ঠাকুরগাঁও-১ আসনের উপনির্বাচনে নির্বাচনি আচরণবিধি লঙ্ঘনের অভিযোগে দুই প্রার্থী, একজন উপ-সহকারী কৃষি কর্মকর্তা ও সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের একজন সহকারী শিক্ষককে কারণ দর্শানোর নোটিশ (শোকজ) দিয়েছে নির্বাচনি অনুসন্ধান ও বিচারিক কমিটি।
শনিবার (১৭ অক্টোবর) কমিটির দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা ঠাকুরগাঁওয়ের যুগ্ম জেলা ও দায়রা জজ সাদিয়া আফসানা রিমা এবং সিভিল জজ মো. তোসিকুল আলম স্বাক্ষরিত নোটিশ থেকে এ তথ্য জানা গেছে।
নোটিশ পাওয়া প্রার্থীরা হলেন বিএনপি মনোনীত ধানের শীষ প্রতীকের মির্জা ফয়সল আমীন ও বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী মনোনীত ১১ দলীয় জোটের দাঁড়িপাল্লা প্রতীকের মো. দেলাওয়ার হোসেন।
এছাড়া ঠাকুরগাঁও সদর উপজেলার উপ-সহকারী কৃষি কর্মকর্তা মো. রাজু আলী ও আরাজী দক্ষিণ বঠিনা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক মো. জুলফিকার রহমানকেও শোকজ নোটিশ দেওয়া হয়েছে।
নোটিশ অনুযায়ী, এ পর্যন্ত কমিটির কাছে আটটি লিখিত অভিযোগ জমা পড়েছে। এর মধ্যে তিনজন লিখিত জবাব দিয়েছেন। অন্যদিকে মো. দেলাওয়ার হোসেনকে আগামী ১৯ অক্টোবর লিখিত ব্যাখ্যা দিতে বলা হয়েছে।
এতে আরও বলা হয়েছে, দেলাওয়ার হোসেন ও তার সমর্থক নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে ঠাকুরগাঁও-১ আসনের ধর্মপ্রাণ ভোটারদের উসকানি দিয়ে বিভ্রান্ত করা এবং সাধারণ ভোটারদের প্রভাবিত করার উদ্দেশ্যে পরিকল্পিতভাবে মসজিদ ও ধর্মীয় উপাসনালয় ব্যবহারের অভিযোগ আনা হয়েছে। এর মাধ্যমে সুষ্ঠু নির্বাচনকে বিতর্কিত করার চেষ্টা করা হচ্ছে বলেও অভিযোগে উল্লেখ করা হয়।
অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে জমা দেওয়া ভিডিও পর্যালোচনা করে সংসদ নির্বাচনে রাজনৈতিক দল ও প্রার্থীর আচরণ বিধিমালা, ২০২৫-এর ১৫(খ) বিধান লঙ্ঘনের বিষয়টি প্রাথমিকভাবে প্রতীয়মান হয়েছে বলে নোটিশে উল্লেখ করা হয়।
এ অবস্থায় নির্বাচনি আচরণবিধি লঙ্ঘনের দায়ে তার বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার সুপারিশসহ নির্বাচন কমিশনে প্রতিবেদন পাঠানো হবে না কেন, সে বিষয়ে আগামী ১৯ অক্টোবর সকাল ১১টায় ঠাকুরগাঁও জেলা ও দায়রা জজ আদালতে উপস্থিত হয়ে লিখিত ব্যাখ্যা দিতে বলা হয়েছে।
এ অভিযোগের বাদী হিসেবে নোটিশে মো. পয়গাম আলীর নাম উল্লেখ করা হয়েছে। তিনি ঠাকুরগাঁও-১ আসনের উপনির্বাচনে বিএনপি মনোনীত ধানের শীষ প্রতীকের প্রার্থীর নির্বাচনি এজেন্ট।
এর আগে প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থী দেলাওয়ার হোসেনের নির্বাচনি গণসংযোগে বাধা ও তাকে হেনস্তার চেষ্টার অভিযোগে বিএনপির প্রার্থী মির্জা ফয়সল আমীনকে কারণ দর্শানোর নোটিশ দেয় নির্বাচনি অনুসন্ধান ও বিচারিক কমিটি।
নোটিশে বলা হয়, গত ১৩ অক্টোবর রাত আনুমানিক ৮টার দিকে ঠাকুরগাঁও পৌরসভার ৫ নম্বর ওয়ার্ডের হাজীপাড়া মসজিদে এশার নামাজ আদায় শেষে সড়কে গণসংযোগ করছিলেন দেলাওয়ার হোসেন। এ সময় ফয়সল আমীনের সমর্থক যুবদল নেতা মানিক, জেলা ছাত্রদলের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আল-আমিন ও আলমগীরের নেতৃত্বে ১৫ থেকে ২০ জন অস্ত্রধারী বলপ্রয়োগ করে তার গণসংযোগে বাধা দেন এবং তাকে আক্রমণ ও হেনস্তার চেষ্টা করেন বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে।
এ ঘটনায় দেলাওয়ার হোসেনের পক্ষে তার নির্বাচনি এজেন্ট মোহাম্মদ আলমগীর নির্বাচন কমিশনে লিখিত অভিযোগ করেন। অভিযোগে নির্বাচনে সবার জন্য সমান সুযোগ বা লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড নিশ্চিত করার দাবি জানানো হয়।
নোটিশে বলা হয়, প্রাথমিক অনুসন্ধানে প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীর গণসংযোগে সমর্থকদের মাধ্যমে বলপ্রয়োগ করে বাধা দেওয়ার বিষয়টি সংসদ নির্বাচনে রাজনৈতিক দল ও প্রার্থীর আচরণ বিধিমালা, ২০২৫-এর ১৫(ঘ) বিধান লঙ্ঘন করেছে বলে প্রতীয়মান হয়েছে। বিধিমালার ৬৪(৪) অনুযায়ী পূর্ণাঙ্গ অনুসন্ধান শেষে আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার সুপারিশসহ প্রতিবেদন নির্বাচন কমিশনে পাঠানো হবে না কেন, সে বিষয়ে ব্যাখ্যা দিতে বলা হয়।
শনিবার ফয়সল আমীনের পক্ষে তার প্রতিনিধি অ্যাডভোকেট মো. এনতাজুল হক নির্বাচনি অনুসন্ধান ও বিচারিক কমিটির প্রধান এবং ঠাকুরগাঁওয়ের যুগ্ম জেলা ও দায়রা জজ সাদিয়া আফসানা রিমার আদালতে লিখিত জবাব দেন।
জবাবে ফয়সল আমীনের পক্ষ থেকে অভিযোগ অস্বীকার করে বলা হয়, অভিযোগটি সম্পূর্ণ মিথ্যা, ভিত্তিহীন, বানোয়াট ও অসৎ উদ্দেশ্যপ্রণোদিত। আসন্ন নির্বাচনে ফয়সল আমীনের সম্ভাব্য বিজয় বাধাগ্রস্ত করা এবং নির্বাচনের পরিবেশ নষ্ট করে নির্বাচনকে প্রশ্নবিদ্ধ করার উদ্দেশ্যে এ অভিযোগ করা হয়েছে বলেও দাবি করা হয়।
অভিযোগে উল্লিখিত দিন, তারিখ ও সময়ে তার কোনো সমর্থক বা নেতাকর্মী এ ধরনের ঘটনার সঙ্গে জড়িত ছিলেন না বলেও লিখিত জবাবে উল্লেখ করা হয়েছে।
অন্যদিকে নির্বাচনি আচরণবিধি লঙ্ঘনের অভিযোগে আরাজী দক্ষিণ বঠিনা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক মো. জুলফিকার রহমানকেও কারণ দর্শানোর নোটিশ দেওয়া হয়েছে।
বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর ঠাকুরগাঁও পৌর যুব বিভাগের সভাপতি মো. রাজিউর রহমানের করা অভিযোগে বলা হয়, জুলফিকার রহমান ঠাকুরগাঁও-১ আসনের উপনির্বাচনে বিএনপির প্রার্থীর পক্ষে প্রচারণায় অংশ নিয়েছেন।
অভিযোগ অনুযায়ী, রুহিয়া উপজেলার সেনুয়া ইউনিয়নে বিএনপি প্রার্থীর নির্বাচনি কার্যালয় উদ্বোধনের সময় তিনি বক্তব্য দেন। এছাড়া বিভিন্ন নির্বাচনি কর্মসূচিতেও বক্তব্য দিয়েছেন তিনি। এসব বক্তব্যের ভিডিও মোবাইল ফোনে ধারণ করে নিজের ফেসবুক আইডিতেও প্রকাশ করেন তিনি।
অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে সংসদ নির্বাচনে রাজনৈতিক দল ও প্রার্থীর আচরণ বিধিমালা, ২০২৫-এর ২১(ক) ও ২১(খ) বিধান লঙ্ঘনের বিষয়টি প্রাথমিকভাবে প্রতীয়মান হয়েছে বলে নোটিশে উল্লেখ করা হয়।
গত ১৫ অক্টোবর তাকে নির্বাচনি অনুসন্ধান ও বিচারিক কমিটির দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা ঠাকুরগাঁওয়ের সিভিল জজ মো. তোসিকুল আলমের আদালতে সশরীরে উপস্থিত হয়ে লিখিত ব্যাখ্যা দিতে বলা হয়।
জুলফিকার রহমানের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগের বিষয়ে তার লিখিত জবাব দেওয়ার তথ্য পাওয়া গেছে। তবে জবাবের বিষয়ে বিস্তারিত জানা যায়নি।
এছাড়া ঠাকুরগাঁও সদর উপজেলার উপ-সহকারী কৃষি কর্মকর্তা মো. রাজু আলীর বিরুদ্ধেও নির্বাচনি আচরণবিধি লঙ্ঘনের অভিযোগে কারণ দর্শানোর নোটিশ দেওয়া হয়েছে।
গত ১১ অক্টোবর তার বিরুদ্ধে নোটিশ দেওয়া হয়। পরে ১৩ অক্টোবর সাদিয়া আফসানা রিমার আদালতে সশরীরে উপস্থিত হয়ে লিখিত ব্যাখ্যা দিতে বলা হয়।
লিখিত জবাবে রাজু আলী অভিযোগ অস্বীকার করেন। তার দাবি, মো. আলমগীর নামে দাঁড়িপাল্লা প্রতীকের একজন আসন পরিচালকের করা অভিযোগ সম্পূর্ণ মিথ্যা। তিনি ও আরও ৩৮ জন উপ-সহকারী কৃষি কর্মকর্তা গত ৫ অক্টোবর রাত ৮টার দিকে কোথাও একত্র হননি এবং বিএনপির প্রার্থী মির্জা ফয়সল আমীনের সঙ্গে গোপন বৈঠকও করেননি।
জবাবে তিনি আরও বলেন, জাতীয়তাবাদী ডিপ্লোমা কৃষিবিদ সংগঠনের সভাপতি হওয়ার যে অভিযোগ তার বিরুদ্ধে আনা হয়েছে, সে নামে কোনো সংগঠন নেই। তিনি বা অন্য ৩৮ জন উপ-সহকারী কৃষি কর্মকর্তার কেউই ২০২৫ সালের নির্বাচনি আচরণবিধিমালার ২১(ক) ধারা লঙ্ঘন করেননি।
অভিযোগকারী তাদের কোথায় একত্র হওয়ার কথা বলেছেন, তা সুনির্দিষ্টভাবে উল্লেখ করেননি দাবি করে রাজু আলী অভিযোগ থেকে অব্যাহতি চান।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে রিটার্নিং কর্মকর্তা মো. কামরুল ইসলাম বলেন, নির্বাচনি আচরণবিধি লঙ্ঘনের অভিযোগগুলো গুরুত্বের সঙ্গে দেখা হচ্ছে। অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্টদের কারণ দর্শানোর নোটিশ দেওয়া হয়েছে। তাদের লিখিত জবাব ও প্রাপ্ত তথ্য-প্রমাণ পর্যালোচনা করে বিধি অনুযায়ী পরবর্তী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
আসনটিতে মোট ভোটার ৫ লাখ ১৬ হাজার ১৩৮ জন। এর মধ্যে পুরুষ ভোটার ২ লাখ ৫০ হাজার ৫৩ জন, নারী ভোটার ২ লাখ ৫৬ হাজার ৫৭২ জন ও তৃতীয় লিঙ্গের ভোটার চারজন।
মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হওয়ার পর আসনটি শূন্য ঘোষণা করা হয়। আগামী ২৯ অক্টোবর এ আসনে উপনির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে।