরোপের সমর্থনের বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে হতাশা রয়েছে।’
বিশেষ করে ফ্রান্স, স্পেন ও যুক্তরাজ্য তাদের ভূখণ্ডে অবস্থিত ঘাঁটি ব্যবহার করে ইরানের ওপর হামলার জন্য যুক্তরাষ্ট্রকে পূর্ণ স্বাধীনতা দিতে অস্বীকৃতি জানিয়েছে। স্পেন তাদের আকাশসীমা ও ঘাঁটি ব্যবহারের অনুমতিও দেয়নি।
তবে ট্রাম্প নেতৃত্বের সমর্থক হিসেবে পরিচিত রুটে বলেন, ‘আমি বলব ইউরোপীয়রা বার্তাটি শুনেছে। তারা এখন নিশ্চিত করছে যে সব দ্বিপাক্ষিক ঘাঁটি-সংক্রান্ত চুক্তি এখন বাস্তবায়ন করা হচ্ছে।’
তিনি আরও বলেন, ইউরোপীয় দেশগুলো পরবর্তী ধাপের জন্য গুরুত্বপূর্ণ সামরিক সম্পদ আগে থেকেই নির্দিষ্ট স্থানে মোতায়েন করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে।’
ইউরোপীয় নেতারা ট্রাম্পের এ সিদ্ধান্তের প্রতিক্রিয়া হিসেবে জানান, যুদ্ধ শেষ না হওয়া পর্যন্ত তারা গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি বাণিজ্যপথ হরমুজ প্রণালির নিরাপত্তা রক্ষায় অংশ নেবে না।
ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাক্রোঁ বলেন, ‘যদি যুক্তরাষ্ট্র হরমুজ পুনরায় খুলতে প্রস্তুত থাকে, তাহলে সেটা ভালো। শুরু থেকেই আমরা সেটাই চাইছিলাম।’
তবে তিনি জোর দিয়ে বলেন, ইউরোপ এমন কোনো অভিযানে অংশ নিতে প্রস্তুত নয় যা ‘আমাদের কাছে পরিষ্কার মনে নয়’।
মেয়ার্সের সঙ্গে উত্তেজনার আরেকটি কারণ হিসেবে ট্রাম্প ইউরোপীয় ইউনিয়নের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্য চুক্তি না মানার অভিযোগ তুলেছেন এবং আগামী সপ্তাহে ইইউয়ে উৎপাদিত গাড়ি ও ট্রাকের ওপর শুল্ক ২৫ শতাংশ পর্যন্ত বাড়ানোর পরিকল্পনা ঘোষণা করেছেন। ট্রাম্পের এই আদেশ বড় গাড়ি উৎপাদনকারী দেশ জার্মানির জন্য বিশেষভাবে ক্ষতিকারক।
ট্রাম্প বা যুক্তরাষ্ট্রের নাম উল্লেখ না করে ইউরোপীয় কমিশনের প্রেসিডেন্ট উরসুলা ফন ডের লিয়েন বলেন, ইউরোপীয় ইউনিয়ন ইতোমধ্যে অস্ট্রেলিয়া ও ভারতের সঙ্গে নতুন বাণিজ্য চুক্তি করেছে এবং এখন মেক্সিকোর সঙ্গে কাজ করছে।
তিনি বলেন, ‘একই মানসিকতার বন্ধুদের সঙ্গে আপনার সরবরাহশৃঙ্খল স্থিতিশীল ও নির্ভরযোগ্য থাকে এবং সবচেয়ে বড় মুক্ত বাণিজ্যচুক্তির নেটওয়ার্ক ইউরোপেরই রয়েছে।’