পটুয়াখালীতে একটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষকের অবসরজনিত ব্যতিক্রমধর্মী বিদায় অনুষ্ঠান অনুষ্ঠিত হলো। জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের সরকারি গাড়িতে করে প্রধান শিক্ষককে তার বাড়িতে পৌঁছে দিয়ে নতুন এক দিগন্তের সৃষ্টি করলেন নবাগত শিক্ষা কর্মকর্তা। এমন নতুনত্ব গণতান্ত্রিক বিদায়াচরণে উৎসাহ আর আনন্দে উদ্বেলিত জেলার প্রাথমিক শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও অভিভাবকরা।
স্বাভাবিকভাবে সরকারি চাকরি থেকে অবসরের ছুটি প্রস্তুত হওয়ার পর অবসরপ্রাপ্তকে সংশ্লিষ্ট কাগজপত্র গুছিয়ে যোগাযোগ করতে হয় উপজেলা কর্মকর্তার মাধ্যমে জেলা কর্মকর্তার কাছে। আর এর ব্যাতিক্রম হলো এবার পটুয়াখালী জেলার বাউফল উপজেলার ১২১ নম্বর বগা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে। প্রধান শিক্ষক মোসাম্মৎ কোহিনূর বেগমের শেষ কর্মদিবসে বিদ্যালয়ে আয়োজন করা হয় বিদায় অনুষ্ঠানের। ওই শিক্ষকের অবসরজনিত প্রস্তুতির কাগজপত্রাদি নিয়ে অনুষ্ঠানে হাজির হন জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা (ডিপিইও) মাসুদ করিম।
বিদ্যালয় সূত্রে জানা যায়, প্রধান শিক্ষক মোসাম্মৎ কোহিনূর বেগম দীর্ঘ জীবনের চাকরিতে অত্যন্ত সুনাম ও দক্ষতার সঙ্গে শিক্ষকতার পাশাপশি একজন গুনী শিক্ষক হিসেবে সর্বমহলে পরিচিত ছিলেন। তিনি ২০০৫, ২০০৮ ও ২০১২ সালে বাউফল উপজেলার শ্রেষ্ঠ প্রধান শিক্ষক হিসেবে সম্মাননা অর্জন করেন। পাশাপশি ২০১৩ সালে উপজেলা পর্যায়ে শ্রেষ্ঠ কাব প্রধান শিক্ষক হিসেবে স্বীকৃতি লাভ করেন। তিনি ২০০০, ২০০৪ ও ২০২০ সালে কাবের জাতীয় পর্যায়ে সমাবেশে অংশগ্রহণ করেন। একজন গুনী শিক্ষক হিসেবে কৃতিত্বের স্বীকৃতিস্বরূপ ২০১৫ সালে সরকারিভাবে শ্রীলংকা শিক্ষা সফরের সুযোগ পান মোসাম্মৎ কোহিনূর বেগম।
গতকাল (রবিবার) শেষ বিকেলে বগা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক কোহিনূর বেগমের শেষ কর্মদিবস উপলক্ষে আয়োজিত বিদায় সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে এক আবেগঘন পরিবেশের সৃষ্টি হয়। বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মোসাম্মৎ কোহিনূর বেগমের সহকর্মীসহ বিদ্যালয়ের কোমলমতী শিক্ষার্থী, অভিভাবক এবং এলাকাবাসীর এক অশ্রুসজল পরিবেশের মধ্য দিয়ে বিদায় দেওয়া হয় তাকে। প্রত্যেকেই তুলে ধরেন কোহিনূর বেগম এর গৌরবজ্জল ভূমিকার কথা।
কাজী বাউফল উপজেলা সহকারী প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মনিরুজ্জামান রিপনের সভাপতিত্বে সভায় প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন ডিপিইও মাসুদ করিম।
সভায় জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মাসুদ করিম কোহিনূর বেগমের কর্মকালের প্রশংসা করেন এবং শেষ কর্মদিবসে তার এই উপস্থিতির ব্যাখ্যা দিয়ে বলেন, যে কাজের জন্য কার্যালয়ে যেতে হয়, পিআরএল মঞ্জুরজনিত দাপ্তরিক সেই কাজটি আমি আপনাদের সামনে করে দিলাম। তার অবসরের দাপ্তরিক কাজের জন্য আর কার্যালয়ে যেতে হবে না।
পরবর্তীতে সবাইকে অবাক করে দিয়ে কোহিনূর বেগমকে সম্মান জানিয়ে জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা তার সরকারি গাড়িতে করে নিজেই চালকের আসনে বসে কোহিনূর বেগমকে তার বাড়িতে পৌঁছে দিয়ে আসেন।
এদিকে, জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তার এ ধরনের দায়িত্বশীল ও মানবিক কাজের প্রশংসা করে পটুয়াখালীর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকরা বলেন, এটি একটি সাহসী উদ্যোগ। পাশাপশি সরকারি গাড়িতে করে একজন পিআরএলপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষককে তার চাকরি জীবনের শেষ দিনে বাড়িতে পৌঁছে দিয়ে যে সম্মানটি দিয়েছেন, এটি পটুয়াখালীর শিক্ষাঙ্গনে একটি নজির হয়ে থাকবে।
শিক্ষা কর্মকর্তা মাসুদ করিম আরও বলেন, কোহিনূর বেগম যেদিন থেকে অবসর যাত্রা শুরু করেছেন, সেই দিনেই তার অবসরের তৈরি কাগজ তার হাতে পৌঁছে দিয়ে নতুন একটি উদ্যোগ শুরু করতে পেরে আনন্দিত। নতুন বাংলাদেশে নতুন সরকারের দৃষ্ঠিভঙ্গি হচ্ছে, কাউকে যেন কোনো কাজে কখনও ভোগান্তি পোহাতে না হয়। সেই চিন্তা থেকে আমি এ কাজটি শুরু করেছি, আগামীতে এটি অব্যাহত থাকবে।
সভায় বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন বগা ডা. ইয়াকুব শরীফ ডিগ্রি কলেজের অধ্যক্ষ মো. হুমায়ুন কবির, পটুয়াখালী প্রেস ক্লাবের সভাপতি মো. জাকির হোসেন, উপজেলা সহকারী প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা বাউফল সৈয়দ মনিরুজ্জামান প্রমুখ।