ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে চাঁদপুর জেলার ৫টি সংসদীয় আসনে ৩৬ জন প্রার্থীর মধ্যে ২৫ জনই জামানত হারিয়েছেন।
নির্বাচনি বিধান অনুযায়ী, কোনো সংসদীয় আসনের প্রার্থী বৈধ ভোটের ৮ ভাগের ১ ভাগ ভোট না পেলে তার জামানত বাজেয়াপ্ত হয়। অর্থাৎ, কোনো প্রার্থী যদি মোট প্রদত্ত ভোটের ঐ নির্দিষ্ট অংশ (১২.৫ শতাংশ) পেতে ব্যর্থ হন, তবে নির্বাচনের আগে কমিশনের কাছে জমা দেওয়া নির্দিষ্ট অংকের টাকা (বর্তমানে বাংলাদেশে ২০,০০০ টাকা) আর ফেরত পাবেন না।
জেলা রিটার্নিং কর্মকর্তার কার্যালয় ও জেলা নির্বাচন কর্মকর্তা জিয়াউর রহমান খলিফার দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, চাঁদপুর জেলার ৫টি আসনের ফলাফল প্রকাশের পর দেখা যায়, ৩৫ জন প্রার্থীর মধ্যে ২৫ জনই নির্বাচন কমিশনের নির্ধারণ করে দেওয়া ভোটের ৮ ভাগের ১ ভাগ ভোটও পাননি। এমনও প্রার্থী আছেন যারা ১ হাজার ভোটও পাননি। ফলে তাদের জামানত স্বয়ংক্রিয়ভাবে বাজেয়াপ্ত হয়েছে।
চাঁদপুর জেলা জাতীয় পার্টি জেলার ৪টি আসনে অংশ নিয়ে মোট ভোট পেয়েছে ৩ হাজার ৭৪৬। গণফোরাম ৩টি আসনে পেয়েছে ৮৭৬ ভোট। সেই তুলনায় ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ ৪টি আসনে পেয়েছে ৩৮ হাজার ৬৩০ ভোট।
অতীতে আওয়ামী লীগের সঙ্গে জোট হওয়া বাংলাদেশ ইসলামী ফ্রন্ট চাঁদপুর জেলার ৩টি আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে এবার পেয়েছে ৭ হাজার ১৫৪ ভোট। ইসলামী ফ্রন্ট বাংলাদেশের সেক্রেটারি জেনারেল বাহাদুর শাহও চাঁদপুর-৫ আসনে জামানত হারিয়েছেন।
নির্বাচন কমিশনের হিসাব মতে, চাঁদপুর জেলায় ভোটার সংখ্যা ২৩ লাখ ৩১ হাজার ১৯৫। এবারের নির্বাচনে জেলায় ভোট দিয়েছেন ৫৩ দশমিক শূন্য ৫ শতাংশ ভোটার।
চাঁদপুর-১ (কচুয়া) আসনে বাংলাদেশ ইসলামী ফ্রন্ট মনোনীত প্রার্থী মো. নাসির উদ্দিন, গণফোরাম মনোনীত প্রার্থী মোহাম্মদ আজাদ হোসেন, জাতীয় পার্টির হাবিব খান ও গণঅধিকার পরিষদের মোহাম্মদ এনায়েত হোসেন জামানত হারিয়েছেন। এই আসনে ধানের শীষের প্রার্থী ড. আ ন ম এহছানুল হক মিলন জামায়াতের প্রার্থী আবু নছর আশরাফীকে হারিয়ে বিজয়ী হয়েছেন।
চাঁদপুর-২ (মতলব উত্তর-দক্ষিণ) আসনে লেবার পার্টি মনোনীত প্রার্থী নাসিমা নাজনীন সরকার, রিপাবলিকান পার্টি মনোনীত প্রার্থী মোহাম্মদ ফয়জুন্নুর, গণঅধিকার পরিষদের প্রার্থী মোহাম্মদ গোলাফ হোসেন, নাগরিক ঐক্য মনোনীত প্রার্থী মো. এনামুল হক, ইসলামী আন্দোলন মনোনীত প্রার্থী মানসুর আহমদ, জাতীয় পার্টি মনোনীত প্রার্থী মো. এমরান হোসেন মিয়াও জামানত হারিয়েছেন। এই আসনে বিএনপির ধানের শীষের প্রার্থী মো. জালাল উদ্দিন ১১ দলীয় ছাতা প্রতীকের প্রার্থী (এলডিপি) মো. বিল্লাল হোসেনকে বিপুল ভোটে হারিয়ে নির্বাচিত হয়েছেন।
চাঁদপুর-৩ (চাঁদপুর সদর-হাইমচর) আসনে ইসলামী আন্দোলনে মনোনীত প্রার্থী (হাতপাখা) মোহাম্মদ জয়নাল আবেদীন শেখ, কমিউনিস্ট পার্টি মনোনীত প্রার্থী ও তরুণ নেতা মো. জাহাঙ্গীর হোসেন, ইসলামী ফ্রন্ট মনোনীত প্রার্থী ও সাংবাদিক এএইচএম আহসান উল্লাহ, গণফোরাম মনোনীত প্রার্থী অ্যাডভোকেট সেলিম আকবর ও গণঅধিকার পরিষদ মনোনীত প্রার্থী ও সাংবাদিক মো. জাকির হোসেন জামানত হারিয়েছেন। এই আসনে ধানের শীষের প্রার্থী শেখ ফরিদ আহমেদ মানিক জামায়াতের প্রার্থী অ্যাডভোকেট শাহজাহান মিয়াকে হারিয়ে নির্বাচিত হয়েছেন।
চাঁদপুর-৪ (ফরিদগঞ্জ) আসনে ইসলামী ফ্রন্ট মনোনীত প্রার্থী মোহাম্মদ আব্দুল মালেক, গণফোরাম মনোনীত প্রার্থী মোহাম্মদ মুনির চৌধুরী, জাতীয় পার্টির প্রার্থী মাহমুদ আলম, ইসলামী আন্দোলনের প্রার্থী মকবুল হোসাইন ও স্বতন্ত্র প্রার্থী জাকির হোসেন জামানত হারিয়েছেন। এই আসনের স্বতন্ত্র প্রার্থী আলহাজ্ব এমএ হান্নান বিএনপির প্রার্থী লায়ন হারুনুর রশিদকে হারিয়ে নির্বাচিত হয়েছেন।
চাঁদপুর-৫ (হাজীগঞ্জ-শাহরাস্তি) আসনে ইসলামী ফ্রন্ট মনোনীত প্রার্থী সৈয়দ বাহাদুর শাহ, ইনসানিয়াত বিপ্লব মনোনীত প্রার্থী মোহাম্মাদ মাহমুদ আলম, জাতীয় পার্টি মনোনীত মির্জা গিয়াস উদ্দিন, ইসলামী আন্দোলনের প্রার্থী মোহাম্মদ আলী পাটওয়ারী ও স্বতন্ত্র প্রার্থী জাকির হোসেনও জামানত হারিয়েছেন। এ আসনে ধানের শীষের প্রার্থী ইঞ্জিনিয়ার মমিনুল হক এলডিপির নেয়ামুল বশিরকে হারিয়ে নির্বাচিত হয়েছেন।
চাঁদপুর-৩ (সদর-হাইমচর) আসনে এ এইচ এম আহসান উল্লাহ বাংলাদেশ ইসলামী ফ্রন্টের মনোনীত প্রার্থী হিসেবে মোমবাতি প্রতীকে নির্বাচনে অংশ নেন। জামানত হারানো প্রসঙ্গে তিনি বলেন, জামানত হারানোর কারণ হচ্ছে প্রার্থীদের দলগুলোর তৃণমূলে সাংগঠনিক কাঠামো নাই বা থাকলেও দুর্বল। তাই নির্বাচনে ভালো করা কঠিন। এক্ষেত্রে দলগুলোকে আগামীতে আরও বেশি সাংগঠনিকভাবে সক্রিয় হতে হবে।
চাঁদপুরের সুশাসনের জন্যে নাগরিকের (সুজন) সভাপতি অধ্যক্ষ মোশারফ হোসেন বলেন, নিজেদের পরিচিতি ও অস্তিত্ব জানান দেওয়ার জন্য নির্বাচনে অনেকে প্রার্থী হন। আবার নির্বাচন কমিশনের শর্ত পূরণের জন্যেও দলের প্রার্থী হয়ে নিয়ম রক্ষা করেন।
স্থানীয় রাজনৈতিক পর্যবেক্ষক মহলের মতে, ছোট দলগুলোর জয়-পরাজয় বা জামানত বাজেয়াপ্ত হওয়াটা তাদের জন্যে বড় বিষয় নয়। দলকে টিকিয়ে রাখতে নির্বাচনে অংশগ্রহণ নিশ্চিত করাটাই বড়ো বিষয়। আবার দেখা গেছে, অনেকে নির্বাচনে দাঁড়ায় বটে, কিন্তু নির্বাচনের কয়েকদিন আগে পরাজয়ের হাত থেকে রক্ষার জন্য সম্ভাব্য বিজয়ী দলের প্রার্থীর সঙ্গে আঁতাত করে হাত মেলায়।