কৃষি
আলু নিয়ে বেকায়দায় চাঁদপুরের চাষি ও হিমাগার কর্তৃপক্ষ
আলুর বাজারদরে ধস নামায় চাঁদপুরের আলুচাষিরা চরম বেকায়দায় পড়েছেন। হিমাগারে রাখা আলু তারা যেমন তুলতে পারছেন না, তেমনি গত মৌসুমে বাকিতে কেনা আলুবীজের ধারদেনাও মেটাতে পারছেন না। এতে বিপাকে পড়েছে হিমাগার কর্তৃপক্ষও।
জেলা কৃষি অফিসের তথ্য অনুযায়ী, জেলায় আলুচাষির সংখ্যা ৫৬ হাজার ৮৬০ জন। সবচেয়ে বেশি আলু চাষ হয় চাঁদপুর সদর, মতলব দক্ষিণ ও কচুয়া উপজেলায়। এসব উপজেলার প্রত্যেকটিতে প্রায় ৫ হাজার হেক্টর জমিতে আলু চাষ হয়।
সরেজমিনে বিভিন্ন গ্রাম ঘুরে দেখা গেছে, সাপ্তাহিক হাটবাজারে এখনো পুরোনো আলু মাত্র ৭–৮ টাকা কেজিতে বিক্রি হচ্ছে।
এদিকে শহর ও গ্রামীণ হাটবাজারে আমদানি বেড়ে যাওয়ায় প্রায় সব ধরনের সবুজ শাকসবজির দাম কমেছে। শিম, বরবটি, করলা ও গাজর বিক্রি হচ্ছে ৬০ টাকা কেজিতে, টমেটো ৪০ টাকা কেজিতে। মাত্র ১৫–২০ দিন আগেও এসব সবজির দাম ছিল ৯০ থেকে ১২০ টাকা কেজি।
আলুর দাম কমে যাওয়ায় বড় অঙ্কের লোকসানের মুখে পড়ে এবার জেলায় অনেক চাষি আলু চাষে বিমুখ হয়েছেন। তারপরও জেলার বিভিন্ন স্থানে নতুন মৌসুমে অনেক চাষিকে আবার আলু বপনে ব্যস্ত দেখা যাচ্ছে। সদর, কচুয়া ও মতলব দক্ষিণের বিভিন্ন এলাকায় ঘুরে এমন চিত্র পাওয়া গেছে।
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের কৃষিবিদ মোবারক হোসেন ইউএনবিকে বলেন, এবার আলুর বাজারে কোনো সিন্ডিকেট না থাকায় দাম কমই থাকবে। তিনি বলেন, ‘গত মৌসুমে সিন্ডিকেটের কারণে ক্রেতাদের ৮০ টাকা কেজিতে আলু কিনতে হয়েছে। এবার সে পরিস্থিতি নেই।’
কচুয়া উপজেলায় হিমাগারে আলু রাখা চাষিরা মারাত্মক সংকটে আছেন। একইভাবে বিপাকে পড়েছে হিমাগার কর্তৃপক্ষও। উপজেলার তিনটি হিমাগারে বিপুল পরিমাণ আলু মজুত আছে। বাজারদর পানির দরে নেমে আসায় প্রকৃত চাষিরা আলু বের করছেন না। ফলে হিমাগারের ভাড়া আদায় করতে পারছেন না কর্মচারীরা।
দুই হিমাগার ব্যবস্থাপক মঙ্গল খান ও ইয়াছিন মিয়া জানান, চাষিরা আলু না তুললে বা ফেরত না নিলে সেগুলো বিক্রি করেও ভাড়ার টাকা আদায় সম্ভব হচ্ছে না। কারণ হাটবাজারে আলুর দাম অত্যন্ত কম।
গত মৌসুমে জেলায় আলুর বাম্পার ফলন হয়েছিল। বর্তমানে বাজারে ভালো মানের পুরোনো আলু ৮–১০ টাকা কেজিতে এবং নতুন আলু ২০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে।
হাজীগঞ্জ উপজেলার বাণিজ্যিক কেন্দ্র বাকিলা বাজারে প্রবীণ আলুচাষি ও বিক্রেতা বাচ্চু মিজি বলেন, ‘আমার জমিতে ১০০ মণ আলু হয়েছে। কিন্তু কোনো লাভ হয়নি, পুরোটাই লস।’
তিনি ও অন্য চাষিরা জানান, সামনে তারা আর আলু চাষ করতে চান না।
সদরের শাহ মাহমুদপুর এলাকার চাষি বাবুল, মকবুল, জহুরুল হক, হানিফ পাটোয়ারি ও তার ছেলেরাও একই হতাশার কথা জানান।
হানিফ পাটোয়ারি বলেন, ‘গত মৌসুমের আলুবীজের টাকাই এখনো দিতে পারিনি। যে লস খেয়েছি, সামনে আর আলু চাষ করব না।’ তিনি আরও জানান, বাবুরহাট বিসিক শিল্পনগরীর হিমাগারে রাখা তার ৩৩ বস্তা (প্রতি বস্তা ৫০ কেজি) আলু বস্তাপ্রতি মাত্র ৩ হাজার টাকায় বিক্রি হয়েছে।
কচুয়া উপজেলাতেও আলুচাষিদের অবস্থা ভালো নয়। লাভের আশায় তারা আলু হিমাগারে রেখেছিলেন। কিন্তু বাজারদর কম থাকায় সেই স্বপ্ন ভেঙে গেছে। নভেম্বর ও ডিসেম্বরের শুরুতে আলু ফেরত নেওয়ার কথা থাকলেও এখনো অর্ধেকের বেশি আলু হিমাগারে পড়ে আছে। এতে কচুয়ার হিমাগার কর্তৃপক্ষের হতাশাও বাড়ছে।
সাম্প্রতিক সময়ে জেলা সদর, হাইমচর, কচুয়া, মতলব উত্তর ও মতলব দক্ষিণ উপজেলায় অধিকাংশ মাঠে আলু রোপণ ও বপনের কাজ চলছে। কোথাও জমি প্রস্তুত করা হচ্ছে, আবার কোথাও শ্রমিক নিয়ে আলু রোপণ ও বপনে ব্যস্ত চাষিরা।
সদরের বাগাদীর শামসুল ইসলাম ও ধনপর্দির ইসমাইল হোসেন ও সুরুজ মিয়া জানান, গত বছর তারা আলুর ন্যায্য দাম পাননি। তাই এবার কম বা অর্ধেক জমিতে আলু চাষ করেছেন। আবহাওয়া অনুকূলে থাকলে এবারও বাম্পার ফলনের আশা করছেন, তবে ভালো দাম পাওয়া যাবে কি না—তা নিয়ে তারা সন্দিহান।
অতি সম্প্রতি মুন্সীগঞ্জ থেকে নৌপথে চাঁদপুরের বাজারে নতুন আলু আসতে শুরু করেছে। তবে নতুন আলুর দাম ৭০ টাকা কেজি থেকে নেমে ২০ টাকায় দাঁড়িয়েছে। এতে ক্রেতাদের আগ্রহ বাড়ছে। বর্তমানে ৫ কেজি নতুন আলু ১০০ টাকা, আর ১০ কেজি পুরোনো আলু ৫০–৬০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।
কৃষিবিদ মোবারক হোসেন আরও জানান, জেলায় বর্তমানে ১০টি হিমাগার চালু রয়েছে। এতে মোট ৮০ হাজার ১৬৯ টন আলু সংরক্ষিত আছে। এসব হিমাগারের সর্বোচ্চ ধারণক্ষমতা ৮০ হাজার ২৫০ টন। তার মতে, যদি সিন্ডিকেট থাকত, তাহলে বাজারে আলুর দাম ৭০ থেকে ১০০ টাকা কেজিতে উঠত।
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ বিভাগের উপপরিচালক কৃষিবিদ আবু তাহের ইউএনবিকে বলেন, চলতি মৌসুমে জেলায় আলু চাষের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ৭ হাজার ২০০ হেক্টর, যা গতবারের তুলনায় ১ হাজার হেক্টর কম। এর প্রধান কারণ হলো, চাষিরা আলুর প্রকৃত দাম না পাওয়ায় হতাশ হয়ে পড়েছেন এবং আগের দেনা পরিশোধ করতে পারছেন না।
তিনি জানান, ইতোমধ্যে প্রায় ৪ হাজার হেক্টর জমিতে আলুর আবাদ হয়েছে। বিভিন্ন এলাকায় চাষিদের সঙ্গে কথা বলে তিনি দেখেছেন, দাম ভালো পেলে চাষিরা স্বাভাবিকভাবেই সেই ফসল চাষে আগ্রহী হন।
৩ দিন আগে
মাটি পরীক্ষার সুফল অধরা, কাঙ্ক্ষিত পরামর্শ পাচ্ছেন না সুনামগঞ্জের কৃষকেরা
সুনামগঞ্জে মৃত্তিকা সম্পদ উন্নয়ন ইনস্টিটিউট হাওরের কৃষি উন্নয়নে মাটির গুণাগুণ পরীক্ষা করে মাঠ পর্যায়ের কৃষকদের নানা পরামর্শ দেওয়ার কথা থাকলেও কৃষকরা কাঙ্ক্ষিত পরামর্শ পাচ্ছেন না। মাটি পরীক্ষার পর সংশ্লিষ্টরা পরামর্শ দিলেও অনেক ক্ষেত্রে কৃষক তা মানছেন না। তাছাড়া মাটি পরীক্ষা করে কৃষির উন্নয়নে কৃষকেরা উদ্যোগী হবেন—এই কার্যক্রমের পরিসংখ্যান পর্যালোচনায়ও স্বাভাবিক গতি কমতে দেখা গেছে।
চাষবাসের উন্নয়নে ফসল ফলানোর লক্ষ্যে কোন মাটিতে কীভাবে পরিচর্যা করতে হয়, এ বিষয়ে প্রশিক্ষণসহ মাটির গুণাগুণ বিশ্লেষণ করে নিয়মিত পরামর্শ দেওয়ার কথা রয়েছে মৃত্তিকা সম্পদ উন্নয়ন ইনস্টিটিউটের।
সংস্থাটির একটি সূত্র জানিয়েছে, হাওরের কৃষক ও অন্যান্য উপকারভোগীদের মাটি, পানি, উদ্ভিদ ও সার বিশ্লেষণ সেবা এবং মৃত্তিকা নমুনা বিশ্লেষণের ফলাফল অনুসারে স্থানভিত্তিক ফসল চাষের জন্য সার প্রয়োগের সুপারিশ করার কথা প্রতিষ্ঠানটির। এছাড়া জেলার মাটির উর্বরতা এবং ভূমির উৎপাদন কার্যক্রম প্রতিনিয়ত পর্যবেক্ষণ করে ফলাফলও যথাযথভাবে প্রয়োগ করার কথা।
মৃত্তিকা বিশ্লেষণের ফলাফল, মৃত্তিকা স্বাস্থ্য কার্ড কর্মসূচি বাস্তবায়ন এবং মৃত্তিকা বিশ্লেষণের ফলাফলের ভিত্তিতে বিভিন্ন ফসল চাষে সার প্রয়োগের বিশেষ সুপারিশ করে থাকে প্রতিষ্ঠানটি। এ ছাড়াও মাটির উর্বরতা অবক্ষয় সমস্যা, ফসলের পুষ্টি উপাদানের সমস্যা, মৃত্তিকা রসের অভাব এবং ফসল উৎপাদনে বাধা ইত্যাদি বিষয়ে গবেষণা করে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশনা দেওয়া হয় বলে জানান প্রতিষ্ঠানটির সংশ্লিষ্টরা।
সুনামগঞ্জ কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, জেলায় প্রায় পৌনে চার লাখ কৃষক পরিবার রয়েছে, যাদের বেশিরভাগই হাওরের বোরো জমির ওপর নির্ভরশীল। সনাতন পদ্ধতিতে দীর্ঘদিন ধরে তারা চাষবাস করে আসছেন। এখনো আধুনিক কৃষির সঙ্গে তাদের পরিচয় হয়নি। তাই কৃষির ফলনে তারা পিছিয়ে আছেন।
এদিকে ২০২১ সালে হাওর জেলা সুনামগঞ্জে কার্যক্রম শুরুর পর সুনামগঞ্জ মৃত্তিকা সম্পদ উন্নয়ন ইনস্টিটিউট ৪ হাজার ৪৬০ জন কৃষককে সার প্রয়োগের সুপারিশ করেছে বলে জানা গেছে। কখনো মাঠ থেকে, কখনো কৃষকরা মাটির নমুনা অফিসে নিয়ে এসে মাটির গুণাগুণ পরীক্ষা করাচ্ছেন। এই পরীক্ষার আলোকে ফসল উৎপাদনে কাঙ্ক্ষিত ফলনের জন্য সংশ্লিষ্টরা কৃষকদের সার প্রয়োগের সুপারিশ করছেন। এজন্য তাদের বিশেষ কার্ডও দেওয়া হচ্ছে।
পাশাপাশি অনলাইনেও কৃষকরা পূর্ণ ঠিকানা নিবন্ধন করলে অফিসের লোকজন মাঠে গিয়ে মাটির নমুনা এনে পরীক্ষার সুযোগ করে দিচ্ছেন বলে জানা গেছে। এ ছাড়াও কৃষি অফিসের মাধ্যমে জেলার সুনামগঞ্জ সদর, তাহিরপুর, বিশ্বম্ভরপুর, দোয়ারাবাজার, ছাতক, জগন্নাথপুর, দিরাই, জামালগঞ্জ ও শান্তিগঞ্জে ভ্রাম্যমাণ গবেষণাগারে প্রশিক্ষণ ও মাটির গুণাগুণ পরীক্ষা করা হয়েছে। এসব উপজেলায় ৫০ জন করে কৃষককে গবেষণাগার পরিদর্শন করিয়ে বিশেষ প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছেন মৃত্তিকা সম্পদ ইনস্টিটিউট সংশ্লিষ্টরা।
তবে সংশ্লিষ্ট দপ্তর থেকে প্রাপ্ত তথ্য পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, কার্যক্রম চালুর পর ২০২১-২০২২ অর্থবছরে কৃষকদের সার সুপারিশ সেবার পরিসংখ্যান বেশি দেওয়া হলেও এখন এই গতি কমে এসেছে। চলতি বছর মাত্র ৪৬০ জন কৃষককে সার সুপারিশ কার্ড প্রদান করা হয়েছে।
তালিকা ধরে কৃষকদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, যারা উপজেলা কৃষি অফিসে মাটির নমুনা দিয়ে মাটি পরীক্ষা করিয়েছিলেন, তারা কোনো পরামর্শ পাননি। তাই পরীক্ষার পর তাদের কী করতে হবে, এ বিষয়ে তারা ওয়াকিবহাল নন।
দিরাই উপজেলার শরিফপুর গ্রামের কৃষক জামাল হোসেন বলেন, আমি বছরখানেক আগে দিরাই কৃষি অফিসে খেতের মাটি দিয়ে এসেছিলাম। তারপরও আমাকে তারা কিছুই জানায়নি। আমি আগে যেভাবে চাষ করতাম, এখনও একইভাবে চাষ করতেছি।
ধর্মপাশা উপজেলার নোয়াগাঁও গ্রামের কৃষক আব্দুল মজিদ বলেন, আমি দুই বছর আগে মাটি দিয়ে আসছিলাম। পরে আমাকে কিছু জানায়নি। আমি আমার মতো করে চাষ করি।
সুনামগঞ্জ সদর উপজেলার লক্ষণশ্রী গ্রামের কৃষক ইকবাল হোসেন বলেন, আমি মাটি পরীক্ষা করিয়েছিলাম, কিন্তু তারা জমিতে যে পরিমাণ সার প্রয়োগ করার কথা বলেছে, তা দিলে উৎপাদন খরচ দ্বিগুণ হয়ে যাবে।
প্রতি শতাংশে ১ কেজি ৪০০ গ্রাম সার প্রয়োগের সুপারিশ করা হয়েছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, তাদের হিসাব মানলে প্রতি কেয়ারে (প্রতি ৩০ শতাংশে এক কেয়ার) ৪০ কেজির ওপর সার প্রয়োগ করতে হবে। এতে খরচ দ্বিগুণ বেড়ে যাবে। তাই তাদের সুপারিশ না মেনে নিজের মতো করে চাষ করছি।
সুনামগঞ্জ মৃত্তিকা সম্পদ ইনস্টিটিউটের প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা মো. আমিনুল ইসলাম বলেন, মাটি পরীক্ষার ফলাফলের ভিত্তিতে আমরা সার প্রয়োগ সুপারিশ করে থাকি। এটা মানলে ফলন বেড়ে যাবে এবং রোগবালাইও প্রতিরোধ হবে। তবে কেউ না মানলে তো আমাদের কিছু করার নেই।
তবে পরীক্ষা করার পরও যারা সুপারিশ কার্ড পাননি, তাদের ব্যাপারে খোঁজ নিয়ে ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে জানান এ কর্মকর্তা।
৬ দিন আগে
চাষের আওতায় আসছে হাওরের ১৭ হাজার ১৯ হেক্টর পতিত জমি
সুনামগঞ্জসহ সিলেট বিভাগের চার জেলায় কৃষির উন্নয়নে ভূ-উপরিস্থ পানি ব্যবস্থাপনা উন্নয়নের মাধ্যমে পতিত জমি চাষাবাদ, খাল-পাহাড়ি নালা খনন, হাওরের গোপাট পাকাকরণ, কৃষক প্রশিক্ষণ প্রদানসহ নানা কার্যক্রমের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। চলতি অর্থ বছরে শুরু হওয়া এই কার্যক্রম শেষ হবে ২০২৯ সালে।
বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন করপোরেশন (বিএডিসি) প্রায় ৫শ কোটি টাকা ব্যয়ে প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করছে। প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে সুনামগঞ্জ, সিলেট, মৌলভীবাজার ও হবিগঞ্জ জেলায় ১৭ হাজার ১৯ হেক্টর পতিত জমির সেচ সুবিধার আওতায় আসবে। এর ফলে প্রায় ৫১ হাজার ৫৮ টন অতিরিক্ত খাদ্য উৎপাদিত হবে।
প্রকল্প পরিচালকের কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, ৫ বছর মেয়াদী এই প্রকল্প সম্পন্ন হলে বিভিন্ন প্রশিক্ষণের মাধ্যমে জলবায়ু প্রভাব মোকাবিলা করে পানি সংরক্ষণ ও এর সঠিক ব্যবহার করে কীভাবে চাষাবাদ করতে হয়, তা শিখবেন স্থানীয় কৃষকেরা। এতে করে ধান এবং অন্যান্য ফসলের উৎপাদনও বাড়বে। বাস্তবায়িত প্রকল্পে ধানের উৎপাদন বৃদ্ধির পাশাপাশি খাল ও পাহাড়ি নালা খননের ফলে মাছেরও উৎপাদন বৃদ্ধি হবে। কৃষকের আয় ও জীবনমান উন্নয়নের পাশাপাশি ভূ-উপরিস্থ পানির ব্যবহার বাড়িয়ে ভূগর্ভস্থ পানির ওপর নির্ভরতা কমানো ও পানির সঠিক ও টেকসই ব্যবহারও নিশ্চিত করবে।
প্রকল্প সংশ্লিষ্টরা আরো জানান, প্রকল্পের আওতায় ১৫ হাজার ৩৩৯ হেক্টর ভূ-উপরিস্থ জমির পানি এবং ১ হাজার ৬৮০ হেক্টর ভূগর্ভস্থ জমির পানিতে সেচ সরবরাহে জুন মাস থেকে কাজ শুরু হয়েছে। এতে বন্যা নিয়ন্ত্রণ, অবকাঠামো উন্নয়ন, সেচ সুবিধা সম্প্রসারণ, কৃষক সক্ষমতা উন্নয়ন, প্রযুক্তিগত ও প্রশাসনিক ব্যবস্থাপনা কার্যক্রম বাস্তবায়িত হচ্ছে। বন্যা নিয়ন্ত্রণ ও শুকনো মৌসুমে সেচ সুবিধা বাড়াতে খাল খনন, রাবার ড্যাম, রেগুলেটর সংস্কার, কালভার্ট নির্মাণে বিভিন্ন এলাকায় প্রকল্পের কাজ চলছে। এর পাশাপাশি গভীর নলকূপ স্থাপন ও কৃষক সক্ষমতা উন্নয়নে প্রশিক্ষণের প্রস্তুতি ইতোমধ্যে সম্পন্ন হয়েছে। তবে, প্রকল্পের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ আরসিসি গোপাট নির্মাণ কার্যক্রম শুরু হওয়ায় খুশি কৃষকরা। গোপাট নির্মিত হলে কৃষকরা সহজে বোরো মওসুমে নৌপথে ও গাড়িতে করে হাওর থেকে ধান বাড়িতে নিয়ে আসতে পারবেন। এতে তাদের সময় ও অর্থ অপচয় কম হবে।
সুনামগঞ্জ বিএডিসি সূত্রে জানা গেছে, ৫ বছর মেয়াদি এই প্রকল্পে হাওর জেলা সুনামগঞ্জে প্রায় ১০ হাজার হেক্টর পতিত জমি চাষের আওতায় আসবে। পানি ব্যবস্থাপনার উন্নয়নে খনন করা হবে ৭০ কিলোমিটার খাল ও পাহাড়ি নালা, ১০টি গভীর নলকূপ স্থাপন, ৩০টি পুরাতন স্কিম সংস্কার, ১৫টি কালভার্ট নির্মাণ, দুটি স্লুইসগেট নির্মাণ, ৪টি গোপাট নির্মাণ এবং প্রায় ৩ কিলোমিটার এলাকা জলাবদ্ধতা নিরসনে কাজ করা হবে।
প্রকল্প পরিচালকের কার্যালয় জানিয়েছে, প্রকল্পে চার জেলায় ২২১ কিলোমিটার খাল ও পাহাড়ি নালা খনন এবং ১০৫ কিলোমিটার খাল ও পাহাড়ি ছড়া সংস্কার করা হবে। খননের ফলে খালের পানি ধারণক্ষমতা বৃদ্ধি পাবে এবং বন্যা ও বৃষ্টির পানি সংরক্ষণ করে সঞ্চিত পানি দিয়ে আমন ও রবি মৌসুমে সম্পূরক সেচের ব্যবহার করা হবে। এতে ২ হাজার ৬৮১ হেক্টর জমি ভূ-উপরিস্থ পানির ব্যবহার হবে।
উজান থেকে হঠাৎ নেমে আসা পাহাড়ি ঢলে নিমজ্জিত হাওর এলাকায় সৃষ্ট জলাবদ্ধতা খাল, নালা, পাহাড়ি ছড়া পুনর্খনন ও সংস্কারের মাধ্যমে আগাম বন্যা থেকে প্রায় ৭ হাজার ৯০০ হেক্টর জমি রক্ষা পাবে এবং ৫ কিলোমিটার ভূগর্ভস্থ পাইপ লাইন নির্মাণের ফলে ১৬৭ হেক্টর জমির স্থায়ী জলাবদ্ধতা দূর হবে। এতে ৮ হাজার ৬৭ হেক্টর বোরো জমির প্রায় ২৪ হাজার ২০০ মে.টন ফসল সুরক্ষা পাবে।
এ ছাড়াও প্রকল্পে ১১০টি ৫-কিউসেক এলএলপি, ৪০টি ২-কিউসেক এলএলপি, ৮টি ১-কিউসেক এলএলপি, ৪০টি ১.৫-কিউসেক ফোর্সমোড পাম্প স্থাপনসহ ৩৬৭.৬ কিলোমিটার ভূগর্ভস্থ সেচনালা নির্মাণ, ০.৫-কিউসেক উচ্চ হেডের পাম্পের সাহায্যে ২০টি স্প্রিঙ্কলার সেচ পদ্ধতি প্রয়োগ, ৪০টি আর্টেশিয়ান নলকূপ স্থাপন এবং ৫টি ফোর্সমোড নলকূপ পুনর্বাসন করে ১০ হাজার ৩২ হেক্টর কৃষি জমি আধুনিক সেচের আওতায় চলে আসবে। প্রকল্পে ৮০টি ওয়াটার পাস, ক্যাটল ক্রসিং, ফুট ব্রিজ, পাইপ স্লুইসসহ ক্ষুদ্রাকার সেচ অবকাঠামো নির্মাণ করা হবে। ১০টি রেগুলেটর, সাবমার্জড ওয়ার, ক্রস ড্যাম, সাইফন, কনডুইট নির্মাণের মাধ্যমে মধ্যমাকার সেচ অবকাঠামো করে প্রায় ১ হাজার হেক্টর কৃষি জমি আধুনিক সেচের আওতায় নিয়ে আসা হবে। তাছাড়া বৃষ্টি ও বন্যার পানি সংরক্ষণ, নিষ্কাশন, চলাচলে ৯০টি অবকাঠামো ব্যবহার করে কৃষকরা সহজে হাওর থেকে ফসল পরিবহন করতে পারবেন।
কৃষকদের ফসল পরিবহনে অন্তত ১০ কিলোমিটার গোপাট নির্মাণ করা হবে। প্রকল্পে ৯শ মেকানিক, ম্যানেজার, অপারেটর, ফিল্ডসম্যান, কৃষক ও কৃষাণীকে সেচ ব্যবস্থাপনা, সেচযন্ত্র রক্ষণাবেক্ষণ, খাদ্যশস্য ও বীজ উৎপাদন, প্রক্রিয়াজাতকরণ, সবজি উৎপাদন বিষয়ে হাতেকলমে প্রশিক্ষণ দিয়ে কৃষিতে বিশেষ দক্ষ করে গড়ে তোলা হবে বলে জানান সংশ্লিষ্টরা।
কঠোর নজরদারির দাবি হাওর আন্দোলনের
কৃষি উন্নয়নে যুগান্তকারী এই পদক্ষেপকে হাওর আন্দোলনের নেতাসহ কৃষকরা সাধুবাদ জানিয়েছেন। তবে কার্যক্রম বাস্তবায়নের সময় কঠোর নজরদারির দাবি জানিয়েছেন তারা।
অতীত অভিজ্ঞতার আলোকে তারা জানিয়েছেন যে ড্রেন, কালভার্ট ও রেগুলেটর নির্মাণ এবং খাল খননে যেসব ঠিকাদার নিয়োগ দেওয়া হয়, তারা দুর্নীতি ও অনিয়মের আশ্রয় নিয়ে নিম্নমানের কাজ করেন। খাল খনন না করেই বরাদ্দ লোপাট করার ঘটনাও অতীতে ঘটেছে। ড্রেন নির্মাণের পর ১ বছর না যেতেই ধসে পড়েছে। কালভার্ট ও রেগুলেটর নির্মাণেও অনিয়ম ও অব্যবস্থাপনা হয়েছে। তাই এসব কাজ যাতে যথাযথভাবে বাস্তবায়ন হয়, সেদিকে কঠোর নজরদারির জোর দাবি জানিয়েছেন তারা।
সুনামগঞ্জের শ্রমিক আন্দোলনের নেতা সাইফুল আলম সদরুল বলেন, বিএডিসি সরকারের কৃষি উন্নয়নের আদি প্রতিষ্ঠান। এর মাধ্যমে কৃষি উন্নয়নে যে প্রকল্পটি নেওয়া হয়েছে, তা যুগান্তকারী। তবে প্রকল্প বাস্তবায়নে কঠোর নজরদারি রাখতে হবে, নাহলে সরকারি বরাদ্দের যাচ্ছেতাই ব্যবহার হবে এবং কৃষিতে কাঙ্ক্ষিত পরিবর্তন আসবে না।
হাওর বাঁচাও আন্দোলনের নেতা ও হাওরের গোপাট নিয়ে বিভিন্ন ফোরামে কথা বলা অধ্যাপক চিত্তরঞ্জন তালুকদার বলেন, হাওরের গোপাট পাকা করা হলে কৃষক সহজে নৌপথে ও সড়কপথে ধান পরিবহন করতে পারবে। এতে খরচ ও সময় বাঁচবে। তবে প্রকল্পের খাল, পাহাড়ি নালা খনন ও সংস্কার, রেগুলেটর ও কালভার্ট নির্মাণে সতর্ক থাকতে হবে। কারণ এসব কাজে প্রচুর অনিয়ম হয়।
তিনি বলেন, দুর্নীতি ও অব্যবস্থাপনা দূর করে প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে সুনামগঞ্জসহ চার জেলায় কৃষিতে বিরাট পরিবর্তন আসবে।
সিলেট বিভাগে ভূ-উপরিস্থ পানি ব্যবস্থাপনা ও ব্যবহারের মাধ্যমে কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধি প্রকল্পের পরিচালক প্রকৌশলী প্রনজিত কুমার দেব বলেন, প্রায় ৫ বছরের চেষ্টার পর প্রকল্পটি চলতি অর্থবছর থেকে শুরু হয়েছে। প্রকল্পে খাল-পাহাড়ি নালা খনন, পতিত জমি চাষের আওতায় আনা, কৃষকদের প্রশিক্ষণ, গোপাট নির্মাণ, পুরাতন প্রকল্প সংস্কার, গভীর নলকূপ স্থাপনসহ নানা কার্যক্রম বাস্তবায়িত হবে। ইতোমধ্যে কাজও শুরু হয়ে গেছে। প্রকল্পে যাতে কোনো অনিয়ম ও অব্যবস্থাপনা না হয়, সেদিকে আমাদের কঠোর নজরদারি রয়েছে।
৮ দিন আগে
চায়না কমলা চাষ করে সাড়া ফেলেছেন চাঁপাইয়ের সায়েম আলী
চাঁপাইনবাবগঞ্জে চায়না কমলা চাষ করে এলাকায় ব্যাপক সাড়া ফেলেছেন সায়েম আলী (৪১) নামের এক কৃষি উদ্যোক্তা। এখন তার বাগানে শোভা পাচ্ছে থোকায় থোকায় কমলা। এই সাফল্যের খবরে অনেকেই দেখতে আসছেন তার কমলার বাগান।
কৃষি উদ্যোক্তা সায়েম আলীর সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, কয়েক বছর আগে তিনি আম চাষ করতেন, তবে লাভের মুখ তেমন দেখতেন না। একদিন বাজারে চায়না কমলা লেবু বিক্রি হতে দেখে এই কমলা চাষে উদ্বুদ্ধ হন। এরপর কৃষি অফিসে যোগাযোগ করেন। কৃষি কর্মকর্তাদের পরামর্শ ও সহযোগিতায় ২০২২ সালে সদর উপজেলার বহরম এলাকায় ৩ বিঘা জমিতে গড়ে তোলেন চায়না কমলার বাগান। বাগান তৈরিতে তার খরচ হয় প্রায় দেড় লাখ টাকা। চলতি বছর তার বাগানে ঝুলছে বিপুল পরিমাণ কমলা। থোকায় থোকায় ঝুলে থাকা এই ফল যেন তার পরিশ্রমের ফসল।
সায়েম আলী বলেন, ২০২৪ সালে প্রথম ফল আসে আমার বাগানে। সেই ফল বিক্রি করে খরচ তুলেও কিছু লাভবান হয়েছি। এবার তো গাছে গাছে অনেক কমলা ধরেছে। ১০০ টাকা কেজি দরে বিক্রি করছি। সব খরচ বাদে আশা করছি ৬ থেকে ৭ লাখ টাকা লাভ হবে।
কমলা বাগানের কৃষি শ্রমিক আনরুল ইসলাম বলেন, আমি এই বাগানের শুরু থেকেই পরিচর্যার কাজ করছি। এবার ফলন ভালো হয়েছে। এই কমলা খেতেও খুব সুস্বাদু। বাজারে চাহিদা ভালো আছে। এই ফল বিক্রির জন্য চিন্তা করতে হয় না। ব্যাপারিরা বাগানে এসে কমলা কিনে নিয়ে যায়।
২৬ দিন আগে
বন্যার পলিতে উর্বর উত্তরের চরাঞ্চল, চাষাবাদের ধুম
বন্যার পানি নেমে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে উত্তরের নদ-নদীগুলোর তীর এখন ধুঁ ধুঁ মরুভূমিতে পরিণত হয়েছে। বালুময় জমিগুলোর ওপর বন্যার রেখে যাওয়া পলি জমে বেলে-দোআঁশে পরিণত হওয়ায় চাষাবাদের ধুম পড়েছে তিস্তা, ধরলা, সানিয়াজান ও ব্রহ্মপুত্র নদীর চরে।
কৃষি বিভাগ বলছে, উত্তরের এসব নদীতে প্রায় ৭৮৬ টি চর রয়েছে। বন্যার পানি নেমে যাওয়ার পর চরের মানুষগুলো ঘুরে দাঁড়াতে শুরু করেছে।
রংপুর কৃষি অঞ্চলের অতিরিক্ত পরিচালক কৃষিবিদ সিরাজুল ইসলাম বলেন, এসব চরে এবার ৩৬ হাজার ৯১১ হেক্টর জমিতে চাষাবাদের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে, আর বিভিন্ন প্রকার ফসলের উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ৩ লাখ ৬২ হাজার টন।
কৃষি বিভাগ মনে করে, চরের ফসলে ঘুরে দাঁড়াবে এই অঞ্চলের বাসিন্দারা। এক ফসলেই তাদের সারা বছর চলে যায়, বলেন এই কর্মকর্তা।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, উত্তরের লালমনিরহাট, রংপুর, কুড়িগ্রাম, গাইবান্ধা ও নীলফামারী জেলার তিস্তা নদীর চরে কৃষিজমিতে এখন ব্যস্ত সময় পার করছেন স্থানীয়রা। ইতোমধ্যে বিভিন্ন স্থানে আলু, বেগুন, মরিচ, ছিটা পেঁয়াজ, আদা, রসুন, শিম, ধনেপাতা, গাজর, কপি, মুলা, লাউ, গম, তিল, তিশি, সরিষা, ভুট্টার আবাদ হয়েছে। সব ফসলেরই ভালো ফলন আশা করছেন চাষিরা।
রংপুরের গঙ্গাচরার ইচলির চরের হোসেন মিয়া বলেন, তিস্তার চরে ৩ বিঘা জমিতে আলু, তিন বিঘায় বেগুন ও ২০ শতক জমিতে ধনেপাতা চাষ করেছি। ফলন ভালো হলে খরচ বাদ দিয়ে এ মৌসুমে দেড় লাখ টাকা আয় হবে।
শুধু হোসেন নন ওই এলাকার কৃষক হাবিবুর, রহিম ও খায়রুল বলেন প্রায় একই কথা। তাদের দাবি, যেটুকু জমিতে আবাদ করেছি, ফলন ভালো হলে ৬০-৭০ হাজার টাকা করে লাভ হবে তো হবেই।
লক্ষ্মীটারি ইউপি চেয়ারম্যান আব্দুল্লাহ আল হাদী বলেন, তিস্তার চরাঞ্চল এখন কৃষি জোনে পরিণত হয়েছে। ইতোমধ্যে অনেক ফসল বাজারে উঠতে শুরু করেছে। অনেকে নতুন করে চাষাবাদ করছেন। চরের কৃষকের একটাই দুঃখ; উৎপাদিত পণ্য সংরক্ষণ, বাজারে সরবরাহ এবং প্রক্রিয়াজাতকরণের কোনো ব্যবস্থা নেই। সে কারণে চাষিরা কাঙ্ক্ষিত মুনাফা অর্জন থেকে বঞ্চিত হন।
তিনি আরও বলেন, তিস্তার চরাঞ্চলে যেসব ফসল উৎপাদন হয়, তাতে অন্তত ২-৩টি হিমাগার প্রয়োজন। অথচ গংগাচড়ায় আছে মাত্র একটি হিমাগার। তাছাড়া যোগাযোগব্যবস্থা বিচ্ছিন্ন থাকায় চরাঞ্চল থেকে কৃষক উৎপাদিত পণ্য সহজে বাজারে নিতে পারেন না।
কৃষি কর্মকর্তা তুষার কান্তি বলেন, তিস্তার চরাঞ্চলের মাটিতে পলি জমায় তা অনেক উর্বর। রাসায়নিক সার ছাড়াই বিভিন্ন ফসলের ফলন ভালো হচ্ছে। বিশেষ করে ভুট্টা, গম, আলু, মরিচ, পেঁয়াজ, রসুন, সরিষা, তিল, তিশিসহ শাকসবজি চাষ বেশি হচ্ছে।
চর নিয়ে কাজ করেন বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. তুহিন ওয়াদুদ। তিনি বলেন, বন্যা চলে যাওয়ার পর চরের জমিতে যে পলি থাকে, তা অত্যন্ত উর্বর। এ কারণে প্রতি বছরই বন্যার পর কৃষিতে বাম্পার ফলনের দেখা পান চরের কৃষকরা। তবে যোগাযোগ ব্যবস্থা উন্নত না হওয়ায় ন্যায্য মূল্য পান না চাষিরা।
তিনি মনে করেন, তিস্তাসহ অন্যান্য নদী যদি খনন করা হয়, তাহলে চরের জমিগুলো জেগে উঠবে এবং উত্তরের মানুষের আর অভাব থাকবে না।
কৃষি কর্মকর্তারা বলছেন, উত্তরের ৮ জেলার ৭৮৬টির বেশি চরে যে ফসল উৎপাদন হবে, তাতে ২০০ কোটি টাকা আয় হওয়া সম্ভব।
ফসল উৎপাদনের জন্য কৃষকদের প্রণোদনাসহ কারিগরি সহায়তা দিয়ে যাচ্ছে কৃষি বিভাগের মাঠকর্মীরা। বন্যায় চরের যেসব কৃষক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন, তাদের ইতোমধ্যেই সহায়তা দেওয়া হয়েছে বলে জানান রংপুর অঞ্চলের কৃষি কর্মকর্তা সিরাজুল ইসলাম।
৩৫ দিন আগে
কৃষিতে মধ্যভোগীদের নিয়ন্ত্রণে সবাইকে এগিয়ে আসতে হবে: কৃষি উপদেষ্টা
স্বরাষ্ট্র ও কৃষি উপদেষ্টা লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব.) মো. জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরী বলেছেন, কৃষিতে মধ্যভোগীদের নিয়ন্ত্রণ করতে সবাইকে এগিয়ে আসতে হবে।
তিনি বলেন, ‘আপনারা যদি পলিথিন ও প্লাস্টিকের পানির বোতল ব্যবহার বন্ধ করতে পারেন—তাহলে সবাই পাটজাত পণ্য ব্যবহার করতে সক্ষম হবেন। এই বিষয়ে ইতোমধ্যেই কার্যক্রম গ্রহণ করা হচ্ছে।’
বুধবার (২৭ আগস্ট) দুপুরে মানিকগঞ্জ জেলার সিঙ্গাইরে ধল্লার মেদুলিয়া গ্রামে আয়োজিত অনুষ্ঠানে মেদুলিয়া সমন্বিত কৃষক উন্নয়ন সংঘকে মিনি কোল্ড স্টোরেজের চাবি হস্তান্তর করার পর স্থানীয় সাংবাদিকদের তিনি এসব কথা বলেন।
জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরী আরও বলেন, মধ্যভোগীরা কৃষি সিন্ডিকেট করে বড় বড় বিল্ডিংয়ের মালিক হচ্ছেন। আমার কৃষকরা কুড়ে ঘরেই থাকতে হচ্ছে। ফারমারস মিনি কোল্ড স্টোরেজ কেবল ফসল সংরক্ষণ নয়, বরং কৃষি অর্থনীতিতে স্থিতিশীলতা আনার এক যুগান্তকারী পদক্ষেপ। ভবিষ্যতে এ প্রকল্পকে আরও সম্প্রসারণের মাধ্যমে দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলের কৃষকদের হাতে প্রযুক্তি পৌঁছে দিতে হবে। আপনাদের মানিকগঞ্জে গাজর, শীতকালীন সবজি বেশী উৎপাদন হয়। এই ব্যবস্থায় কৃষক, ভোক্তার সরাসরি উপকৃত হবেন। এ মিনি কোল্ড স্টোরেজ পরে আরও বাড়ানো হবে। প্রয়োজনে কৃষকরা নিজেরাও বাড়িতে তৈরি করে নিতে পারবেন অল্প খরচে। আমারা কৃষকদের কারিগরি সহায়তা দেবো।
পড়ুন: কৃষকরা এবছর দাম পায়নি, আলু কিনবে সরকার: কৃষি উপদেষ্টা
তিনি আরও বলেন, জলবায়ু পরিবর্তন ট্রাস্ট ফান্ডের অর্থায়নে কৃষি মন্ত্রণালয় বাস্তবায়িত ‘জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকি মোকাবিলায় সাশ্রয়ী কোল্ড স্টোরেজ প্রযুক্তি সম্প্রসারণের মাধ্যমে কৃষকের আয় বৃদ্ধি প্রকল্প’র আওতায় সারা দেশে ১০০টি ফারমারস মিনি কোল্ড স্টোরেজ বিতরণ করা হচ্ছে।
এর আগে তিনি কৃষকদের সরাসরি প্রশ্ন শোনেন। এতে খাল বে-দখল, বিদ্যুৎ সংযোগসহ বিভিন্ন অভিযোগ শুনেন এবং তার দ্রুত ব্যবস্থা গ্রহণ করতে সংশ্লিষ্ট দপ্তরকে নির্দেশ দেন।
তিনি কৃষকদের উদ্দেশে আরও বলেন, ‘আমাদের সময় সীমিত। এজন্য এর আগে একটি কৃষি আইন প্রণয়ন করা হবে—যাতে কৃষিজমি অন্য কোনো কাজে ব্যবহার না করা যায়। রোডস অ্যান্ড হাইওয়ে যখন কোনো রাস্তা তৈরি করতে জমির মালিককে তিনগুণ মূল্য দেয়, একইভাবে এলজিইডিকেও দিতে হবে। এছাড়া জমির টপ সয়েল ইটভাটার মালিকদের কাছে বিক্রি করা অন্যায়। এটি নষ্ট হলে উৎপাদন কমে যায়।’
অনুষ্ঠানে আরও উপস্থিত ছিলেন-কৃষি সচিব ড. মোহাম্মদ এমদাদ উল্লাহ মিয়ান, কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের মহা পরিচালক, মো. ছাইফুল আলম, মানিকগঞ্জ জেলা প্রশাসক, ড. মানোয়ার হোসেন মোল্লা, পুলিশ সুপার মোছা. ইয়াছমিন খাতুন, মানিকগঞ্জ কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ পরিচালাক ড. রবীআহ নুর আহমেদসহ প্রায় তিন শতাধিক কৃষক।
১৩২ দিন আগে
মানুষের থালা থেকে পাখির ঠোঁটে: চরাঞ্চলে বিলুপ্তির পথে কাউন
কুড়িগ্রামের চরাঞ্চলে একসময়ের পরিচিত ও পুষ্টিকর খাদ্যশস্য কাউন আজ হারিয়ে যাওয়ার পথে। শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে কৃষিজীবী মানুষের খাবারের অংশ হয়ে থাকা এই শস্য এখন আর চরাঞ্চলের মাঠে আগের মতো দেখা যায় না। জেলার প্রত্যন্ত চরের কৃষকরা কাউন চাষ ছেড়ে ঝুঁকছেন বেশি লাভজনক ও উচ্চ ফলনের ফসলের দিকে।
কুড়িগ্রাম কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, ২০২৫ সালে জেলায় কাউনের চাষ নেমে এসেছে মাত্র ৬০ হেক্টর জমিতে। অথচ গত বছরও ৪২০ হেক্টর জমিতে কাউন চাষ হয়েছিল। দুই দশক আগে অন্তত বিশ হাজার হেক্টর জমিতে এ শস্যের চাষ হতো।
একসময় যে চরভূমিতে সোনালি কাউনের ঢেউ উঠত, সেখানে এখন চাষ হচ্ছে ধান, ভুট্টা, মিষ্টি কুমড়াসহ অন্যান্য বাণিজ্যিক ফসল।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর, কুড়িগ্রামের উপপরিচালক আবদুল্লাহ আল মামুন বলেন, ‘বর্তমান ধারায় পরিবর্তন না এলে এক দশকের মধ্যেই চরাঞ্চল থেকে চিরতরে হারিয়ে যেতে পারে কাউন। এটি শুধু ফসলচক্রের পরিবর্তন নয়, বরং একটি গ্রামীণ খাদ্য ঐতিহ্যের অবক্ষয়।’
কাউন বা ফক্সটেল মিলেট শুষ্ক সহনশীল ও কম খরচের একটি শস্য। বন্যা বা দুর্ভিক্ষের সময়গুলোতে চরবাসীর ভরসা ছিল এই কাউন। ধানের চেয়ে অনেক কম পানি ও সার লাগে বলে দরিদ্র কৃষকরা সহজে এটি চাষ করতেন এবং ভাতের বিকল্প খাদ্য হিসেবে গ্রহণ করতেন। তবে সময় বদলেছে। এখনকার কৃষকেরা ভাবেন লাভের কথা।
‘কাউনে লাভ নেই’, বলছিলেন নাগেশ্বরীর চর বামনডাঙ্গার কৃষক নজরুল ইসলাম (৬৫), ‘গত বছর পাঁচ বিঘায় (চাষ) করেছিলাম, এবার করেছি এক বিঘায়। প্রতি বিঘা থেকে চার থেকে ছয় মণ কাউন পাওয়া যায়। প্রতি মণ বিক্রি হয় ১ হাজার ২০০ থেকে ১ হাজার ৩০০ টাকায়; কিন্তু খরচ পড়ে আড়াই হাজার টাকা। হিসাব মেলে না।’
২০৪ দিন আগে
কৃষি, প্রাণ-প্রকৃতি ও খাদ্য নিরাপত্তায় সমন্বয় জরুরি: পরিবেশ উপদেষ্টা
খাদ্য নিরাপত্তা, কৃষি ও প্রাণ-প্রকৃতি—এই তিনটি বিষয়ের সমন্বয় ব্যতিরেকে টেকসই উন্নয়ন সম্ভব নয় বলে মন্তব্য করেছেন পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন এবং পানি সম্পদ মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান। তিনি বলেন, ‘উন্নয়নের নামে পরিবেশ ধ্বংস করা গ্রহণযোগ্য নয়।’
সোমবার (৫ মে) রাজধানীর প্যান প্যাসিফিক সোনারগাঁও হোটেলে কৃষি উৎপাদন ও প্রাণ-প্রকৃতি সম্মেলনের দ্বিতীয় অধিবেশনে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।
উপদেষ্টা বলেন, খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হলে পরিবেশ সংরক্ষণ এবং কৃষকের স্বার্থ রক্ষা করতে হবে। ‘উন্নয়ন করলে পরিবেশের ক্ষতি হবেই’—এমন মানসিকতা বদলাতে হবে।
তিনি আরও বলেন, শিল্প দূষণ বন্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নিতে গেলে বলা হয়, হাজার হাজার শ্রমিকের কর্মসংস্থান হুমকিতে পড়বে। কিন্তু নদীর উপর নির্ভরশীল লাখ লাখ মানুষের জীবিকা ও সুপেয় পানির নিরাপত্তার বিষয়টি উপেক্ষিত থেকে যায়।
উপদেষ্টা বলেন, কৃষিজমির মাটি কেটে ইটভাটায় সরবরাহ করা হচ্ছে, যা কার্যত দস্যুতা। কৃষিজমি সুরক্ষা আইনের পাস করতে কাজ করছে সরকার। না হলে বাংলাদেশে কৃষিজমি থাকবেই না।
আরো পড়ুন: মাগুরায় নিম্নমানের সরকারি পাটবীজ বিতরণ, অনাগ্রহ কৃষকদের
জৈব কৃষির প্রয়োজনীয়তার ওপর জোর দিয়ে তিনি বলেন, অতিরিক্ত সার ও কীটনাশক ব্যবহারে মাটি দূষিত হচ্ছে। আমাদের এখনই জৈব সার উৎপাদন ও বিতরণে উদ্যোগ নিতে হবে। বহুজাতিক কোম্পানির চাপ উপেক্ষা করে আমাদের নিজস্ব কৃষি মডেল গড়ে তুলতে হবে।
পরিবেশ উপদেষ্টা বলেন, আমরা একদিকে বিদ্যুৎ সংকট নিয়ে অভিযোগ করি, অন্যদিকে অহেতুক এসি-লাইট ব্যবহার করি। কনজাম্পশন প্যাটার্ন এবং পরিবেশ—এই দুইকে একসঙ্গে বিবেচনায় আনতে হবে। টেকসই ভবিষ্যতের জন্য নীতি, আইন ও আচরণে দ্রুত পরিবর্তন আনতে হবে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
সম্মেলনে অন্যান্যদের মধ্যে বক্তব্য দেন অর্থনীতিবিদ ও জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক অধ্যাপক আনু মুহাম্মদ, মাল্টিমোড গ্রুপের চেয়ারম্যান আবদুল আউয়াল মিন্টু, আইইউবিএটির উপাচার্য অধ্যাপক ড. আব্দুর রব, ইস্ট কোস্ট গ্রুপের চেয়ারম্যান আজম জে চৌধুরী, গাজীপুর কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. তোফাজ্জল ইসলাম এবং বাংলাদেশ পরিবেশ বাঁচাও আন্দোলনের সহসভাপতি খুশি কবীর প্রমুখ।
সম্মেলনে কৃষি বিশেষজ্ঞ, গবেষক, পরিবেশবিদ ও বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি সংস্থার প্রতিনিধিরা অংশ নেন।
২৪৬ দিন আগে
কৃষি সুরক্ষা পদ্ধতির উন্নয়নে বাকৃবি-মারডক বিশ্ববিদ্যালয়ের যৌথ গবেষণা
কৃষি সুরক্ষা পদ্ধতির দীর্ঘমেয়াদী প্রভাব নিয়ে যৌথভাবে গবেষণা চালাচ্ছে বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় (বাকৃবি) ও অস্ট্রেলিয়ার মারডক বিশ্ববিদ্যালয়। গবেষণায় বাংলাদেশের মাটি ও পানি সম্পদের ওপর সংরক্ষণমূলক কৃষির প্রভাব, সীমাবদ্ধতা ও সম্ভাব্য ঝুঁকি বিশ্লেষণ করা হবে।
গবেষণা দলের প্রধান বাকৃবির মৃত্তিকা বিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. মো. মফিজুর রহমান জাহাঙ্গীর ইউএনবিকে বলেন, ‘মাটি ও পানি সম্পদের ওপর কৃষি সুরক্ষা পদ্ধতির দীর্ঘমেয়াদী প্রভাব এবং এই পদ্ধতির সম্প্রসারণের উপযুক্ত কৌশল নির্ধারণ করাই আমাদের মূল লক্ষ্য।’
কৃষি সুরক্ষা পদ্ধতি সম্পর্কে তিনি জানান, সংরক্ষণমূলক কৃষি বা কৃষি সুরক্ষা পদ্ধতি টেকসই চাষাবাদের একটি আধুনিক পদ্ধতি যা মাটির স্বাস্থ্য সংরক্ষণ, উৎপাদন বৃদ্ধি ও পরিবেশ রক্ষায় সহায়ক। এতে তিনটি মূলনীতি অনুসরণ করা হয়— ন্যূনতম চাষ, ফসলের আচ্ছাদন বজায় রাখা ও ফসলের বৈচিত্র্য নিশ্চিত করা।
গবেষণায় মারডক বিশ্ববিদ্যালয়ের ড. রিচার্ড ডব্লিউ বেল ও ড. ডাভিনা বয়েড প্রজেক্ট লিডার হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। কৃষি অর্থনীতি বিষয়ের প্রধান গবেষক হিসেবে কাজ করছেন বাকৃবির কৃষি অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক ড. হাসনীন জাহান।
ড. রিচার্ড ডব্লিউ বেল বলেন, ‘বাংলাদেশের মাটি অত্যন্ত উর্বর হলেও এর উর্বরতা দ্রুত কমছে। ২০১২ সাল থেকে মারডক বিশ্ববিদ্যালয় এ দেশের কৃষি গবেষণা প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে যৌথভাবে কাজ করছে। বর্তমানে আমরা কৃষি সুরক্ষা পদ্ধতি গ্রহণে সহায়তা এবং মাটি ও পানির গুণগত পরিবর্তন পর্যবেক্ষণ করছি।’
আরও পড়ুন: বৃত্তি পেল বাকৃবির ভেটেরিনারি অনুষদের ৩৬ শিক্ষার্থী
গবেষণা প্রকল্পের আওতায় ৮টি পিএইচডি ও ৪টি মাস্টার্স ফেলোশিপের ব্যবস্থা রাখা হয়েছে, যেখানে বাংলাদেশ ও অস্ট্রেলিয়ার শিক্ষার্থীরা গবেষণার সুযোগ পাবে বলে জানিয়েছেন অধ্যাপক জাহাঙ্গীর।
এটি দেশের বিজ্ঞানীদের দক্ষতা, শিক্ষা ও গবেষণায় ব্যাপকভাবে সাহায্য করবে বলে মন্তব্য করেছেন অধ্যাপক জাহাঙ্গীর।
‘বাংলাদেশে সংরক্ষণমূলক কৃষি গ্রহণে সহায়তা এবং মাটি ও পানির গতিশীলতার পরিবর্তন (সাকা)’ শীর্ষক চার বছর মেয়াদি প্রকল্পটি ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বরে শুরু হয়েছে। এটি অস্ট্রেলিয়ান সেন্টার ফর ইন্টারন্যাশনাল এগ্রিকালচারাল রিসার্চ (এসিআইএআর) ও কৃষি গবেষণা ফাউন্ডেশনের (কেজিএফ) অর্থায়নে পরিচালিত হচ্ছে।
এই প্রকল্পে আরও অংশ নিয়েছে— বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা কাউন্সিল (বিএআরসি), বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট (বারি), বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট (ব্রি), সংরক্ষণমূলক কৃষি সেবা প্রদানকারী সংস্থা (ক্যাসপা) ও পিআইও কনসাল্টিং লিমিটেড।
গবেষকরা আশা করছেন, এই প্রকল্পের মাধ্যমে বাংলাদেশের কৃষি ব্যবস্থায় টেকসই পরিবর্তন আসার পাশাপাশি কৃষকদের উৎপাদনশীলতা ও আয় বাড়বে।
৩৩৬ দিন আগে
দেশের কৃষিতে নতুন সম্ভাবনা ‘রঙিন চাল’, কমাবে ডায়াবেটিস ও স্থূলতা
দেশের কৃষিতে নতুন সম্ভাবনার আলো নিয়ে এসেছে রঙিন চাল। এই চালের ব্রানে প্রোটিন ও আঁশের পরিমাণ সাদা চালের চেয়ে বেশি হওয়ায় ডায়াবেটিস ও স্থূলতা কমাতে সাহায্য করে।
বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের (বাকৃবি) ফসল ও উদ্ভিদবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. ছোলায়মান আলী ফকির ও তার গবেষকদল বিশেষ এই চাল নিয়ে গবেষণা করে এর পুষ্টিগুণ, স্বাস্থ্য উপকারিতা, চাষাবাদ, ফলন ও এর ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা নিয়ে বিস্তারিত তথ্য ইউএনবির কাছে তুলে ধরেন।
শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের অর্থায়নে পরিচালিত ওই গবেষণা দলে আরও যুক্ত ছিলেন কো-পিআই অধ্যাপক ড. মো. আলমগীর হোসেন এবং স্নাতকোত্তরের শিক্ষার্থী জান্নাতুল ফেরদৌস ও সাগরিকা খাতুন।
রঙিন চালের পুষ্টিগুণের কারণেই এটি স্বাস্থ্যকর খাবার হিসেবে বর্তমানে জনপ্রিয় হচ্ছে উল্লেখ করে অধ্যাপক ড. ছোলায়মান আলী ফকির বলেন, বর্তমানে পাহাড়ি এলাকায় ও প্রগতিশীল কৃষকরা রঙিন চালের চাষ করছেন। সাধারণ সাদা চালের তুলনায় এই চাল অধিক প্রোটিন, ভিটামিন, খনিজ পদার্থ, অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট ও আঁশ-সমৃদ্ধ। রঙিন চালের ধানের রং সোনালি, লাল, কালো কিংবা বেগুনি বর্ণের হতে পারে, তবে চালের রং লাল, বেগুনি, বাদামি বা কালো রঙের হয়।
তিনি জানান, খোসা ছাড়ানোর পর এই চালের দানা বাইরে থেকে কালো বা লাল রঙের বহিরাবরণ দিয়ে আবৃত থাকে যাকে ব্রান বলা হয় এবং ব্রানের ভেতরে দানা ও ভ্রুণ থাকে। দানা প্রধানত স্টার্চ ও জার্ম প্রোটিন, আঁশ, ফাইটোক্যামিকেলস ও এন্থোসায়ানিন নামক লাল পদার্থ দ্বারা গঠিত। ব্রানের লাল রং সাধারণত এন্থোসায়ানিনের উপস্থিতির কারণে হয়ে থাকে। এন্থোসায়ানিনসহ অন্যান্য ফাইটোক্যামিকেলসের প্রচুর স্বাস্থ্য গুণাগুণ বিদ্যমান। গবেষণায় জানা গেছে, এন্থোসায়ানিন ডায়াবেটিস, রক্তচাপ, কোলেস্টেরল ও হৃদরোগ প্রশমিত করে।
আরও পড়ুন: গবাদিপশুর ম্যাসটাইটিস ভ্যাক্সিন আবিষ্কার করলেন বাকৃবির অধ্যাপক
রঙিন চালের পুষ্টি ও ঔষধি গুণ সম্পর্কে এই অধ্যাপক জানান, বাংলাদেশসহ দক্ষিণ এশিয়দের খাবারে প্রোটিন, ভিটামিন, আঁশ, খনিজ পদার্থ ইত্যাদির প্রায়শই ঘাটতি থাকে। সাদা চালের চেয়ে কালো চালের ব্রানে দুই থেকে তিনগুণ খনিজ পদার্থ, বিশেষ করে আয়রন ও জিঙ্ক বিদ্যমান। অধিকন্তু আমাদের দেশে অটোরাইসমিল থেকে প্রাপ্ত ব্রান/ভূষি পশুখাদ্য হিসেবে ব্যবহৃত হয়ে থাকে। প্রকৃতপক্ষে এই ভূষিতে মূল্যবান পুষ্টিগুলো চলে যায়। রঙিন চালের ব্রানে প্রোটিন ও আঁশের পরিমাণ সাদা চালের চেয়ে বেশি। এই আঁশ ডায়াবেটিস ও স্থূলতা কমাতে সাহায্য করে।
তার দেওয়া তথ্য অনুসারে, রঙিন চালের ব্রানে প্রোটিন, ফ্লাভোনয়েড, ফেনল ও ভিটামিন রয়েছে যা স্বাস্থ্যগত দিক থেকে খুবই উপকারী। রঙিন চালে বিদ্যমান এন্থোসায়ানিন একটি শক্তিশালী এন্টি-অক্সিডেন্ট যা দেহের ক্ষতিকারক রেডিক্যালসকে বিশোধন করে।
তাছাড়া এই চাল দিয়ে ভাত, বিরিয়ানি, খিচুড়ি, চিড়া, মুড়ি ছাড়াও বিভিন্ন ধরনের পিঠা ও কেক প্রস্তুত করা যায়। তাই সহজেই এটি দেশের মানুষের কাছে জনপ্রিয় হয়ে উঠবে বলে আশা প্রকাশ করেন অধ্যাপক ছোলায়মান আলী ফকির।
৩৪৬ দিন আগে