১৮ মাস ধরে নিখোঁজ থাকা নিঝুম খাতুনকে (১৭) অপহরণ ও শ্বাসরোধে হত্যার লোমহর্ষক রহস্য উদঘাটন করেছে ঝিনাইদহ জেলা গোয়েন্দা পুলিশের সাইবার ক্রাইম ইনভেস্টিগেশন সেল।
পুলিশ সূত্রে জানা যায়, বিয়ের জন্য চাপ দেওয়ায় ঘুরতে নিয়ে গিয়ে প্রেমিক মাশরিকুল রহমান জিম (২৩) তাকে শ্বাসরোধে হত্যা করে পাবনার ঈশ্বরদী উপজেলার পাকশী রেল স্টেশনের নির্জন এলাকায় ফেলে রেখে যান। সেখান থেকে উদ্ধার হওয়া নিঝুমের মরদেহ অজ্ঞাতনামা হিসেবে দাফন করে আঞ্জুমান মফিদুল ইসলাম সংস্থা। পরিকল্পিত এই হত্যাকাণ্ডের সত্যতা স্বীকার করে মঙ্গলবার (২২ সেপ্টেম্বর) সন্ধ্যায় আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন জিম। তিনি ঝিনাইদহের মহেশপুর উপজেলার রাখালভোগা গ্রামের বাসিন্দা।
পুলিশ সুপার মিয়া মোহাম্মদ আশিস বিন হাছান জানান, গত বছরের ১৩ মার্চ মহেশপুর উপজেলার ফতেপুর গ্রামের বাড়ি থেকে নিখোঁজ হন নিঝুম খাতুন। ওই দিনই ঘুরতে যাওয়ার কথা বলে তাকে পাবনার ঈশ্বরদী উপজেলার পাকশী রেলস্টেশনের নির্জন এলাকায় নিয়ে যান প্রেমিক জিম। সেখানে বিয়ের বিষয় নিয়ে দুজনের মধ্যে বাগ্বিতণ্ডা হয়।
আসামি জিমের উদ্বৃতি দিয়ে পুলিশ সুপার আরও জানান, কথা কাটাকাটির একপর্যায়ে জিম নিঝুমকে থাপ্পড় মারলে তিনি জ্ঞান হারান। ওই সময় নিঝুম রোজা ছিল। তাকে মৃত ভেবে জিম নির্জন জঙ্গলে টেনে নিয়ে যান এবং গলায় ওড়না পেঁচিয়ে শ্বাসরোধ করে মৃত্যু নিশ্চিত করে একটি গর্তে ফেলে রাখেন। এরপর ট্রেনে করে পালিয়ে যান তিনি।
ঘটনার চার দিন পর, অর্থাৎ ১৭ মার্চ ঈশ্বরদী থানা পুলিশ পাকশী রেলস্টেশনের ওই নির্জন জায়গা থেকে এক অজ্ঞাতনামা কিশোরীর অর্ধগলিত মরদেহ উদ্ধার করে একটি অপমৃত্যু মামলা করে। পরিচয় নিশ্চিত না হওয়ায় ময়নাতদন্ত শেষে পাবনা আঞ্জুমান মফিদুল ইসলামের সহায়তায় মরদেহটি বেওয়ারিশ হিসেবে দাফন করা হয়।
অন্যদিকে মেয়ের কোনো সন্ধান না পেয়ে ২০২৫ সালের ৮ এপ্রিল মহেশপুর থানায় জিডি এবং পরবর্তীতে পাঁচজনকে আসামি করে অপহরণ মামলা করেন নিঝুমের মা তাসলিমা খাতুন। দীর্ঘদিন নিঝুমের খোঁজ না মেলায় ঝিনাইদহ জেলা সাইবার ক্রাইম ইনভেস্টিগেশন সেল যৌথভাবে মাঠে নামে। তদন্তের একপর্যায়ে সন্দেহভাজন হিসেবে জিমকে আটক করে জিজ্ঞাসাবাদ করা হলে তিনি অপহরণ ও হত্যাকাণ্ডের নির্মম বিবরণ দেন।
এরপর আসামি জিমকে সঙ্গে নিয়ে ঈশ্বরদীর পাকশী এলাকায় ঘটনাস্থল শনাক্ত করে সাইবার সেল। সিআইডির ক্রাইম সিন বিশেষজ্ঞদের আর্কাইভে সংরক্ষিত সেই অজ্ঞাত মরদেহের কাপড়ের ছবি দেখে জিম নিশ্চিত করেন, উদ্ধার করা সেই মরদেহটি নিঝুমেরই ছিল।
মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা উপপরিদর্শক (এসআই) হিমানিশ জানান, আসামি জিম আদালতে নিজের অপরাধ স্বীকার করে ১৬৪ ধারায় জবানবন্দি দিয়েছেন। এছাড়া সাইবার ক্রাইম ইনভেস্টিগেশন সেলের সহকারী উপপরিদর্শক (এএসআই) ইকলাচুর রহমান জানান, আসামিকে গ্রেপ্তারের পর আইনি প্রক্রিয়া শেষে গতকাল (মঙ্গলবার) আদালতে পাঠানো হয়।
পুলিশ সুপার মিয়া মোহাম্মদ আশিস বিন হাছান বলেন, ‘অভিযোগ পাওয়ার পর পুলিশ ও সাইবার ইনভেস্টিগেশন সেলের দক্ষ টিম সমন্বিতভাবে কাজ করে এই জটিল ও ক্লুলেস হত্যাকাণ্ডের রহস্য উদঘাটন করতে সক্ষম হয়েছে। জেলায় অপরাধ দমন ও জননিরাপত্তা নিশ্চিতে পুলিশ নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছে।’