তিস্তা চুক্তি নিয়ে ভারতের সঙ্গে বারবার আলোচনা হলেও তা বাস্তবায়িত না হওয়ায় হতাশা প্রকাশ করে পানিসম্পদমন্ত্রী শহীদউদ্দীন চৌধুরী এ্যানি বলেছেন, বন্ধুপ্রতিম দেশ হিসেবে ভারতের যেমন স্বার্থ রয়েছে, বাংলাদেশের স্বার্থের প্রতিও তাদের নজর দিতে হবে। দুই দেশের বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্কে কোনো ধরনের অবনতি চান না বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
‘তিস্তা চুক্তি নিয়ে বারবার আলোচনা হয়েছে; হয়ে যায়, হয়ে যায়—কিন্তু হয় না,’ উল্লেখ করে মন্ত্রী বলেন, ‘পার্শ্ববর্তী দেশ বন্ধু দেশ। তাদেরও চিন্তা করতে হবে, তাদের যেমন স্বার্থ রয়েছে, আমাদেরও স্বার্থ আছে। বন্ধু দেশই তো বন্ধু দেশের স্বার্থ রক্ষা করবে। আমাদের স্বার্থের প্রতিও তারা নজর দেবেন। আমাদের সঙ্গে তাদের বন্ধুত্বের সম্পর্কের অবনতি হোক—এটা কখনো আমরা চাই না।’
সোমবার (১৭ আগস্ট) সকালে বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) অ্যাকাডেমিক কাউন্সিল ভবনে পানি সম্পদ মন্ত্রণালয় ও বুয়েটের পানি সম্পদ কৌশল বিভাগ আয়োজিত ‘তিস্তা নদীর টেকসই ব্যবস্থাপনা’ শীর্ষক সেমিনারে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।
এ্যানি বলেন, তিস্তা প্রকল্প বাস্তবায়ন সরকারের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও চ্যালেঞ্জিং। উত্তরাঞ্চলের পাঁচ-ছয়টি জেলার মানুষের এ প্রকল্প নিয়ে ব্যাপক প্রত্যাশা রয়েছে। প্রকল্প বাস্তবায়নে ব্যর্থ হলে দীর্ঘদিন ধরে ক্ষতিগ্রস্ত তিস্তাপাড়ের মানুষের সমস্যা আরও বাড়বে।
‘এই চ্যালেঞ্জকে ওভারকাম করতেই হবে,’ বলেন তিনি।
মন্ত্রী জানান, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান তিস্তা প্রকল্পের অগ্রগতি নিয়ে নিয়মিত আলোচনা করছেন। বিভাগীয় ও আন্তঃমন্ত্রণালয় বৈঠকে প্রকল্পটির বর্তমান অবস্থা এবং কীভাবে এটি দৃশ্যমান করা যায়, তা নিয়ে আলোচনা হচ্ছে।
তিনি বলেন, তিস্তা নদীর গতিপ্রকৃতি ও সীমান্তবর্তী অবস্থানের কারণে এর ব্যবস্থাপনা সহজ নয়। নদীটি সীমান্ত পেরিয়ে বাংলাদেশে প্রবেশ করায় এর প্রবাহ পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণ করাও কঠিন। আবার নদীকে নিয়ন্ত্রণ করতে গিয়ে সম্ভাব্য পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ার বিষয়টিও বিবেচনায় নিতে হবে। এ কারণে তিস্তা ব্যবস্থাপনায় শুধু টেকসই নয়, একটি সমন্বিত সমাধান প্রয়োজন বলে মনে করেন তিনি।
এ্যানি বলেন, ‘একেকজন বিশেষজ্ঞ একেক ধরনের মতামত দিয়েছেন। মতামতের মধ্যেও পার্থক্য আছে। এ জন্য আমি শুধু টেকসই বলব না, আমি বলব এটাকে একটা ইন্টিগ্রেটেড ওয়েতে আমাদের নিয়ে আসতে হবে। একটা সমন্বিত সমাধান আমাদের দরকার।’
তিনি বলেন, বিস্তারিত সমীক্ষার ভিত্তিতে এমন একটি পরিকল্পনা নিতে হবে, যাতে বাস্তবায়নের পর্যায়ে কোনো ধরনের হোঁচট খেতে না হয়। পানি বিশেষজ্ঞদের মতামতের পাশাপাশি প্রকৌশলী ও পরিবেশ বিশেষজ্ঞদের মতামতও বিবেচনায় নিতে হবে। ‘আমরা যেন কোনোভাবেই আমাদের এই প্রজেক্টটা ফেইল না করি,’ বলেন তিনি।
তিনি আরও বলেন, দেশের উন্নয়ন এবং উত্তরাঞ্চলের নদীভাঙনকবলিত মানুষের স্বার্থে তিস্তা প্রকল্প বাস্তবায়নের প্রতিশ্রুতি পূরণ করতে সরকার কাজ করছে। এ জন্য দেশি-বিদেশি বিশেষজ্ঞদের কারিগরি সহযোগিতা নেওয়া হবে।
তিস্তা প্রকল্পে কারিগরি সহায়তার বিষয়ে চীন ও নেদারল্যান্ডসের সঙ্গে আলোচনা হয়েছে। অন্য কোনো দেশ থেকেও এ ধরনের সহায়তা পাওয়া গেলে তা গ্রহণ করা হবে বলে তিনি জানান।
তিস্তা চুক্তির প্রসঙ্গে পানিসম্পদমন্ত্রী বলেন, চুক্তিটি বাংলাদেশের জন্য অত্যন্ত প্রয়োজনীয়। এর আগে শহিদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়াও তিস্তা প্রকল্পের বিষয়ে আন্তরিক ছিলেন। কিন্তু গত ১৭ বছরে দেশের স্বার্থবিরোধী অনেক কাজ হয়েছে বলে মন্তব্য করেন তিনি।
তার কথায়, ‘এখন দেশের স্বার্থে, জনগণের স্বার্থে আমাদের এই চ্যালেঞ্জ নিয়েই তিস্তা চুক্তি এবং তিস্তা মহাপরিকল্পনা নামেই হোক অথবা আমরা এই প্রকল্পটাকে বাস্তবায়নের স্বার্থে যা যা করা দরকার, আমরা সে বাস্তবায়নের দিকে এগিয়ে যাব।’
তিস্তাপাড়ের মানুষের দীর্ঘদিনের দাবির কথা তুলে ধরে মন্ত্রী বলেন, প্রকল্পটি দ্রুত বাস্তবায়ন করা জরুরি। এ জন্য বিশেষজ্ঞদের সহযোগিতা কামনা করেন তিনি।
পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের সচিব এ কে এম শাহাবুদ্দিনের সভাপতিত্ব সেমিনারে বিশেষ অতিথি হিসেবে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণমন্ত্রী আসাদুল হাবিব দুলু, পানি সম্পদ প্রতিমন্ত্রী ফরহাদ হোসেন আজাদ এবং বুয়েটের উপাচার্য অধ্যাপক ড. একরামুল হক বক্তব্য দেন।