প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা ও বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য রুহুল কবির রিজভী বলেছেন, একটি ভগ্নস্তুপের ওপর দাঁড়িয়ে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের (বিএনপি) নেতৃত্বাধীন সরকার বা তার জোটের সরকার প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। সেই ভগ্নস্তুপের ওপর দাঁড়িয়েই রাষ্ট্র পুনর্গঠনের কাজ চলছে।
সোমবার (১৭ আগস্ট) সরকারের দায়িত্ব নেওয়ার ১৮০ দিন বা ছয় মাস পূর্তি উপলক্ষে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে তিনি এসব কথা বলেন। রাজধানীর তেজগাঁওয়ে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে সকালে এ সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করা হয়।
রিজভী বলেন, গুম, খুন ও নজিরবিহীন দুর্নীতির এক চরম বিধ্বস্ত অবস্থার মধ্যে বর্তমান বিএনপি নেতৃত্বাধীন সরকার দেশ পরিচালনার দায়িত্ব নিয়েছে।
বিগত সরকারের সময় দেশের সার্বিক অবস্থার কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, ‘চারদিকে ছিল অরাজকতা-নৈরাজ্যের এক ধূসর পরিবেশ। কে কখন গুম হয়ে যাবে, কে কখন অদৃশ্য হয়ে যাবে, তার কোনো ইয়ত্তা ছিল না। বিচারবহির্ভূত হত্যা লেগেই ছিল এবং প্রত্যেকটি ছিল রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত।’
তিনি আরও বলেন, কেউ খালের ধারে, কেউ নদীর ধারে, কেউ পুকুরের ধারে—প্রতিদিন একটার পর একটা মরদেহ পাওয়া যেত। সে মরদেহ উপজেলা চেয়ারম্যানের হতে পারে, সাবেক এমপির হতে পারে, কোনো ছাত্রনেতার হতে পারে কিংবা কোনো যুবনেতার হতে পারে। যারা গত সরকারের রাজনৈতিক মতামতের ভিন্নমত পোষণ করত, তাদের ওপরও নির্যাতন হয়েছে। একজন সাবেক এমপিকে নৌকার মধ্যে পিটিয়ে হত্যা করা হয়েছে।
রিজভী বলেন, ‘এই নৈরাজ্যের ঘন অন্ধকারের মধ্যে একটি বিপুল তরঙ্গের আন্দোলনের মধ্য দিয়ে আমরা ৫ আগস্ট পেলাম এবং একটি পরিবর্তন ঘটল। কিন্তু যে লিগ্যাসি বা ধারাবাহিকতা অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে এবং অন্যান্য ক্ষেত্রে তৈরি হয়েছিল, সেটি রাতারাতি নির্মাণ বা পুনর্গঠন করা সম্ভব নয়।’
তিনি বলেন, বাংলাদেশ ব্যাংকের ৮৫০ কোটি টাকা উধাও হয়ে গেল, উড়ে গেল এবং সেটা উড়ে বেড়াল কোথায়? ফিলিপাইনের জুয়ার আসরের ক্যাসিনোর মধ্যে। সোনালী ব্যাংক, বেসিক ব্যাংক—একটার পর একটা ব্যাংক লোপাট হয়ে গেল। অর্থনীতিতে এক কঠিন অবস্থা তৈরি হয়েছিল।
রিজভীর ভাষায়, লোক দেখানো কিছু মেগা প্রকল্পের নামে মেগা লুটপাট, মেগা দুর্নীতির রূপকথার সমস্ত গল্প আমরা সেই সময় শুনে এসেছি। সেই পরিস্থিতির পর আজকে নতুন একটি সরকার এসেছে। যে সরকার অবাধ, সুষ্ঠু ও অন্তর্ভুক্তিমূলক নির্বাচনের মধ্য দিয়ে ক্ষমতায় এসেছে এবং ক্ষমতায় এসে রাষ্ট্র পরিচালনা করছে।
নির্বাচনের আগে দেওয়া প্রতিশ্রুতির প্রসঙ্গ তুলে বিএনপির এই নেতা বলেন, নির্বাচনের প্রাক্কালে সরকারপ্রধান ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান যেসব প্রতিশ্রুতি ও অঙ্গীকার করেছিলেন, ক্ষমতা গ্রহণের প্রায় প্রথম দিন বা দ্বিতীয় দিন থেকেই সেগুলো বাস্তবায়নের কর্মযজ্ঞ শুরু করেছেন তিনি।
তিনি বলেন, ফ্যামিলি কার্ড, কৃষক কার্ড, খাল খনন, বৃক্ষরোপণসহ নানাবিধ কর্মকাণ্ডের মধ্য দিয়ে প্রধানমন্ত্রী যে প্রতিশ্রুতিগুলো দিয়েছিলেন, সেই কর্মকাণ্ডগুলো অব্যাহত রেখেছেন। দিনরাত নিরন্তর প্রচেষ্টার মধ্য দিয়ে তার প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নে তিনি কোনো ধরনের কমতি করছেন না।
প্রধানমন্ত্রীর এই উপদেষ্টা বলেন, বিভিন্ন প্রাকৃতিক দুর্যোগ ও আন্তর্জাতিক বিভিন্ন ঘটনা সরকারের উন্নয়নের গতিতে বাধা সৃষ্টি করেছে। এর মধ্যে বিভিন্ন দুর্যোগ, প্রাকৃতিক দুর্যোগ এবং আন্তর্জাতিক বিভিন্ন ঘটনাপ্রবাহ আমাদের সুষ্ঠ উন্নয়নের যে গতি, সেখানে অনেকটা বাধা হয়েছে। কিন্তু সে বাধা থাকার পরেও সেটাকে অতিক্রম করে এই সরকার জনগণের স্বস্তির জন্য এবং জনগণের কল্যাণের জন্য তার কাজ অব্যাহত রেখেছে।
তিনি বলেন, সামাজিক সুরক্ষা থেকে শুরু করে অবকাঠামোগত উন্নয়ন, শিক্ষা ও স্বাস্থ্য—প্রত্যেকটি ক্ষেত্রে প্রধানমন্ত্রী তার প্রতিশ্রুতি রক্ষার চেষ্টা করে যাচ্ছেন।
রিজভীর ভাষ্য, আজকে বিভিন্ন সেক্টরে যে সমস্ত সংকট আমরা দেখি, সেই সংকটগুলো উত্তরণের জন্য প্রয়োজনীয় যে নির্দেশনা, সে নির্দেশনা প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান দিচ্ছেন।
তিনি বলেন, একটা দেশে মহামারি আসতে পারে, নানা প্রাকৃতিক দুর্যোগ আসতে পারে, বন্যা আসতে পারে, ভূমিকম্প হতে পারে। কিন্তু জনগণের একটি সরকার সেগুলোকে মোকাবিলা করে মানুষের কল্যাণে কাজ করে যাওয়াই হচ্ছে সেই সরকারের ব্রত। কারণ এই সরকার নির্বাচিত সরকার। আর নির্বাচিত সরকার হওয়ার কারণেই প্রতিটি ক্ষেত্রে, প্রতিটি স্তরে জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা জরুরি। আজকের অনুষ্ঠানটি সেই জবাবদিহিতারই একটি অংশ।
তিনি আরও বলেন, ‘বৃহত্তর জবাবদিহিতা কার কাছে? জনগণের কাছে। আর জনগণের কাছে জবাবদিহিতা কীভাবে হয়? একটি সরকারের পার্লামেন্টের মাধ্যমে এবং গণমাধ্যমের সাংবাদিকদের মাধ্যমে।’
রিজভী বলেন, ছয় মাসে সরকারের অগ্রগতি, অর্জন এবং বিভিন্ন ক্ষেত্রে বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের কর্মকাণ্ড সম্পর্কে সংবাদ সম্মেলনে সাংবাদিকদের জানানো হবে।
এ সময় সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিত ছিলেন প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা নজরুল ইসলাম খান ও ইসমাইল জবিউল্লাহ, তথ্য ও সম্প্রচারমন্ত্রী জহির উদ্দিন স্বপন, তথ্য ও সম্প্রচার প্রতিমন্ত্রী ইয়াসের খান চৌধুরী, তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বপ্রাপ্ত উপদেষ্টা ডা. জাহেদ উর রহমান, প্রধানমন্ত্রীর প্রেস সচিব সালেহ শিবলী, অতিরিক্ত প্রেস সচিব আতিকুর রহমান রুমনসহ প্রধানমন্ত্রীর প্রেস উইংয়ের সদস্যরা।