ভেনেজুয়েলায় আঘাত হানা দুটি শক্তিশালী ভূমিকম্পে নিহতের সংখ্যা বেড়ে ১৬৪ জনে দাঁড়িয়েছে। আহত হয়েছেন আরও অন্তত ৯৭১ জন। দেশটির ভারপ্রাপ্ত প্রেসিডেন্ট ডেলসি রদ্রিগেজ এ তথ্য জানিয়েছেন।
স্থানীয় সময় বুধবার (২৪ জুন) সন্ধ্যা ৬টার কিছু পরে ক্যারিবীয় উপকূলের মোরন শহরের পশ্চিমে, দেশটির রাজধানী কারাকাস থেকে প্রায় ১৬৮ কিলোমিটার দূরে প্রথমে ৭ দশমিক ২ মাত্রার একটি ভূমিকম্প আঘাত হানে। মার্কিন ভূতাত্ত্বিক জরিপ সংস্থার (ইউএসজিএস) তথ্য অনুযায়ী, এর গভীরতা ছিল ২২ কিলোমিটার।
মাত্র এক মিনিটের ব্যবধানে ৭ দশমিক ৫ মাত্রার দ্বিতীয় ভূমিকম্পটি আঘাত হানে। এর উৎপত্তিস্থল ছিল মোরনের দক্ষিণ-পশ্চিমে ১৬ কিলোমিটার দূরে এবং গভীরতা ছিল ১০ কিলোমিটার।
রদ্রিগেজ বলেন, ভূমিকম্পে ধসে পড়া ভবনের নিচে আটকে পড়াদের উদ্ধারে অভিযান চলছে। এছাড়া দুর্গত এলাকাগুলোর সব জায়গায় জরুরি সেবা পৌঁছাতে পারেনি। উদ্ধারকারী দলগুলো সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত এলাকাগুলোতে দ্রুত পৌঁছানোর চেষ্টা করছে।
এই ভূমিকম্প গত এক শতাব্দীরও বেশি সময়ের মধ্যে ভেনেজুয়ার সবচেয়ে শক্তিশালী ভূমিকম্পগুলোর অন্যতম। ভূমিকম্পের কম্পন পুরো অঞ্চলে অনুভূত হয়।
ভূমিকম্পে দেশটির প্রধান আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে বন্ধ হয়ে গেছে। এছাড়া রাজধানী কারাকাস থেকে প্রায় এক হাজার ৭০০ কিলোমিটার দূরের ব্রাজিলের আমাজন অঞ্চলেও বিভিন্ন ভবন থেকে মানুষকে সরিয়ে নেওয়া হয়।
বৃহস্পতিবার টেলিভিশনের ফুটেজে দেখা যায়, ধসে পড়া ভবনের ধ্বংসস্তূপে উদ্ধারকর্মীরা বিদ্যুৎচালিত যন্ত্রপাতি ব্যবহার করে আটকে পড়াদের উদ্ধারের চেষ্টা চালাচ্ছেন। রাজধানীর বাসিন্দারা আতঙ্কে রাস্তায় নেমে আসেন। ভূমিকম্পের পর অনেককে ধসে পড়া ভবন ও উপড়ে পড়া বৈদ্যুতিক খুঁটির ধ্বংসাবশেষের মধ্যে নিখোঁজ স্বজনদের খোঁজ করতে দেখা যায়।
রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে প্রচারিত ফুটেজে দেখা যায়, লা গুইরা অঙ্গরাজ্যে ধ্বংসস্তূপের নিচ থেকে ধুলায় ঢাকা জীবিত অবস্থায় তিন শিশুকে উদ্ধার করা হয়েছে। রদ্রিগেজ লা গুইরাকে ‘দুর্যোগকবলিত এলাকা’ হিসেবে বর্ণনা করে বলেন, ব্যাপকসংখ্যক ভবন ধসে পড়ায় এটি সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত এলাকাগুলোর একটি।
তিনি জানান, উপকূলীয় লা গুইরায় উদ্ধার তৎপরতা জোরদারে দেশের অন্যান্য অঞ্চল থেকে উদ্ধারকারী দল পাঠানো হচ্ছে। ধ্বংসস্তূপের নিচে এখনও অনেক মানুষ আটকা পড়ে থাকতে পারেন বলে ধারণা করা হচ্ছে। তাই দিনের আলো কাজে লাগিয়ে উদ্ধার কার্যক্রম দ্রুত এগিয়ে নেওয়ার চেষ্টা চলছে।
রদ্রিগেজ বলেন, ‘সেখানে বহু ভবন ধসে পড়েছে এবং জীবন বাঁচাতে আমরা ব্যাপক উদ্ধার অভিযান চালিয়ে যাচ্ছি।’
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিওতে দেখা গেছে, লা গুইরার একটি হাসপাতালের বাইরে বহু মানুষকে চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে। তাদের কেউ মাটিতে, আবার কেউ হাসপাতালের শয্যায় শুয়ে চিকিৎসা নিচ্ছেন।
দক্ষিণ আমেরিকান ও ক্যারিবীয় টেকটোনিক প্লেটের সংযোগস্থলের কাছে অবস্থান করলেও ভেনেজুয়ায় শক্তিশালী ভূমিকম্প লাতিন আমেরিকার অন্যান্য অঞ্চলের তুলনায় তুলনামূলকভাবে কম ঘটে।
রদ্রিগেজ উদ্ধার অভিযানে সহায়তার জন্য বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোকে ভারী নির্মাণযন্ত্র সরবরাহের আহ্বান জানান। তিনি আরও জানান, জাতিসংঘ অনুমোদিত অনুসন্ধান ও উদ্ধারকারী দল ভেনেজুয়ার পথে রয়েছে।
আন্তর্জাতিক সহায়তার আশ্বাস
ভয়াবহ এই প্রাকৃতিক দুর্যোগের পর আর্জেন্টিনা, চিলি, পানামা ও উরুগুয়েসহ বিভিন্ন দেশ ভেনেজুয়াকে সহায়তার প্রস্তাব দিয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও এক্সে এক পোস্টে জানিয়েছেন, যুক্তরাষ্ট্র তাৎক্ষণিকভাবে অনুসন্ধান ও উদ্ধারকারী দল, চিকিৎসা এবং ত্রাণ সহায়তা পাঠাচ্ছে।
এ বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে ধন্যবাদ জানিয়ে রদ্রিগেজ জানান, তিনি রুবিওর সঙ্গে টেলিফোনে কথা বলেছেন। এছাড়া কাতার, মেক্সিকো ও এল সালভাদোরও ইতোমধ্যে উদ্ধারকর্মী পাঠিয়েছে।
এল সালভাদোরের প্রেসিডেন্ট নায়িব বুকেলে, ইকুয়েডরের প্রেসিডেন্ট দানিয়েল নোবোয়া এবং বলিভিয়ার প্রেসিডেন্ট রদ্রিগো পাজও সহায়তার আশ্বাস দিয়েছেন।
আতঙ্কে ঘর ছেড়ে রাস্তায় মানুষের ঢল
টেলিভিশন সম্প্রচারে দেখা গেছে, উদ্ধারকর্মীরা ধসে পড়া ভবনের ধ্বংসস্তূপ সরাতে ভারী যন্ত্রপাতি ব্যবহার করছেন। অনেক মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত ভবন এড়িয়ে গাড়ি, মেট্রো স্টেশন ও অন্যান্য খোলা স্থানে রাত কাটিয়েছেন।
কারাকাসের বাসিন্দা হেক্তর রিচ্চি বলেন, ‘প্রথমে কম্পনটা মৃদু ছিল, পরে ধীরে ধীরে তীব্র হতে থাকে। শেষ পর্যন্ত আমাদের সবাইকে ঘর ছেড়ে বাইরে এসে একত্র হতে হয়েছে।’
আরেক বাসিন্দা রবার্তো গামা বলেন, ‘আমাদের ভবনটি প্রচণ্ডভাবে দুলছিল। এমন শক্তিশালী কম্পন আগে অনুভব করিনি।’
ভূমিকম্পের পর ভেনেজুয়ার বিভিন্ন অঞ্চলে মোবাইল ফোন নেটওয়ার্ক বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। একে অনেক পরিবারের উদ্বেগ আরও বেড়ে যায়।
দেশটির স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী দিয়োসদাদো কাবেলো জনগণকে ধৈর্য ধরার আহ্বান জানিয়ে বলেন, ‘আমরা নির্ধারিত প্রোটোকল অনুসরণ করে উদ্ধার ও ত্রাণ কার্যক্রম পরিচালনা করছি। শিশু ও বয়স্কদের বিষয়ে বিশেষ সতর্ক থাকুন; আত্মীয়স্বজনের খোঁজ নিন।’
ব্রাজিল ও কলম্বিয়াতেও কম্পন অনুভূত
ভূমিকম্পের কম্পন ব্রাজিলের আমাজন অঞ্চলের মানাউস, বেলেম ও মাকাপা শহরে অনুভূত হয়েছে। কলম্বিয়ার ক্যারিবীয় উপকূল ও উত্তর-পূর্বাঞ্চলেও কম্পন টের পাওয়া গেছে।
ভূমিকম্পের পর মার্কিন প্যাসিফিক সুনামি সতর্কীকরণ কেন্দ্র কয়েকটি সুনামি সতর্কতা জারি করলেও পরে সেগুলো প্রত্যাহার করে জানানো হয়, সুনামির কোনো আশঙ্কা নেই।
একাধিক ভূ-ফলকের সংযোগস্থলে অবস্থান করলেও ভেনেজুয়ায় শক্তিশালী ভূমিকম্প তুলনামূলক বিরল। তবে মেক্সিকো ও চিলির মতো লাতিন আমেরিকার প্রশান্ত মহাসাগরীয় উপকূলীয় দেশগুলোতে এ ধরনের ভূমিকম্প বেশি ঘটে। ভূকম্পনপ্রবণ ‘রিং অব ফায়ার’ অঞ্চলে অবস্থিত হওয়ার কারণে ওইসব অঞ্চলে ভূমিকম্পের প্রবণতা বেশি।