প্রায় চার মাস পর চাঁদপুর বড় স্টেশন মাছঘাটে ইলিশের সরবরাহ উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। এতে গত কয়েকদিনে জেলার বাজারগুলোতে ইলিশের দাম কেজিপ্রতি গড়ে প্রায় ৪০০ টাকা কমেছে। সরবরাহ বাড়ায় মাছঘাট ও সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীদের মধ্যে ব্যস্ততাও বেড়েছে।
মৎস্য ব্যবসায়ীরা জানান, ৩০ এপ্রিল জাটকা ধরার ওপর সরকারি নিষেধাজ্ঞা শেষ হওয়ার পর গত চার মাস ধরে চাঁদপুর বড় স্টেশন মাছঘাটে প্রতিদিন গড়ে ৫০ থেকে ৭০ মণ ইলিশ আসত। তবে গত কয়েকদিনে সরবরাহ বেড়ে প্রতিদিন গড়ে ২০০ থেকে ২৫০ মণ ইলিশ আসছে।
চাঁদপুর বড় স্টেশন মাছঘাট ঘুরে দেখা গেছে, তিন দিন আগেও এক কেজি ওজনের ইলিশ ২ হাজার ৯০০ থেকে ৩ হাজার টাকায় বিক্রি হলেও সরবরাহ বাড়ায় বর্তমানে তা ২ হাজার ৫০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। শহরের বিপণীবাগ কাঁচাবাজারে একই ওজনের ইলিশ বিক্রি হচ্ছে প্রায় ২ হাজার ৬০০ টাকায়।
এছাড়া ৮০০ থেকে ৯০০ গ্রাম ওজনের ইলিশ কেজিপ্রতি ২ হাজার টাকায় বিক্রি হচ্ছে, যা আগে ছিল প্রায় ২ হাজার ৫০০ টাকা। ৫০০ গ্রাম ওজনের ইলিশ বিক্রি হচ্ছে ১ হাজার ৪০০ থেকে ১ হাজার ৫০০ টাকায়; আগে যার দাম ছিল ১ হাজার ৮০০ থেকে ১ হাজার ৯০০ টাকা।
ব্যবসায়ীদের দাবি, বর্তমানে বাজারে আসা এসব ইলিশ পদ্মা নদীর টাটকা ইলিশ।
গেল সোমবার চাঁদপুর বড় স্টেশন মাছঘাটে দুই কেজি ওজনের একটি বড় বা ‘রাজা ইলিশ’ কেজিপ্রতি সাড়ে ৪ হাজার টাকা দরে বিক্রি হয়েছে। মোট ৯ হাজার টাকায় মাছটি কিনে নেন এক ইলিশপ্রেমী।
প্রবীণ মাছ বিক্রেতা আবুল হোসেন জানান, বড় ইলিশের স্বাদ তুলনামূলক ভালো হওয়ায় এর চাহিদাও বেশি।
ইলিশ গবেষক ড. আনিসুর রহমান বলেন, বর্তমানে ইলিশের মূল মৌসুম চলছে। অমাবস্যার প্রভাবে গত ২৮ আগস্ট থেকে ইলিশের সরবরাহ বেড়েছে। তিনি আশা করেন, আগামী অক্টোবর পর্যন্ত নদীতে জেলেদের জালে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ ইলিশ ধরা পড়বে।
চাঁদপুর মৎস্য ব্যবসায়ী সমিতির সাধারণ সম্পাদক ও প্রবীণ মৎস্য ব্যবসায়ী শবেবরাত সরকার বলেন, গত কয়েকদিন ধরে ঘাটে ইলিশের আমদানি বেড়েছে। প্রতিদিন গড়ে ২০০ থেকে ২৫০ মণ ইলিশ আসছে।
তিনি বলেন, ‘গত রবিবারও প্রায় সাড়ে ৩৫০ মণ ইলিশের আমদানি হয়েছে। এখন ইলিশের মৌসুম। সামনে আরও বেশি ইলিশ পাওয়া গেলে দাম আরও কমতে পারে।’
ইলিশের সরবরাহ বাড়ায় মাছঘাটের শ্রমিকদের ব্যস্ততাও বেড়েছে। শ্রমিক আল আমিন, মফিজ ও আনোয়ার হোসেন জানান, ইলিশের আমদানি বাড়ায় তাদের কাজও বেড়েছে। মাছ সংরক্ষণ ও প্যাকেটজাত করার জন্য বরফকলগুলোতেও ব্যস্ততা বেড়েছে।
মাছ ব্যবসায়ীরা জানান, বরফ গুঁড়া করে ইলিশ প্যাকেটজাত করার পর ট্রাকে করে দেশের বিভিন্ন জেলায় পাঠানো হয়।
ফরিদগঞ্জের সন্তোষপুর উচ্চবিদ্যালয়ের সহকারী প্রধান শিক্ষক জহিরুল আলম এবং নোয়াখালীর সাইফুর রহমান জীবন পরিবারের সদস্যদের নিয়ে মাছঘাটে ইলিশ কিনতে আসেন। তারা জানান, তুলনামূলক সুবিধাজনক দামে টাটকা ইলিশ কিনতে পেরে তারা সন্তুষ্ট।
এদিকে, মাছঘাটসংলগ্ন একটি কক্ষে অপেক্ষাকৃত নিম্নমানের বা ‘রিজেক্টেড’ ইলিশের পেট থেকে ডিম সংগ্রহ করে তা প্রক্রিয়াজাত ও প্যাকেট করতে দেখা গেছে কয়েকজন শ্রমিককে।
এ কাজে নিয়োজিত ব্যবসায়ীরা জানান, এক কেজি ইলিশের ডিমের প্যাকেট সাড়ে ৩ হাজার টাকা দরে বিক্রি হয়। বড় ইলিশ থেকে সংগ্রহ করা ডিমের দাম আরও বেশি—কেজিপ্রতি ৫ হাজার থেকে সাড়ে ৫ হাজার টাকা পর্যন্ত। এসব ডিম চট্টগ্রামসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে পাঠানো হয়।
ব্যবসায়ীদের ভাষ্য, তিন থেকে চার বছর আগে ইলিশের ডিম কেজিপ্রতি ১ হাজার ২০০ থেকে ১ হাজার ৫০০ টাকায় বিক্রি হলেও বর্তমানে এর দাম উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে।
ডিম ছাড়ানোর পর কিছু ইলিশে হালকা কাটার দাগ দিয়ে লবণ মাখিয়ে প্রক্রিয়াজাত করা হয়। পরে হলুদ মিশিয়ে শুকানো এসব ‘কাটা ইলিশ’ কেজিপ্রতি ১ হাজার ২০০ থেকে ১ হাজার ৩০০ টাকায় বিক্রি হয়। মানিকগঞ্জ, টাঙ্গাইল, জামালপুর, কিশোরগঞ্জ ও নেত্রকোনাসহ দেশের উত্তরাঞ্চলের বিভিন্ন জেলায় এ ধরনের লবণাক্ত ইলিশের চাহিদা রয়েছে বলে জানান ব্যবসায়ীরা।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, শত বছরের পুরোনো এবং চাঁদপুর জেলার সবচেয়ে বড় এ মাছঘাটে প্রায় দেড়শ ব্যবসায়ী ইলিশসহ বিভিন্ন ধরনের মাছের ব্যবসা করেন। ঘাটে প্রায় সাড়ে তিনশ দিনমজুর কাজ করেন।