ফিলিপাইনের দক্ষিণাঞ্চলের উপকূলীয় এলাকায় ৭ দশমিক ৮ মাত্রার শক্তিশালী ভূমিকম্প আঘাত হেনেছে। এতে অন্তত ১৯ জন নিহত এবং দুই শতাধিক মানুষ আহত হয়েছেন।
স্থানীয় সময় সোমবার (৮ জুন) সকাল ৭টা ৩৭ মিনিটে এই কম্পন অনুভূত হয়।
ফিলিপাইনের ভূকম্পবিদ্যা ইনস্টিটিউটের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরে দেশটিতে আঘাত হানা সবচেয়ে শক্তিশালী এই ভূমিকম্পটির উৎপত্তিস্থল ছিল সারাঙ্গানি প্রদেশের মাসিম শহর থেকে প্রায় ৩২ কিলোমিটার দক্ষিণ-পশ্চিমে সাগরের তলদেশে। ভূমিকম্পটির গভীরতা ছিল ৩৩ কিলোমিটার।
ভূমিকম্পের পর উপকূলবর্তী এলাকায় প্রায় এক মিটার (তিন ফুট) উচ্চতার সুনামি আঘাত হানে বলে কর্মকর্তারা জানিয়েছেন। তবে প্যাসিফিক সুনামি সতর্কতা কেন্দ্র জানিয়েছে, ভূমিকম্পের প্রায় পাঁচ ঘণ্টা পর সুনামির আশঙ্কা অনেকটাই কেটে গেছে।
ভূমিকম্পে হতাহতদের বেশিরভাগই ক্ষতিগ্রস্ত ভবনের নিচে বা ভবনসংক্রান্ত দুর্ঘটনার শিকার হয়েছেন। টুনা মাছ রপ্তানি ও অন্যান্য বাণিজ্যের গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র বন্দরনগরী জেনারেল সান্তোসও সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত এলাকার মধ্যে রয়েছে।
তবে সুনামির কারণে কোনো হতাহত বা ক্ষয়ক্ষতির খবর পাওয়া যায়নি বলে জানিয়েছেন ফিলিপাইনের আগ্নেয়গিরি ও ভূকম্পবিদ্যা ইনস্টিটিউটের পরিচালক তেরেসিতো বাকোলকল।
তিনি অ্যাসোসিয়েটেড প্রেসকে বলেন, ‘এটি একটি বড় ধরনের ভূমিকম্প। আমরা ক্ষয়ক্ষতির আশঙ্কা করছি এবং ইতোমধ্যে বিভিন্ন ভিডিওতে ক্ষতিগ্রস্ত ভবন দেখতে পেয়েছি।’
ফিলিপাইনের প্রেসিডেন্ট ফার্দিনান্দ মার্কোস জুনিয়র বলেন, ‘জাতীয় সরকার কাজ শুরু করেছে এবং আমরা মিন্দানাওকে একা ছেড়ে দেব না।’
প্রথম কম্পনটি আঘাত হানার পর অসংখ্য আফটারশক অনুভূত হয়। ভূমিকম্পটির তীব্রতা এতই শক্তিশালী ছিল যে মালয়েশিয়াতেও তা অনুভূত হয়েছে। ইন্দোনেশিয়া ও মালয়েশিয়ার উপকূলে ছোট আকারের সুনামি ঢেউও শনাক্ত করা হয়েছে।
ভূমিকম্পে জেনারেল সান্তোসে অন্তত সাতজন নিহত এবং প্রায় ১৩০ জন আহত হয়েছেন। সেখানে কয়েকটি ছোট ভবন আংশিক ধসে পড়েছে এবং একটি গুরুত্বপূর্ণ সংযোগ সেতুসহ বেশ কয়েকটি স্থাপনায় বিপজ্জনক ফাটল দেখা দিয়েছে বলে সিভিল ডিফেন্স দপ্তরের আঞ্চলিক পরিচালক রড সোসমেনা জানিয়েছেন।
এছাড়া দক্ষিণ কোটাবাটো, দাভাও অক্সিডেন্টাল প্রদেশ এবং বালুট দ্বীপে আরও পাঁচজনের মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে বলে কর্মকর্তারা জানিয়েছেন।
সোসমেনা বলেন, জেনারেল সান্তোসে একটি দ্বিতল স্কুল ভবন ধসে পড়ার ঘটনায় কয়েকজন শিক্ষার্থী আটকা পড়েছে বলে পাওয়া খবর যাচাই করা হচ্ছে। এ বিষয়ে তিনি বিস্তারিত জানাতে না পারলেও দেশটির জাতীয় পুলিশ জানিয়েছে, শহরটিতে অন্তত সাতজন নিখোঁজ রয়েছেন।
গ্রীষ্মকালীন ছুটি শেষে সোমবার দেশজুড়ে সরকারি স্কুলগুলো পুনরায় খুলেছে। কর্মকর্তা এডনার দায়াংহিরাং জানান, সকালে পতাকা উত্তোলন অনুষ্ঠানে অংশ নেওয়া ১০০ জনের বেশি শিক্ষার্থী আতঙ্কে ছোটাছুটি করতে গিয়ে আহত হয়েছেন এবং কয়েকজন জ্ঞান হারান।
জেনারেল সান্তোস আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর সাময়িকভাবে বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে এবং ১৭টি অভ্যন্তরীণ ফ্লাইট বাতিল করা হয়েছে বলে জানিয়েছে বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ।
রড সোসমেনা বলেন, ‘আমাদের পিকআপ গাড়িটি হঠাৎ প্রবলভাবে কেঁপে ওঠে। প্রথমে মনে হয়েছিল টায়ার পাংচার হয়েছে। মানুষ ঘরবাড়ি ছেড়ে রাস্তায় বেরিয়ে আসে।’
দায়াংহিরাং বলেন, দাভাও শহরে বাড়ি থেকে বের হওয়ার সময় তিনি মাটির কম্পনে ঠিকমতো দাঁড়িয়ে থাকতে বা ভারসাম্য রক্ষা করতে পারছিলেন না।
ম্যানিলাভিত্তিক ডিজেডআরএইচ রেডিও জানিয়েছে, তাদের প্রাদেশিক স্টেশন অবস্থিত একটি ছোট বাণিজ্যিক ভবনের অংশ ধসে পড়েছে। কর্মীরা দ্রুত নিচতলায় নেমে আসায় কেউ আহত হননি। তবে চারতলা ভবনের ধ্বংসস্তূপে অন্য কেউ আটকা পড়েছেন কি না, তা তাৎক্ষণিকভাবে জানা যায়নি। আশপাশের অন্যান্য ভবন থেকেও ধ্বংসাবশেষ নিচে পড়ে পার্ক করা গাড়ি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
কর্মকর্তারা জানান, সুলতান কুদারাত ও সারাঙ্গানি প্রদেশে প্রায় এক মিটার উচ্চতার সুনামি রেকর্ড করা হয়েছে।
ভূমিকম্পের পর মালয়েশিয়ার বোর্নিও দ্বীপের সাবাহ অঙ্গরাজ্যের জন্য সুনামি সতর্কতা জারি করে দেশটির আবহাওয়া বিভাগ। সাবাহ ফিলিপাইনের দক্ষিণাঞ্চল থেকে নৌপথে অল্প দূরত্বে অবস্থিত। এদিকে, সুলাওয়েসি দ্বীপের উপকূলে ৮৩ সেন্টিমিটার উচ্চতার সুনামি ঢেউ রেকর্ড করা হয়েছে।
প্রশান্ত মহাসাগরীয় ‘রিং অব ফায়ার’ অঞ্চলে অবস্থানের কারণে বিশ্বের সবচেয়ে দুর্যোগপ্রবণ দেশগুলোর একটি ফিলিপাইন। দেশটিতে প্রায়ই ভূমিকম্প ও আগ্নেয়গিরির অগ্ন্যুৎপাত ঘটে। এছাড়া প্রতিবছর প্রায় ২০টি টাইফুন ও গ্রীষ্মমণ্ডলীয় ঝড় দেশটিতে আঘাত হানে।