সুন্দরবনের চোরশিকারীদের ফাঁদ থেকে উদ্ধার করা বাঘটি চরম সংকটাপন্ন অবস্থায় রয়েছে। কয়েকদিন ধরে ফাঁদে আটকে থাকার কারণে বাঘটির সামনের বাঁ পায়ে পচন ধরেছে এবং রক্তনালী নষ্ট হয়ে গেছে। দীর্ঘ অনাহারে থাকার কারণে শরীরের মাংস ও শরীরের চর্বি ভেঙে বাঘটি হাড্ডিসার হয়ে গেছে।
খুলনা বন্যপ্রাণী উদ্ধার ও পুনর্বাসন কেন্দ্রে বাঘটির চিকিৎসা চলছে। এ বিষয়ে বন বিভাগ এবং পশু চিকিৎসকরা বলেছেন, প্রাণীটি ট্রমার মধ্যে রয়েছে। তাকে সুস্থ করতে প্রয়োজনীয় চিকিৎসা অব্যাহত রয়েছে।
উদ্ধার ও প্রাথমিক চিকিৎসা
উদ্ধার করা বাঘটি পুর্ণবয়স্ক স্ত্রী প্রজাতির এবং আনুমানিক বয়স ৩–৪ বছর। বন বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, ৩–৪ দিন আগে মোংলা উপজেলার শরকির খাল-সংলগ্ন এলাকায় চোরা হরিণ শিকারীদের ফাঁদে আটকা পড়ে বাঘটি। শনিবার বিকেলে এক জেলে বিষয়টি দেখে বন বিভাগকে খবর দেয়। রবিবার বিকেল ৩টার দিকে ট্রানকুইলাইজার ব্যবহার করে বাঘটিকে অচেতন করে উদ্ধার করা হয় এবং লোহার খাঁচায় খুলনা বন্যপ্রাণী উদ্ধার ও পুনর্বাসন কেন্দ্রে আনা হয়।
গাজীপুর সাফারি পার্কের পশু চিকিৎসা কর্মকর্তা ডা. জুলকারনাইন জানান, নাইলনের সুতা দিয়ে তৈরি ফাঁদে বাঘটির পা আটকে গভীর ক্ষত হয়েছে। পায়ের ওই অংশে পচন ধরা এবং রক্তনালী নষ্ট হওয়ার কারণে রক্ত চলাচল করছে না। শরীরে খনিজ ও লবণের ঘাটতিও দেখা দিয়েছে। নাক দিয়ে পানি ঝরে এবং অনাহারে থাকায় বাঘটি হাড্ডিসার হয়ে গেছে। স্প্রে ও ড্রেসিং প্রয়োগের মাধ্যমে চিকিৎসা চলছে, তবে তার শারীরিক অবস্থা এখনও স্থিতিশীল নয়।
ডা. জুলকারনাইন বলেন, ‘চিকিৎসার জন্য বাঘটিকে অন্যত্র নেওয়ার মতো অবস্থায় নেই। চেষ্টা চলছে সুস্থ করার। চিকিৎসায় সে সুস্থ হতে পারে, আবার নাও হতে পারে।’
চিরুনি অভিযান ও নিরাপত্তাব্যবস্থা
সুন্দরবন পূর্ব বিভাগের ডিএফও মো. রেজাউল করিম চৌধুরী জানিয়েছেন, চোরশিকারীদের ফাঁদ উদ্ধার এবং তাদের ধরার জন্য সোমবার সকাল থেকে সুন্দরবন পূর্ব বিভাগের বিভিন্ন এলাকায় চিরুনি অভিযান শুরু হয়েছে। বন বিভাগের স্টাফরা কর্ডন তৈরি করে তল্লাশি চালাচ্ছে। আগামী দুই দিন অভিযান চলবে। তবে সোমবার বিকেল পর্যন্ত কোনো শিকারী আটক বা ফাঁদ জব্দ করার খবর পাওয়া যায়নি।
তিনি আরও জানান, গত ৮ মাসে সুন্দরবন পূর্ব বিভাগের আওতাধীন এলাকায় প্রায় ৩৫ হাজার ফুট হরিণ শিকারের ফাঁদ জব্দ করা হয়েছে এবং বেশ কয়েকজন শিকারীকে আটক করা হয়েছে।
বাঘের স্বাস্থ্য পর্যবেক্ষণ
খুলনা বন্যপ্রাণী ও প্রকৃতি সংরক্ষণ বিভাগের ডিএফও নির্মল কুমার পাল বলেন, রবিবার সন্ধ্যার পর বাঘটির জ্ঞান ফিরেছে। তবে ট্রমার মধ্যে থাকায় সেটি হাঁটতে পারছে না; খাবারও খাচ্ছে না। পানির সাথে স্যালাইন এবং বিভিন্ন ওষুধ মিশিয়ে খাওয়ানো হচ্ছে। তবে বাঘটি খাবার খাচ্ছে না। সোমবার সকাল থেকে কয়েকবার বাঘটির মুখের সামনে মুরগির মাংস দিলেও খায়নি। বাঘটিকে সুস্থ করার জন্য চেষ্টা চলছে।
তিনি আরও বলেন, বাঘটি তাদের নিবিড় পর্যবেক্ষণে রয়েছে। বিশেষজ্ঞ টিম বাঘটির চিকিৎসা দিচ্ছে। প্রয়োজনে বাঘটিকে চিকিৎসার জন্য ঢাকায় স্থানান্তর করা হবে। সুন্দরবনের যে এলাকা থেকে বাঘটিকে উদ্ধার করা হয়েছে, সুস্থ হলে বাঘটিকে বনের ওই এলাকায় ছেড়ে দেওয়া হবে।
এই বাঘটির মতো আর কোনো বাঘ যেন সুন্দরবনে চোরা শিকারীদের ফাঁদে আটকা না পড়ে, সে বিষয়ে বন বিভাগ সতর্ক রয়েছে বলে জানান তিনি।
খুলনা অঞ্চলের বন সংরক্ষক ইমরান আহমেদ জানান, ফাঁদে আটকে থাকায় কয়েকদিন ধরে খাবার না খাওয়ায় বাঘটি দুর্বল হয়ে গেছে। তার চিকিৎসায় দেশি-বিদেশি পশু চিকিৎসকদের পরামর্শ নেওয়া হচ্ছে।
বিশেষজ্ঞদের মত
বন্যপ্রাণী বিশেষজ্ঞ ও ওয়াইল্ডটিমের প্রধান নির্বাহী অধ্যাপক ড. আনোয়ারুল ইসলাম বলেন, সুন্দরবন থেকে উদ্ধার বাঘটির চিকিৎসায় সর্বোচ্চ চেষ্টা চালানো হবে। দেশের সব বন বিভাগ, চিড়িয়াখানা, পশুসম্পদ মন্ত্রণালয় এবং কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের পশুরোগ বিশেষজ্ঞরা একত্রিত হয়ে বাঘটির চিকিৎসা এবং করণীয় নির্ধারণ করবেন।
তিনি বলেন, ‘সুন্দরবন, বন্যপ্রাণী এবং বনের সম্পদ রক্ষায় স্থানীয় জনগণকে আস্থার সঙ্গে সম্পৃক্ত করতে হবে। বিভিন্ন আইনপ্রয়োগকারী সংস্থার সঙ্গে সমন্বয় করে সুন্দরবন বিভাগকে কাজ করতে হবে।’
অধ্যাপক ড. আনোয়ারুল ইসলাম আরও বলেন, বাঘ সুন্দরবনের অভিভাবক এবং স্থানীয় জনগণ বাঘের অভিভাবক। বাঘ না থাকলে সুন্দরবন বাঁচবে না। বর্তমানে সুন্দরবনে ১২৫টি বাঘ রয়েছে। বাঘ রক্ষা করা দেশের জন্য অত্যাবশ্যক।
সুন্দরবনের বাঘ ও বন সংরক্ষণ
বন বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, সুন্দরবনের মোট আয়তন ৬ হাজার ১৭ বর্গকিলোমিটার, যার মধ্যে ৪ হাজার ১৪৩ বর্গকিলোমিটার স্থলভাগ। সুন্দরবনে প্রতিটি বাঘ তাদের আবাসস্থলের জন্য ১৪ থেকে ১৬ বর্গকিলোমিটার চিহ্নিত করে থাকে। পুরো সুন্দরবনে রয়েল বেঙ্গল টাইগার বিচরণ করে। চোরা শিকার, জলবায়ু পরিবর্তন ও লবণাক্ততা বৃদ্ধির কারণে এই ম্যানগ্রোভ বনে বাঘের অস্তিত্ব হুমকির মুখে রয়েছে।
বিগত কয়েক বছর ধরে ক্যামেরা ট্রাপিংয়ের মাধ্যমে বাঘের সংখ্যা নিরীক্ষণ করা হয়। ২০১৫ সালে সুন্দরবনে বাঘ ছিল ১০৬টি, ২০১৮ সালে ১১৪টি এবং ২০২৪ সালের অক্টোবরের জরিপ অনুসারে বর্তমানে সুন্দরবনে ১২৫টি বাঘ রয়েছে।