সুনামগঞ্জের জলবায়ু ঝুঁকিপূর্ণ অঞ্চল হাওরের বোরো ফসল রক্ষা, বন্যা নিয়ন্ত্রণ, দ্রুত পানি নিষ্কাশন, নৌপথের প্রবহমানতা বৃদ্ধি ও সেচ সুবিধা বাড়াতে ১১ উপজেলার ৫১টি নদী ও খালের প্রায় ২০০ কিলোমিটার খননের পরিকল্পনা করেছে পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো)।
পাউবো কর্তৃপক্ষ জানায়, দীর্ঘদিন ধরে বালু ও পলিতে ভরাট হয়ে যাওয়া এবং বিভিন্ন স্থানে চর পড়ে নাব্যতা হারানো নদী ও খালগুলো খননের মাধ্যমে হাওরাঞ্চলের প্রাকৃতিক ভারসাম্য ফিরিয়ে আনার উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। ইতোমধ্যে সুনামগঞ্জের পাঁচটি নির্বাচনি এলাকার সংসদ সদস্যরা নদ-নদী ও খাল খননের তালিকা পাউবোতে পাঠিয়েছেন। সেই তালিকা যাচাই-বাছাই করে প্রায় ১৯৮ দশমিক ৩৯ কিলোমিটার নদী-খাল খননের জন্য উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাব (ডিপিপি) তৈরি করা হয়েছে। প্রায় ৩০০ কোটি টাকা ব্যয়ে প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করা হবে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।
পাউবো আরও জানায়, চলতি বছরই সংস্থাটির বিশেষজ্ঞ দল নদী-খাল খননের ডিপিপি তৈরি করেছে। পরে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের যাচাই-বাছাই শেষে তা মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়। বর্তমানে ডিপিপিটি পরিকল্পনা কমিশনে রয়েছে। ২০২৭-২০২৮ অর্থবছর থেকে খননকাজ শুরু হতে পারে বলে সংশ্লিষ্টরা আশা করছেন।
নদী-খাল খননের কাজে সমন্বয়ের জন্য পাউবো সুনামগঞ্জ কৃষি করপোরেশন ও স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরকেও চিঠি দিয়েছে। সংস্থাগুলো নিজেদের উদ্যোগে যেসব নদী ও খাল খনন করছে, সেগুলোর তালিকা চাওয়া হয়েছে।
প্রকল্পের আওতায় তাহিরপুরে মরা যাদুকাটা, বীরনগর খাল, কেন্দুয়া খালসহ ৯টি; ধর্মপাশায় কালিজানা খাল, চুনাই নদী, সুন্দরপুর খালসহ ১১টি; মধ্যনগরে পাশোয়া খালসহ দুটি এবং দিরাইয়ে বেতই নদী, হেরা চাপতি নদী, টেংরাখালী খালসহ আটটি নদী-খাল খনন করা হবে।
এছাড়া জগন্নাথপুর ও শান্তিগঞ্জে দুটি, সুনামগঞ্জ সদর উপজেলায় নৌকাখালি, তেঘরিয়া খাল, জিরাগ নদীসহ সাতটি, বিশ্বম্ভরপুরে ধামালিয়া, করচার খালসহ পাঁচটি, দোয়ারাবাজারে মরা খাশিয়ামারা নদীসহ তিনটি এবং ছাতকে বটের খাল, মাছুখালসহ তিনটি নদী-খাল খননের পরিকল্পনা রয়েছে।
পাউবো ঠিকাদারদের মাধ্যমে এসব নদী-খাল খনন করবে। তবে খননকাজ যথাযথভাবে বাস্তবায়নের জন্য নজরদারি বাড়ানোর আহ্বান জানিয়েছেন হাওর বাঁচাতে কাজ করা বিভিন্ন সংগঠনের নেতৃবৃন্দ। তাদের অভিযোগ, অতীতে নদী-খাল খননে ব্যাপক অনিয়ম ও দুর্নীতি এবং বিপুল অর্থ লোপাট হয়েছে।
হাওর বাঁচাও আন্দোলনের সহসভাপতি অধ্যাপক চিত্তরঞ্জন তালুকদার বলেন, হাওর এলাকার বৈশিষ্ট্যই হলো অসংখ্য নদ-নদী ও খাল। নানা কারণে এগুলো ভরাট হয়ে গেছে, বদলে গেছে গতি-প্রকৃতি। দখল ও দূষণে অনেক নদী-খালের চিহ্নও মুছে গেছে। এ কারণে বন্যায় দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে জেলাবাসীকে। একদিকে সেচ সুবিধা সংকুচিত হয়েছে, অন্যদিকে আগাম বন্যায় ফসলডুবির ঘটনা ঘটছে। মাছ উৎপাদনেও এর প্রভাব পড়েছে।
হাওর ও নদী রক্ষা আন্দোলনের সহসভাপতি শাহ কামাল বলেন, নদী ও খাল খনন করা হলে হাওরের বন্যা নিয়ন্ত্রণ, ফসল উৎপাদন ও মৎস্য উৎপাদনে বিরাট প্রভাব পড়বে। তবে খনন হতে হবে বৈজ্ঞানিক উপায়ে ও প্রকৃতির সঙ্গে খাপ খাইয়ে। না হলে খননের নামে সরকারের অর্থ অপচয় হবে বলে সতর্ক করেন তিনি।
সুনামগঞ্জ পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী-২ মো. ইমদাদুল হক বলেন, ‘আমরা চলতি বছরই ১৫১টি খাল ও নদী খননের ডিপিপি করে মন্ত্রণালয়ে পাঠিয়েছি। এখন পরিকল্পনা কমিশনে আছে। খাল ও নদী খননে প্রাথমিকভাবে প্রায় ৩০০ কোটি টাকা ব্যয় হতে পারে। খনন হলে এই এলাকার ফসল রক্ষা, বন্যা নিয়ন্ত্রণ, পাহাড়ি ঢল ও বন্যার সময় বিভিন্ন অবকাঠামো সুরক্ষা, কৃষি ও সেচ সুবিধা বৃদ্ধিসহ নানা ক্ষেত্রে বিরাট উপকার নিয়ে আসবে। আমরা আশা করি ২০২৭-২০২৮ অর্থবছর থেকেই কাজ শুরু হবে।’