একটি ছোট রিভিউ, একটি ছবি কিংবা সংশোধন করা একটি তথ্য—সাধারণ চোখে এগুলো হয়তো খুব ছোট ছোট কাজ। কিন্তু এই ছোট কাজগুলোই কোনো একটি জায়গায় যাওয়ার পথ সহজ করে দিতে পারে, কোনো ব্যবসাকে খুঁজে পেতে সাহায্য করতে পারে, এমনকি একটি দেশের ডিজিটাল পরিচয়কেও আরও সমৃদ্ধ করে তুলতে পারে।
গুগল ম্যাপসের বিশাল জগতের পেছনে এমন অসংখ্য মানুষের স্বেচ্ছাশ্রম কাজ করে যাচ্ছে। তারা নিজেদের দেখা, জানা ও অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে ম্যাপে নতুন স্থান যোগ করেন, ভুল তথ্য সংশোধন করেন, ছবি দেন, রিভিউ লেখেন, প্রবেশযোগ্যতার তথ্য জানান। বিনিময়ে তাদের হাতে আসে না কোনো পারিশ্রমিক। তবু কাজটি তারা করে চলেন—মানুষের পথচলা একটু সহজ করতে এবং পৃথিবীর মানচিত্রকে আরও নির্ভুল করে তুলতে।
এই স্বেচ্ছাসেবীদেরই বলা হয় গুগল ম্যাপস লোকাল গাইড।
গত ৩০ ও ৩১ জুলাই সিঙ্গাপুরের গুগল এশিয়া-প্যাসিফিক সদর দপ্তরে বসেছিল তাদেরই এক আন্তর্জাতিক মিলনমেলা ‘কানেক্ট লাইভ সিঙ্গাপুর ২০২৬’। বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে নির্বাচিত অভিজ্ঞ গুগল ম্যাপস কন্ট্রিবিউটরদের সঙ্গে বাংলাদেশ থেকেও অংশ নেন কয়েকজন লোকাল গাইড।
কারও কাছে এটি ছিল বহুদিনের স্বপ্নপূরণ, কারও কাছে আন্তর্জাতিক স্বীকৃতির মুহূর্ত, আবার কারও কাছে নিজের দেশ, সংস্কৃতি ও বাস্তবতার কথা বিশ্বমঞ্চে তুলে ধরার সুযোগ।
মালয়েশিয়াপ্রবাসী বাংলাদেশি দম্পতি পাভেল সারওয়ার ও সুমাইয়া জাফরিন চৌধুরী ছিলেন তাদের মধ্যে। তাদের সঙ্গে ছিলেন মো. খোকন সরকার, মো. শফিউল বাশার ও ফারহানা আক্তারসহ বাংলাদেশের আরও কয়েকজন লোকাল গাইড।
একটি মানচিত্র, অসংখ্য গল্প
আমরা সাধারণত গুগল ম্যাপ দেখি পথ খুঁজে নেওয়ার প্রযুক্তি হিসেবে। কোন রাস্তা দিয়ে যেতে হবে, কাছাকাছি কোথায় রেস্তোরাঁ, হাসপাতাল কিংবা দোকান আছে—এসব তথ্যের জন্য প্রতিদিন কোটি কোটি মানুষ এই সেবা ব্যবহার করেন।
কিন্তু যে মানচিত্রটি আমরা পর্দায় দেখি, তার পেছনে রয়েছে মানুষের অসংখ্য ছোট ছোট অবদান।
কোনো প্রতিষ্ঠানের নাম ঠিক করা, ভুল ঠিকানা সংশোধন করা, নতুন কোনো স্থান যুক্ত করা, ছবি দেওয়া, রিভিউ লেখা কিংবা কোনো স্থানের প্রবেশযোগ্যতার তথ্য জানানো—এসব কাজই ধীরে ধীরে একটি মানচিত্রকে আরও তথ্যসমৃদ্ধ করে। আর সেই কাজের বড় একটি অংশ করেন লোকাল গাইডরা।
পাভেল সারওয়ারের কাছে এই কাজের গুরুত্ব ব্যক্তিগত স্বীকৃতির চেয়েও বড়। তার মতে, গুগল ম্যাপসে অবদান রাখার অন্যতম উদ্দেশ্য হওয়া উচিত দেশের ইতিবাচক দিকগুলো বিশ্বের সামনে তুলে ধরা।
তিনি বলেন, ‘কোনো পুরস্কার বা স্বীকৃতির আশায় নয়, বরং দেশকে বিশ্বের সামনে ইতিবাচকভাবে তুলে ধরার লক্ষ্য নিয়ে কাজ করা উচিত।’ তার আহ্বান, সঠিক, নির্ভুল ও মানসম্মত তথ্য, ছবি ও রিভিউয়ের মাধ্যমে বাংলাদেশকে বিশ্বের কাছে আরও সমৃদ্ধভাবে তুলে ধরা।
৫০০ মিলিয়নের কমিউনিটি থেকে ১৫০ জন
কানেক্ট লাইভ গুগল লোকাল গাইডসের অন্যতম মর্যাদাপূর্ণ আন্তর্জাতিক আয়োজন। বিশ্বের বিশাল লোকাল গাইডস কমিউনিটি থেকে সীমিতসংখ্যক কন্ট্রিবিউটরকে বাছাই করে এ আয়োজনে আমন্ত্রণ জানানো হয়।
পাভেল সারওয়ার জানান, এবারের কানেক্ট লাইভ তিনটি ভিন্ন দেশে অনুষ্ঠিত হয়েছে এবং বিশ্বের বিশাল লোকাল গাইডস কমিউনিটি থেকে মাত্র ১৫০ জন কন্ট্রিবিউটর এতে অংশ নেওয়ার সুযোগ পেয়েছেন। তাই তার কাছে সিঙ্গাপুর সফর নিছক একটি আন্তর্জাতিক আয়োজনের অংশ নেওয়া নয়; বরং দীর্ঘদিনের অবদানের একটি আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি।
তবে সম্মেলনের বেশ কিছু আলোচনা নন-ডিসক্লোজার এগ্রিমেন্ট বা এনডিএর আওতায় থাকায় ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা কিংবা নতুন ফিচারের বিস্তারিত প্রকাশ করা সম্ভব নয় বলে জানান তিনি।
তবুও একটি বিষয় স্পষ্ট—গুগল ম্যাপসের ভবিষ্যৎ উন্নয়নে ব্যবহারকারীদের অভিজ্ঞতা, মতামত ও পরামর্শকে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। আর সেই আলোচনায় বিশ্বের বিভিন্ন দেশের সাধারণ ব্যবহারকারীদের পাশাপাশি বাংলাদেশের লোকাল গাইডদের অভিজ্ঞতাও জায়গা করে নিচ্ছে।