ফরিদপুরে দুই উপজেলার সীমান্তবর্তী বাজারের নিয়ন্ত্রণ ও আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে বোয়ালমারীতে দুইপক্ষের মধ্যে হামলা ও দফায় দফায় সংঘর্ষে অন্তত ৩০ জন আহত হয়েছেন।
একপক্ষের হামলার ঘটনায় দুইজনকে আটক করা হয়েছে বলে সোমবার (৩১ আগস্ট) সকালে জানিয়েছেন বোয়ালমারী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মোস্তাফিজুর রহমান।
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, গেল শনিবার ময়েনদিয়া বাজারে হামলার পরদিন গতকাল রবিবার পরমেশ্বরদী ইউনিয়নের ধুলজোড়া সেতু এলাকায় বিকেল থেকে রাত সাড়ে ১০টা পর্যন্ত প্রায় সাড়ে ৭ ঘণ্টা ধরে দফায় দফায় সংঘর্ষ চলে। এতে উভয় পক্ষের অন্তত ৩০ জন আহত হন। তাদের মধ্যে গুরুতর আহত অবস্থায় কয়েকজনকে ফরিদপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে।
সংঘর্ষের ঘটনায় ময়েনদিয়া বাজার ও আশপাশের এলাকায় আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে। ফের সংঘর্ষের আশঙ্কায় ওই এলাকায় অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে।
পুলিশ জানায়, বোয়ালমারী উপজেলার পরমেশ্বরদী ইউনিয়নের ময়েনদিয়া বাজারটি বোয়ালমারী ও সালথা উপজেলার সীমান্তবর্তী এলাকায় অবস্থিত। বাজারের নিয়ন্ত্রণ ও আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে পরমেশ্বরদী ইউনিয়নের বরখাস্ত হওয়া চেয়ারম্যান (৫ আগস্টের পর) ও আওয়ামী লীগ থেকে বিএনপিতে যোগ দেওয়া আব্দুল মান্নান মাতুব্বর এবং পার্শ্ববর্তী সালথা উপজেলার খাড়দিয়া গ্রামের বিএনপি নেতা মুশফিক বিল্লাহ জিহাদের (মানবতাবিরোধী মামলায় সাজাপ্রাপ্ত আসামি সাবেক জামায়াত নেতা আবুল কালাম আজাদ ওরফে বাচ্চুর ছেলে) মধ্যে দীর্ঘদিন ধরে বিরোধ চলে আসছে।
এলাকাবাসীর বরাত দিয়ে পুলিশ আরও জানায়, গত ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর বাজারের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে দুইপক্ষের বিরোধ আরও তীব্র হয়। ওই সময় জিহাদের সমর্থকদের বিরুদ্ধে আব্দুল মান্নান মাতুব্বর ও তার ভাই সিদ্দিক মাতুব্বরের বাড়িঘরে হামলা, ভাঙচুর, লুটপাট ও অগ্নিসংযোগের অভিযোগ উঠে। এরপর মান্নান মাতুব্বরসহ তার পক্ষের লোকজন এলাকা ছেড়ে গেলে জিহাদপন্থি লোকজন ময়েনদিয়া বাজারের নিয়ন্ত্রণ নেয়।
পরবর্তীতে জাতীয় সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে আব্দুল মান্নান মাতুব্বর ও তার পক্ষের লোকজন এলাকায় ফিরে এলে বাজারের নিয়ন্ত্রণ ও আধিপত্য নিয়ে দুইপক্ষের মধ্যে ফের উত্তেজনা দেখা দেয়।
এরই ধারাবাহিকতায় গেল শুক্রবার ময়েনদিয়া দাইপাড়া এলাকায় একটি দোকানে হামলার অভিযোগ ওঠে। ব্যবসায়ীদের অভিযোগ, জিহাদের কয়েকজন সমর্থক ওই হামলা চালায়। এর পরদিন শনিবার ময়েনদিয়া বাজারে গেলে জিহাদপন্থি যুবদল নেতা সোলায়মান মাতুব্বরের সঙ্গে স্থানীয়দের বাগ্বিতণ্ডা হয়। এ সময় এক ইলেকট্রনিক পণ্য ব্যবসায়ীর কাছে ৪ হাজার টাকা চাঁদা দাবির অভিযোগ ওঠে। পরে ব্যবসায়ী ও স্থানীয়রা জড়ো হলে হাতাহাতির ঘটনা ঘটে। এতে সোলায়মান আহত হন।
খবর পেয়ে জিহাদ বাজারে গিয়ে সোলায়মানকে উদ্ধার করে একটি ফার্মেসিতে প্রাথমিক চিকিৎসার ব্যবস্থা করেন। জিহাদের অভিযোগ, সেখানে রামদা, চাইনিজ কুড়াল ও লোহার পাইপসহ দেশীয় অস্ত্র নিয়ে একদল লোক ঢুকে তার ওপর হামলা চালায়। এতে তিনিও গুরুতর আহত হন। এ হামলার জন্য তিনি মান্নান মাতুব্বর ও তারা মিয়ার নেতৃত্বে কয়েকজনকে দায়ী করেন।
জিহাদপন্থি যুবদল নেতা মাহবুব হাসান সজিব বলেন, দীর্ঘদিন ধরে মান্নান মাতুব্বর বাজারে প্রভাব বিস্তার করে আসছেন। বাজারকে তার প্রভাবমুক্ত করতে জিহাদকে উপদেষ্টা করা হয়েছিল। গেল শনিবার মান্নান মাতুব্বরের লোকজন দেশীয় অস্ত্র নিয়ে হামলা চালালে জিহাদ ও সোলায়মান আহত হন।
অন্যদিকে, ময়েনদিয়া বাজারের ব্যবসায়ী মজিবর রহমান মোল্যার অভিযোগ, জিহাদ লোকজন নিয়ে এলাকায় এসে হামলা চালান। সাধারণ দোকানি ও স্থানীয় বাসিন্দাদের কাছ থেকে চাঁদা দাবি করা হয় এবং চাঁদা না দিলে মারধর ও হুমকি দেওয়া হয়।
ব্যবসায়ী মাওলানা মাসুদুর রহমানও কয়েকজনের বিরুদ্ধে দীর্ঘদিন ধরে চাঁদাবাজির অভিযোগ করেন। শনিবারও এক ব্যবসায়ীর কাছে চার হাজার টাকা দাবি করা হয়েছিল বলে তিনি জানান।
অভিযোগের বিষয়ে আব্দুল মান্নান মাতুব্বর ও তারা মিয়ার সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাদের মোবাইল ফোন বন্ধ পাওয়া যায়। ফলে তাদের বক্তব্য নেওয়া সম্ভব হয়নি।
শনিবারের হামলার জের ধরে গতকাল বিকেল ৪টার দিকে পরমেশ্বরদী ইউনিয়নের ধুলজোড়া সেতু এলাকায় দুইপক্ষের লোকজন সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়ে। বিকেল থেকে রাত সাড়ে ১০টা পর্যন্ত প্রায় সাড়ে সাত ঘণ্টা ধরে দফায় দফায় সংঘর্ষ চলে। একপর্যায়ে সংঘর্ষটি আশপাশের এলাকাতেও ছড়িয়ে রণক্ষেত্রে পরিণত হয়।
পুলিশ ও স্থানীয়দের সূত্রে জানা গেছে, সালথার খাড়দিয়া গ্রামের হুমায়ন খাঁ, রফিক মোল্যা ও ইলিয়াস কাজীর নেতৃত্বে একপক্ষের লোকজনের সঙ্গে বোয়ালমারীর ময়েনদিয়ার আব্দুল মান্নান মাতুব্বরের পক্ষের লোকজনের সংঘর্ষ হয়। এতে উভয়পক্ষের অন্তত ৩০ জন আহত হন।
আহতদের বোয়ালমারী উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সসহ স্থানীয় বিভিন্ন হাসপাতালে চিকিৎসা দেওয়া হয়েছে। গুরুতর আহত পরমেশ্বরদী গ্রামের বাচ্চু মোল্যার ছেলে কবির মোল্যা, হাশেম মোল্যার ছেলে কামরুল মোল্যা ও মনসুর মোল্যার ছেলে লোকমান মোল্যাকে প্রাথমিক চিকিৎসা শেষে ফরিদপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়।
বোয়ালমারী উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের জরুরি বিভাগের চিকিৎসক ডা. ইজাজ আহমেদ শাওন গতকাল রাতে বলেন, সন্ধ্যার পর বেশ কয়েকজন আহত অবস্থায় হাসপাতালে আসেন। তাদের প্রাথমিক চিকিৎসা দেওয়া হয়েছে। গুরুতর তিনজনকে উন্নত চিকিৎসার জন্য ফরিদপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে।
এদিকে, সংঘর্ষের পর ময়েনদিয়া বাজার ও আশপাশের এলাকায় থমথমে পরিস্থিতি বিরাজ করছে। স্থানীয় বাসিন্দাদের আশঙ্কা, যেকোনো সময় দুইপক্ষের মধ্যে আবারও সংঘর্ষ বাধতে পারে। ব্যবসায়ীরাও রয়েছেন আতঙ্কে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে শনিবার থেকেই এলাকায় অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন রয়েছে।
ওসি মো. মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, জিহাদের ওপর হামলার ঘটনায় অভিযোগ পাওয়ার পর দুইজনকে গতকাল আটক করা হয়েছে। পরবর্তীতে দুইপক্ষের সংঘর্ষের ঘটনার খবর পেয়ে পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে। বর্তমানে পরিস্থিতি স্বাভাবিক রয়েছে। পরিবেশ শান্ত রাখতে এলাকায় অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে। বিষয়টি নিয়ে আইনগত ব্যবস্থা প্রক্রিয়াধীন রয়েছে।