অস্ট্রেলিয়ার উত্তর কুইন্সল্যান্ডের সৈকতে রহস্যজনকভাবে ভেসে এসেছে ৬টি বড় আকৃতির গোলাকার বস্তু। প্রাথমিকভাবে এগুলোকে মহাকাশের ধ্বংসাবশেষ বা ‘স্পেস বল’ বলে ধারণা করছেন বিশেষজ্ঞরা।
বিশেষজ্ঞদের আশঙ্কা, এগুলো রকেটের জ্বালানি ব্যবস্থার অংশ হতে পারে এবং এর ভেতরে অত্যন্ত বিষাক্ত রকেট জ্বালানি অবশিষ্টাংশ থাকার সম্ভাবনা রয়েছে।
তবে এ নিয়ে স্থানীয় জনগণের জন্য কোনো ঝুঁকি নেই বলে জানিয়েছে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ।
অস্ট্রেলিয়ান স্পেস এজেন্সি স্থানীয় সময় রবিবার (৫ জুলাই) জানিয়েছে, রহস্যময় এসব বস্তু কোথা থেকে এসেছে, তা শনাক্তে তারা কাজ করছে। এর আগে পুলিশ জানিয়েছিল, বস্তুগুলোতে বিপজ্জনক রাসায়নিক পদার্থ থাকতে পারে বলে সন্দেহ করা হচ্ছে।
বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত ছবিতে দেখা গেছে, টাউনসভিলের ফরেস্ট বিচ এলাকায় সৈকতে ভেসে আসা বস্তুগুলো দেখতে বড় আকৃতির ধাতব গোলকের মতো।
রবিবার কুইন্সল্যান্ড ফায়ার ডিপার্টমেন্ট জানিয়েছে, সৈকত থেকে মোট ৬টি বস্তু উদ্ধার করা হয়েছে। এর মধ্যে ৫টি নিরাপদে ড্রামের মধ্যে সংরক্ষণ করা হয়েছে। আর ষষ্ঠ বস্তুটিকে নিরাপদে রাখার কাজ চলছে।
অন্যদিকে, ঘটনাটি নিয়ে স্থানীয়দের মধ্যে কৌতূহলেরও কমতি নেই। ‘ফরেস্ট বিচ টেকঅ্যাওয়ে’ নামে একটি স্থানীয় খাবারের দোকান ‘স্পেস জাঙ্ক স্ন্যাক বক্স’ নামে নতুন একটি খাবার বিক্রি শুরু করেছে। দোকানের সামনে থাকা একটি বোর্ডে মজার ছলে লেখা হয়েছে, ‘এই খাবার সৈকতে ভেসে আসা রহস্যময় বস্তু না, তাই নিশ্চিন্তে চিনে খেতে পারবেন।’
এদিকে, পুলিশ জানিয়েছে, সৈকতে রহস্যময় এসব বস্তু নিয়ে স্থানীয় জনগণের জন্য কোনো ধরনের ঝুঁকি নেই। এ বিষয়ে পুলিশও কোনো তদন্ত করছে না।
ফায়ার ডিপার্টমেন্ট এক বিবৃতিতে জানিয়েছে, আগামী কয়েক দিনে উত্তর কুইন্সল্যান্ডে এমন আরও ধ্বংসাবশেষ ভেসে আসতে পারে। তবে এতে সেখানের জনসাধারণের জন্য কোনো ঝুঁকি নেই। তারপরও স্থানীয়দের অস্ট্রেলিয়ান স্পেস এজেন্সির পরামর্শ ও তথ্য অনুসরণ করা উচিত।
বিবৃতিতে আরও বলা হয়েছে, উদ্ধার হওয়া বস্তুগুলোর প্রকৃতি ও উৎস এখনও নিশ্চিত হওয়া যায়নি।
পুলিশ এবং ন্যাশনাল ইমার্জেন্সি ম্যানেজমেন্ট এজেন্সির সঙ্গে কাজ করা অস্ট্রেলিয়ান স্পেস এজেন্সির একজন মুখপাত্র জানিয়েছেন, বস্তুগুলোকে প্রাথমিকভাবে মহাকাশের ধ্বংসাবশেষ বলেই মনে করা হচ্ছে।
অস্ট্রেলিয়ান স্পেস এজেন্সির এক বিবৃতিতে বলা হয়েছে, সংস্থাটি উত্তর কুইন্সল্যান্ডের ফরেস্ট বিচে পাওয়া সন্দেহভাজন মহাকাশের ধ্বংসাবশেষের বিষয়ে স্থানীয় কর্তৃপক্ষকে সহায়তা করছে। একই সঙ্গে তারা এসব বস্তুর প্রকৃতি ও উৎস শনাক্তে কাজ করছে।
এ বিষয়ে ফ্লিন্ডার্স বিশ্ববিদ্যালয়ের মহাকাশ প্রত্নতত্ত্ববিদ এবং মহাকাশের আবর্জনা বিষয়ক বিশেষজ্ঞ সহযোগী অধ্যাপক অ্যালিস গোরম্যান সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত একটি ভিডিও পর্যালোচনা বলেন, ‘বস্তুগুলোতে আগুনে পোড়া বা দগ্ধ হওয়ার কোনো চিহ্ন দেখা যাচ্ছে না।’
তিনি বলেন, ‘এতে ধারণা করা যায়, এগুলো কোনো রকেট উৎক্ষেপণের প্রথম বা দ্বিতীয় ধাপের অংশ হতে পারে, যা পৃথিবীতে ফিরে এসেছে। রকেটের বাকি অংশ পেলোড বহন করে মহাকাশে চলে গেছে।
তিনি আরও বলেন, ‘বস্তুগুলো রকেটের জ্বালানি ব্যবস্থার অংশের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ বলে মনে হচ্ছে। এগুলো টাইটানিয়াম সংকর ধাতু দিয়ে তৈরি চাপযুক্ত জ্বালানি সংরক্ষণ পাত্র, যার গলনাঙ্ক অত্যন্ত বেশি।’
তিনি বলেন, ‘এ ধরনের বস্তুকে আসলে ‘স্পেস বল’ বলা হয় এবং উৎক্ষেপণের বহু বছর পরও এগুলো খুঁজে পাওয়া যায়। সম্ভবত এর আগে এ ধরনের বস্তু সমুদ্রপৃষ্ঠে পড়ে থাকার দৃশ্য কেউ দেখেনি।’
তবে গোরম্যান সংশয় প্রকাশ করে বলেন, ‘বস্তুগুলো মহাকাশ শিল্পের অংশ নাও হতে পারে। এগুলো সামুদ্রিক কোনো উৎস থেকেও আসতে পারে।’
তবে তিনি জানান, ‘যদি এগুলো সত্যিই ‘স্পেস বল’ হয়, তাহলে এর ভেতরে অত্যন্ত বিষাক্ত রকেট জ্বালানি হাইড্রাজিনের কিছু অবশিষ্টাংশ থাকতে পারে।
তিনি ধারণা করে বলেন, ‘এগুলো রাশিয়ার ফ্রেগাট রকেটের অংশও হতে পারে। কারণ ওইসব রকেটের জ্বালানিতেও একই ধরনের চাপযুক্ত জ্বালানি পাত্র ব্যবহার করা হয়।’
গোরম্যান বলেন, ‘১৯৮০ এর দশকের মার্কিন বিজ্ঞানভিত্তিক কৌতুক চলচ্চিত্র ‘স্পেসবলস’এর সঙ্গে এই বস্তুগুলোর কোনো সম্পর্ক নেই। ‘স্পেস বল’ হলো মহাকাশে রকেট নিক্ষেপের পর সবচেয়ে বেশি পাওয়া ধ্বংসাবশেষগুলোর একটি। এর আগেও বিশ্বের বিভিন্ন স্থানে এগুলো পাওয়া গেছে।’
তিনি আরও উল্লেখ করেন, বর্তমানে পৃথিবীর কক্ষপথে সচল উপগ্রহ, অচল যন্ত্রাংশ ও রকেট উৎক্ষেপণের পরিত্যক্ত র ৩০ হাজারেরও বেশি মহাকাশের ধ্বংসাবশেষ ঘুরে বেড়াচ্ছে।
তিনি বলেন, ‘মহাকাশের আবর্জনা বেশিরভাগ সময় সমুদ্রের ওপর দিয়েই পৃথিবীতে ফিরে আসে। তবে অস্ট্রেলিয়া বিশাল স্থলভাগ হওয়ায় এখানে প্রায়ই মহাকাশের ধ্বংসাবশেষ পাওয়া যায়।’
তিনি আরও বলেন, ‘সাম্প্রতিক বছরগুলোতে মহাকাশে উৎক্ষেপণের সংখ্যা দ্রুত বেড়ে যাওয়ায় উপজাত হিসেবে মহাকাশের আবর্জনার সমস্যাও বাড়ছে।’
তিনি বলেন, ‘গত পাঁচ বছরে মহাকাশে যে পরিমাণ উৎক্ষেপণ হয়েছে, তা মানব ইতিহাসের আগের সব উৎক্ষেপণের মোট সংখ্যার চেয়েও বেশি। ফলে এখন আগের তুলনায় অনেক বেশি ধ্বংসাবশেষ পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলে ফিরে আসছে।’