মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প দাবি করেছেন, ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর সঙ্গে আলাপ এবং মধ্যস্থতাকারীদের মাধ্যমে লেবাননের সশস্ত্র গোষ্ঠী হিজবুল্লাহর সঙ্গে যোগাযোগের পর দুপক্ষই লড়াইয়ের তীব্রতা কমাতে সমঝোতায় পৌঁছেছে।
স্থানীয় সময় সোমবার (১ জুন) নেতানিয়াহুর সঙ্গে ফোনালাপের পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক পোস্টে ট্রাম্প এই দাবি করেন।
বিগত সময়গুলোর তুলনায় সম্প্রতি ইসরায়েলি বাহিনী লেবাননের মধ্যে তাদের সবচেয়ে গভীরে অনুপ্রবেশ করেছে। ট্রাম্প ঘোষণা দেন, কোনো ইসরায়েলি সেনা বৈরুতে যাবে না এবং যারা ওখানে যাওয়ার চেষ্টা করছিল, তাদের ইতোমধ্যেই ফেরত পাঠানো হয়েছে।
তিনি বলেন, সকল ধরনের গোলাগুলি ও সহিংসতা বন্ধ করতে সম্মত হয়েছে হিজবুল্লাহ। ইসরায়েল তাদের ওপর হামলা করবে না এবং তারাও ইসরায়েলের ওপর হামলা চালাবে না।’
নেতানিয়াহু এই ফোনালাপের বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। তবে তিনি এটিকে সংযম হিসেবে দেখার চেয়ে একটি সতর্কবার্তা হিসেবে তুলে ধরতে চেয়েছেন। তিনি বলেন, তিনি ট্রাম্পকে জানিয়েছেন যে হিজবুল্লাহর হামলা বন্ধ না হলে লেবাননের রাজধানী বৈরুতের লক্ষ্যবস্তুতে ইসরায়েল আঘাত হানবে। সেই সঙ্গে দক্ষিণ লেবাননে ইসরায়েলি সামরিক বাহিনী ‘পরিকল্পনা অনুযায়ী’ তাদের কাজ চালিয়ে যাবে বলেও উল্লেখ করেছেন তিনি।
এ কথার প্রতিক্রিয়ায় হিজবুল্লাহর পক্ষ থেকে এখনও কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
এপ্রিলের মাঝামাঝি থেকে উভয়পক্ষই একটি যুদ্ধবিরতিতে সম্মত হয়েছিল। কিন্তু চুক্তি ভেঙে ইসরায়েল লেবাননে হামলা শুরু করলে হিজবুল্লাহ পুনরায় পাল্টা হামলা শুরু করে। যদিও ইসরায়েল নিজেদের এই হামলাকে আত্মরক্ষা হিসেবে চালিয়ে দিতে চাইছে, তবে এই লড়াই ইরান-যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধবিরতি বাড়ানোর ক্ষেত্রে প্রস্তাবিত চুক্তির পথে একটি বড় বাধা হিসেবে দাঁড়িয়েছে। তেহরান চায়, যেকোনো চুক্তিতে লেবানন, বিশেষ করে হিজবুল্লাহ অন্তর্ভুক্ত থাকুক।
যুক্তরাষ্ট্রে লেবাননের দূতাবাসের জারি করা এক বিবৃতি অনুযায়ী, মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিওর একটি প্রস্তাবে লেবানন কর্তৃপক্ষ হিজবুল্লাহর অনুমোদন নিশ্চিত করেছে। প্রস্তাবটিতে বলা হয়েছে, ইসরায়েল বৈরুতের দক্ষিণ শহরতলিতে হামলা করবে না এবং হিজবুল্লাহও উত্তর ইসরায়েলে কোনো ধরনের সহিংসতা করবে না।
ট্রাম্পের বার্তার কয়েক মুহূর্ত পরই ইসরায়েল লেবানন থেকে ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণ শনাক্ত করে এবং উত্তর ইসরায়েলের কিছু অংশের বাসিন্দাদের নিরাপদ আশ্রয়ে সরে যাওয়ার জন্য সতর্ক করে।
স্থানীয় সময় মঙ্গলবার (২ জুন) ও আগামীকাল বুধবার (৩ জুন) ইসরায়েল ও লেবাননের মধ্যে ওয়াশিংটনে বৈঠক করার কথা রয়েছে, যেখানে লেবাননের আলোচকরা একটি পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধবিরতি প্রস্তাবের পাশাপাশি ইসরায়েলে হামলার পরিধি অনেকাংশে কমানোর ব্যাপারে আলোচনা করবেন বলে জানা গেছে।
ট্রাম্পের মন্তব্যের পরও বৈরুতের শহরতলিতে ইসরায়েলের হামলার নির্দেশ
ট্রাম্পের মন্তব্য এমন এক সময়ে সামনে এল, যখন ইসরায়েল সরকার বৈরুতের দক্ষিণ শহরতলিতে হামলার নির্দেশ দিয়েছে। অপরদিকে, ইসরায়েলের উপকূলীয় শহর হাইফার উপকণ্ঠসহ উত্তর ইসরায়েলে রকেট নিক্ষেপ করেছে হিজবুল্লাহ।
এ বিষয়ে নেতানিয়াহু এবং ইসরায়েলি প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইসরায়েল কাৎস এক যৌথ বিবৃতিতে বলেছেন, হিজবুল্লাহর পক্ষ থেকে বারবার যুদ্ধবিরতির লঙ্ঘন করা হচ্ছে। আমাদের শহর ও নাগরিকদের ওপর হামলার পরই আমরা এই পাল্টা হামলার নির্দেশ দিয়েছি।
ইসরায়েলি সামরিক বাহিনীর আরবি ভাষার মুখপাত্র এক্সে একটি পোস্টে জানান, এখানকার সব বাসিন্দাদের শহরতলি ছেড়ে এখনই চলে যাওয়া উচিৎ। তিনি আরও বলেছেন, হিজবুল্লাহ যদি ইসরায়েলি জনবসতিতে হামলা চালিয়ে যায়, তবে ইসরায়েলও হিজবুল্লাহ-সমর্থিত বৈরুতের দাহিয়েহ এলাকায় ব্যাপক হামলা শুরু করবে।
ইসরায়েলের পক্ষ থেকে ওই সতর্কবার্তা দেওয়ার পর আজ (সোমবার) বিপুল সংখ্যক মানুষকে দাহিয়েহ থেকে পালিয়ে যেতে দেখা গেছে। এর ফলে ওই এলাকা থেকে বের হওয়ার সড়কগুলোতে যানজটের সৃষ্টি হয়েছে।
মোহাম্মদ ফারহাত (২৩) নামের এক বিশ্ববিদ্যালয়েরর শিক্ষার্থী তার ভাই ও বাবা-মাকে নিয়ে বৈরুতের দক্ষিণ শহরতলি হারেত হরিক থেকে পালিয়ে অন্য এক জায়গায় যাচ্ছিলেন।
জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘আমরা চিন্তিত। আমি এতে অভ্যস্ত, কিন্তু মূলত আমার বাবা-মায়ের নিরাপত্তার কথা ভেবে চলে যাচ্ছি।’
রাতভর ইসরায়েল ও হিজবুল্লাহর পাল্টাপাল্টি গোলাবর্ষণ
দক্ষিণ লেবাননে রাতভর ইসরায়েলি বিমান হামলায় এক সিরীয় নাগরিকসহ ৬ জন নিহত হয়েছেন বলে রাষ্ট্রীয় বার্তা সংস্থা ন্যাশনাল নিউজ এজেন্সি জানিয়েছে।
ইসরায়েল এই প্রধান শহরের কাছাকাছি অন্যান্য শহর ও গ্রামে আঘাত হেনেছে, যা কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ বোফোর্ট প্রাসাদ এবং সম্প্রতি ইসরায়েলি সামরিক বাহিনীর দখল করা অন্যান্য শহরগুলোর কাছাকাছি অবস্থিত।
স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, সোমবার বিকেলে বন্দর নগরী টায়ারে একটি বিমান হামলায় জাবাল আমেল হাসপাতালের ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে প্রকাশ করা একটি ভিডিওতে হাসপাতালের ভেতরে আতঙ্কিত নারী ও শিশুদের দেখা গেছে। সেই সঙ্গে হাসপাতালের জানালার কাঁচ ভেঙে চূর্ণ-বিচূর্ণ হয়ে যাওয়ার দৃশ্যও দেখা গেছে।
এদিকে, ইসরায়েলি সামরিক বাহিনী জানিয়েছে, তাদের বিমান বাহিনী লেবানন থেকে ইসরায়েলি ভূখণ্ডের দিকে উৎক্ষেপণ করা দুটি ক্ষেপণাস্ত্র এবং দক্ষিণ লেবাননে ইসরায়েলি সৈন্যরা যেখানে কাজ করছে, সেই এলাকায় একটি সন্দেহভাজন আকাশযান প্রতিহত করেছে। তবে তারা কোনো হতাহতের খবর পায়নি বলে জানিয়েছে।
হিজবুল্লাহ আজ (সোমবার) ভোরে জানায়, তারা লিটানি নদীর ঠিক উত্তরে জাওতার আল-শারকিয়াহতে ইসরায়েলি সৈন্যদের ওপর হামলা চালিয়েছে। এছাড়া সীমান্ত থেকে বেশ কয়েক মাইল দক্ষিণে তিবিরিয়াসে ইসরায়েলি সামরিক অবকাঠামোতে আঘাত হেনেছে।
ওয়াশিংটনে ইসরায়েল ও লেবাননের আসন্ন বৈঠক
যুক্তরাষ্ট্রের রাজধানীতে ইসরায়েল-লেবানন প্রত্যক্ষ আলোচনার পরবর্তী দফার ঠিক আগেই সর্বশেষ এই হামলাগুলো ঘটল। হিজবুল্লাহ প্রত্যক্ষ আলোচনা প্রত্যাখ্যান করেছে এবং ইরানের চাপের ওপর ভরসা রাখছে, যারা যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে তাদের আলোচনায় লেবাননে যুদ্ধ অবসানের দাবি জানিয়েছে।
এপ্রিলে ওয়াশিংটনে শুরু হওয়া ইসরায়েল-লেবানন আলোচনার আগে দেশদুটোর মধ্যে তিন দশকেও এমন কোনো আলোচনা হয়নি। তাদের মধ্যে কোনো আনুষ্ঠানিক কূটনৈতিক সম্পর্কও নেই।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে অ্যাসোসিয়েটেড প্রেসের (এপি) সঙ্গে আলাপকালে লেবাননের একজন কূটনৈতিক কর্মকর্তা জানান, তীব্র উত্তেজনা সত্ত্বেও বৈরুত সংঘাতের অবসান ঘটাতে আলোচনা চালিয়ে যেতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।
ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি সোমবার দাবি করেছেন, ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যে যেকোনো যুদ্ধবিরতি চুক্তি মানে ‘লেবাননসহ সব ফ্রন্টে যুদ্ধবিরতি।’
ইরানের এই শীর্ষ কূটনীতিক এক্স পোস্টে বলেন, ‘একটি ফ্রন্টে এর লঙ্ঘন মানে সব ফ্রন্টে যুদ্ধবিরতির লঙ্ঘন।’
বেশিরভাগ ক্ষেত্রে নিরাপদ ছিল লেবাননের রাজধানী
মে মাসে বৈরুতের দক্ষিণ শহরতলিতে দুটি লক্ষ্যভিত্তিক হামলা ছাড়া যুদ্ধবিরতি কার্যকর হওয়ার পর থেকে লেবাননে তেমন কোনো বিমান হামলা হয়নি।
সৌদি আরব লেবাননে ইসরায়েলের হামলার নিন্দা জানিয়ে বলেছে যে, তারা এই ছোট ভূমধ্যসাগরীয় দেশে ইসরায়েলের প্রবেশকে ‘দৃঢ়ভাবে প্রত্যাখ্যান’ করে। সৌদি পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ইসরায়েলকে লেবাননের আরও ভেতরে যাওয়া থেকে বিরত রাখার আহ্বান জানিয়েছে।
হিজবুল্লাহর অন্যতম প্রধান মিত্র লেবাননের পার্লামেন্ট স্পিকার নাবিহ বেরি চলতি সপ্তাহের রবিবার এক বিবৃতিতে বলেন, তিনি এই সশস্ত্র গোষ্ঠীর ‘যুদ্ধবিরতির প্রতি পূর্ণ, ব্যাপক এবং তাৎক্ষণিক প্রতিশ্রুতির’ গ্যারান্টি দিতে পারেন। কিন্তু ইসরায়েলকে তাদের আগ্রাসন বন্ধ করতে কে বাধ্য করবে?’
লেবাননের প্রেসিডেন্ট জোসেফাউন সোমবার বলেছেন, তার সরকার ‘সাধারণভাবে লেবাননের মানুষের, বিশেষ করে দক্ষিণাঞ্চলের মানুষের কষ্ট’ দূর করতে কাজ চালিয়ে যাচ্ছে। পরে তিনি আলোচনার প্রতি বৈরুতের প্রতিশ্রুতি পুনর্ব্যক্ত করে একটি বিবৃতি জারি করেন এবং বলেন যে আলোচনা যুদ্ধের চেয়ে ‘নিরাপদ’।
জাতিসংঘের সহকারী মহাসচিব মার্থা পোবি নিরাপত্তা পরিষদের এক জরুরি বৈঠকে বলেন, লেবাননে ইসরায়েলের প্রবেশ লেবাননের আঞ্চলিক অখণ্ডতা এবং ২০০৬ সালের কাউন্সিলের প্রস্তাবকে লঙ্ঘন করে। ওই প্রস্তাবে ইসরায়েলকে লেবাননের সঙ্গে জাতিসংঘ-নির্ধারিত সীমান্তের দক্ষিণে প্রত্যাহার করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল।
তিনি হিজবুল্লাহর বিরুদ্ধেও ওই প্রস্তাব লঙ্ঘনের অভিযোগ আনেন, যা এই সশস্ত্র গোষ্ঠীকে নিরস্ত্রীকরণের নির্দেশ দেয়।
মার্কিন রাষ্ট্রদূত মাইক ওয়াল্টজ বলেছেন, ‘প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী হিজবুল্লাহ যদি অবিলম্বে হামলা বন্ধ করে এবং লেবানন সরকার দেশটিতে পূর্ণ সার্বভৌমত্ব প্রতিষ্ঠা করে দেশের পুনর্গঠন এবং জনগণকে ঘরে ফিরিয়ে আনে, তবে উত্তেজনা হ্রাস ও দ্রুত শান্তি ফিরবে।’
জাতিসংঘে লেবাননের রাষ্ট্রদূত আহমদ আরাফা ‘কূটনীতিকে একটি সুযোগ দেওয়ার লক্ষ্যে গঠনমূলক প্রচেষ্টা’ এবং ট্রাম্পের সাম্প্রতিক উদ্যোগের জন্য ট্রাম্প প্রশাসনের প্রশংসা করেন।
ইসরায়েল ও হিজবুল্লাহর মধ্যে সাম্প্রতিক লড়াইয়ে লেবাননে ৩ হাজার ৪৩৩ জন নিহত হয়েছেন এবং ১০ লক্ষাধিক মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছে।
ইসরায়েলের সামরিক বাহিনী জানিয়েছে, দক্ষিণ লেবাননে রাতভর হিজবুল্লাহর ড্রোন হামলায় এক সৈন্য নিহত হয়েছেন। হিজবুল্লাহর সহজে শনাক্ত না হওয়া ফাইবার অপটিক ড্রোনের ব্যবহার ইসরায়েলি সামরিক বাহিনীর জন্য মোকাবিলা করা কঠিন হচ্ছে।
নেতানিয়াহুর কার্যালয়ের মতে, দক্ষিণ লেবাননে বা তার কাছাকাছি এলাকায় অন্তত ২৬ জন ইসরায়েলি সৈন্য এবং একজন প্রতিরক্ষা ঠিকাদার নিহত হয়েছেন। এছাড়া উত্তর ইসরায়েলে ২ জন বেসামরিক নাগরিকও নিহত হয়েছেন।