লালমনিরহাটের ৫টি উপজেলার তীব্র গরমের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বেড়েছে অসহনীয় লোডশেডিং। দিনে-রাতে দফায় দফায় বিদ্যুতের ভেলকিবাজিতে স্থবির হয়ে পড়েছে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রা। একদিকে প্রচণ্ড তাপদাহ, অন্যদিকে রাতে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ না থাকায় তীব্র ঘুমহীনতায় ভুগছেন খেটে খাওয়া মানুষ। ফলে সকালে ঠিকমতো কাজে যেতে পারছেন না দিনমজুরেরা, যা তাদের ঠেলে দিচ্ছে চরম আর্থিক সংকটে।
পাঁচটি উপজেলার বিভিন্ন এলাকা ঘুরে জানা যায়, সকালের পর থেকেই শুরু হয় ঘন ঘন লোডশেডিং, যা চলে পরদিন ভোর পর্যন্ত। ভ্যাপসা গরম আর মশার উপদ্রবে সারা রাত ছটফট করে কাটাতে হয় শ্রমজীবীদের। পর্যাপ্ত ঘুম না হওয়ায় শারীরিক দুর্বলতা নিয়ে সকালে ভারী কাজে যাওয়া অসম্ভব হয়ে পড়ছে তাদের জন্য।
উপজেলার কাকিনা ইউনিয়নের ইশোরকোল গ্রামের দিনমজুর আজগার আলী আক্ষেপ করে বলেন, সারা রাত বিদ্যুৎ থাকে না, গরমে একফোঁটাও ঘুমাতে পারি না। সকালে চোখ খোলাই যায় না, শরীর এত দুর্বল লাগে যে কাজে যাওয়া সম্ভব হয় না। একদিন কাজ না করলে ঘরে চাল ওঠে না। পরিবার নিয়ে এখন কী করব বুঝতে পারছি না।
এই সংকটের প্রভাব পড়েছে ব্যাটারিচালিত রিকশা, ভ্যান ও অটোচালকদের ওপরও। সারা রাত বিদ্যুৎ না থাকায় যানবাহনের ব্যাটারি ঠিকমতো চার্জ হচ্ছে না।
লালমনিরহাট আদিতমারী উপজেলার মুমিনের গ্যারেজ সড়কের অটোচালক সাইদুর রহমান বলেন, রাতে কারেন্ট না থাকায় গাড়ি ঠিকমতো চার্জ দেওয়া যায় না। অর্ধেক চার্জ নিয়ে রাস্তায় নেমে মাঝপথেই গাড়ি বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। এতে দৈনন্দিন আয় অর্ধেকের নিচে নেমে এসেছে, সংসার চালানোই এখন দায়।
একই ভোগান্তির কথা জানান স্থানীয় ব্যবসায়ীরাও। লালমনিরহাট গোসলা বাজারের ব্যবসায়ী মমিনুর রহমান বলেন, ঘন ঘন লোডশেডিংয়ের কারণে আমাদের ব্যবসা-বাণিজ্য একপ্রকার বন্ধ হওয়ার উপক্রম। ফ্রিজে রাখা আইসক্রিম, কোমল পানীয়সহ পচনশীল পণ্য নষ্ট হয়ে চরম লোকসানে পড়ছি। দিনের বেলায় বিদ্যুৎ না থাকায় কাস্টমারও দোকানে বেশিক্ষণ দাঁড়াতে চায় না।
এদিকে, বিদ্যুৎ না থাকায় চরমভাবে ব্যাহত হচ্ছে শিক্ষার্থীদের পড়াশোনা। মোমবাতি বা কুপির আলোতে তীব্র গরমে পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়া কঠিন হয়ে পড়েছে।
উত্তর বাংলা কলেজের একাদশ শ্রেণির শিক্ষার্থী জাকিয়া সুলতানা জানান, রাতে ঘন ঘন লোডশেডিংয়ের কারণে পড়ালেখার মারাত্মক ক্ষতি হচ্ছে এবং ঠিকমতো ঘুম না হওয়ায় ক্লান্তি পিছু ছাড়ছে না। বর্তমানে ইয়ারচেঞ্জ পরীক্ষা চলায় এই বিদ্যুৎ সংকট তাদের জন্য চরম ভোগান্তির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
দুহুলী এস সি উচ্চ বিদ্যালয়ের দশম শ্রেণীর শিক্ষার্থী আবু সাঈদ বলেন, সামনে তাদের নির্বাচনি পরীক্ষা, কিন্তু লোডশেডিংয়ের কারণে প্রস্তুতি নিতে চরম সমস্যা হচ্ছে।
কালীগঞ্জ নেসকো (বিক্রয় ও বিতরণ বিভাগ) নির্বাহী প্রকৌশলী মো. তরিকুল ইসলাম জানান, লালমনিরহাট কালীগঞ্জ উপজেলায় বর্তমানে বিদ্যুতের চাহিদা প্রায় ১৮ মেগাওয়াট, অথচ তার বিপরীতে জাতীয় গ্রিড থেকে পাওয়া যাচ্ছে মাত্র ৮ থেকে ৯ মেগাওয়াট। অর্ধেকেরও কম বিদ্যুৎ সরবরাহের কারণেই এই লোডশেডিং হচ্ছে। তবে জাতীয় গ্রিড থেকে বরাদ্দ বাড়লে দ্রুতই পরিস্থিতি স্বাভাবিক হবে।
চরম ভোগান্তিতে পড়া নিম্নআয়ের ও সাধারণ মানুষের আকুল দাবি, অন্তত রাতে বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করে তাদের স্বাভাবিক ঘুম, পড়ালেখা ও জীবিকা অর্জনের সুযোগ দেওয়া হোক।