পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ ইসলাম বলেছেন, আসন্ন জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের (ইউএনজিএ) অধিবেশন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বে বাংলাদেশকে বিশ্বমঞ্চে জাতীয় স্বার্থ, অর্থনৈতিক সম্ভাবনা ও উন্নয়ন অগ্রাধিকার তুলে ধরার বড় সুযোগ দেবে।
শনিবার (৫ সেপ্টেম্বর) বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর নন-রেসিডেন্ট বাংলাদেশি (সেন্টার ফর এনআরবি) আয়োজিত ‘আপকামিং ইউএনজিএ অ্যান্ড ব্র্যান্ডিং অব বাংলাদেশ’ শীর্ষক আলোচনা অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এ কথা বলেন।
প্রতিমন্ত্রী আরও বলেন, ‘এটি (ইউএনজিএ) একটি নতুন যাত্রা, নতুন সম্ভাবনা ও নতুন আকাঙ্ক্ষার সূচনা।’
সরকার গঠনের পর প্রথমবারের মতো ইউএনজিএতে অংশ নেওয়ার কথা রয়েছে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের। ‘বাংলাদেশ ফার্স্ট’ পররাষ্ট্রনীতি অনুসরণ করে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কাছে প্রধানমন্ত্রী বাংলাদেশকে একটি গণতান্ত্রিক, আত্মবিশ্বাসী, দায়িত্বশীল ও সম্ভাবনাময় দেশ হিসেবে তুলে ধরবেন।
জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনের উচ্চপর্যায়ের পর্ব ২১ সেপ্টেম্বর নিউইয়র্কে শুরু হওয়ার কথা রয়েছে।
শামা ওবায়েদ বলেন, বন্যা, দুর্যোগ কিংবা অনিবন্ধিত অভিবাসীদের ফেরত পাঠানোর মতো বিষয় দিয়ে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশের পরিচয় আর তুলে ধরা উচিত নয়।
তিনি আরও বলেন, ‘পর্যটন, ব্যবসা ও বিনিয়োগে বাংলাদেশের সুযোগ রয়েছে এবং বিশ্ব মানচিত্রে দেশকে যথাযথভাবে তুলে ধরার সম্ভাবনাও রয়েছে। আমরা সঠিকভাবে বাংলাদেশকে ব্র্যান্ডিং করার চেষ্টা করছি। সরকার একা সবকিছু করতে পারে না; আমাদের সবাইকে একসঙ্গে কাজ করতে হবে।’
তার মতে, অধিবেশনটির গুরুত্ব আরও বেড়েছে, কারণ পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমান সাধারণ পরিষদের সভাপতির দায়িত্ব পালন করবেন।
পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী বলেন, এটি অবশ্যই বাংলাদেশের জন্য গর্বের বিষয়। এই পদ পাওয়ার জন্য সাইপ্রাস এক দশকেরও বেশি সময় ধরে কাজ করলেও বাংলাদেশ নির্বাচনে সফল হয়েছে।
পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর এখন নিউইয়র্কে রয়েছেন এবং শিগগিরই জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনের সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করবেন। জাতিসংঘের জন্য গুরুত্বপূর্ণ একটি সময়ে তিনি দায়িত্ব পালন করবেন। এ সময়ের মধ্যে জাতিসংঘের নতুন মহাসচিব নির্বাচনের বিষয়টিও রয়েছে।
সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশন আনুষ্ঠানিকভাবে ৮ সেপ্টেম্বর শুরু হবে। পরে মাসের শেষ দিকে বার্ষিক উচ্চপর্যায়ের সাধারণ বিতর্কে অংশ নিতে বিশ্বনেতারা নিউইয়র্কে জাতিসংঘ সদর দপ্তরে সমবেত হবেন বলে আশা করা হচ্ছে।
প্রতিমন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশের কূটনৈতিক প্রচেষ্টার পাশাপাশি দেশের স্থিতিশীলতা ও গণতান্ত্রিক সরকার এই বিজয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে, যার মধ্যে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় প নিউইয়র্কে বাংলাদেশ মিশনের নেওয়া উদ্যোগও রয়েছে।
তিনি আরও বলেন, ‘তাই এসব বিষয় বিবেচনায় নিয়ে এবারের আসন্ন অধিবেশনটি আমাদের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হবে।’
রোহিঙ্গা সংকট নিয়ে বিশেষ অধিবেশনে অংশ নেবেন প্রধানমন্ত্রী
রোহিঙ্গা সংকট প্রসঙ্গে শামা ওবায়েদ জানান, জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের অধিবেশনের সময় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের অংশগ্রহণে এ বিষয়ে একটি বিশেষ অধিবেশন অনুষ্ঠিত হবে।
তিনি আরও বলেন, মিয়ানমারের কর্তৃপক্ষ, আরাকান আর্মি, আঞ্চলিক বিভিন্ন পক্ষ ও পরস্পরবিরোধী আন্তর্জাতিক স্বার্থের সম্পৃক্ততার কারণে সংকটটি ক্রমেই জটিল হয়ে উঠেছে।
পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী বলেন, ‘আসলে সমস্যাটি আরও গভীর হয়েছে। একটি আঞ্চলিক জটিলতা তৈরি হয়েছে। আন্তর্জাতিক চাপ ছাড়া এই সমস্যার সমাধান করা খুব কঠিন হয়ে যাবে।’
টেকসই সমাধানের জন্য আন্তর্জাতিক সমর্থন জোরদারে বিদেশে থাকা বাংলাদেশি ও নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিদের সহায়তা চান তিনি।
রোহিঙ্গা সংকট বাংলাদেশের জন্য বড় সমস্যা উল্লেখ করে প্রতিমন্ত্রী বলেন, ‘কিন্তু এটি বাংলাদেশের সমস্যা নয়। সমস্যাটি বাংলাদেশ তৈরি করেনি।’
জাতিসংঘে বাংলাদেশের ভাবমূর্তির কথাও তুলে ধরেন প্রতিমন্ত্রী, বিশেষ করে জাতিসংঘের শান্তিরক্ষা কার্যক্রমে বাংলাদেশের অবদানের বিষয়টি।
এছাড়া সরকারের অর্থনৈতিক অগ্রাধিকার প্রসঙ্গে শামা ওবায়েদ বলেন, অর্থনৈতিক কূটনীতি সরকারের নির্বাচনী ইশতেহারের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। সরকার যে ‘ভেঙে পড়া অর্থনীতি’ ও ‘ভেঙে পড়া ব্যাংকিং খাত’ উত্তরাধিকারসূত্রে পেয়েছে, তা পুনরুদ্ধার করে শক্ত ভিত্তির ওপর দাঁড় করাতে সময় লাগবে।
তিনি আরও বলেন, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান শুরু থেকেই ব্যাংকিং খাতে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি বাড়ানো এবং বিদেশি বিনিয়োগকারী ও অনাবাসী বাংলাদেশিদের (এনআরবি) জন্য আরও বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ তৈরিতে কাজ করছেন।
প্রতিমন্ত্রী বলেন, আমরা এমন একটি পরিবেশ তৈরি করতে চাই, যেখানে আমাদের বাংলাদেশিরা বিনিয়োগ করতে দেশে ফিরে আসবেন এবং বিদেশিরাও এখানে বিনিয়োগ করবেন।
তিনি আরও বলেন, বিভিন্ন সেবার জন্য বিনিয়োগকারীদের যেন একাধিক সরকারি দপ্তরে যেতে না হয়, সে জন্য ডিজিটাল সেবা ও ওয়ান-স্টপ ব্যবস্থার মাধ্যমে বিনিয়োগ প্রক্রিয়া সহজ করার কাজও করছে সরকার।
ব্যবসা পরিচালনা সহজ করতে নিবন্ধন, কোম্পানির নাম নিবন্ধনসহ অন্যান্য প্রক্রিয়ায় অনলাইন সুবিধা সম্প্রসারণ করা হচ্ছে বলেও জানান শামা।
তিনি ‘ওয়ান সিটিজেন, ওয়ান কার্ড’ উদ্যোগের কথাও তুলে ধরেন, যার আওতায় বিভিন্ন সরকারি সংস্থার কাছে থাকা তথ্য একটি একক ডেটাবেজে একত্রিত করে প্রত্যেক নাগরিকের একটি কার্ডের সঙ্গে যুক্ত করা হবে।
পাশাপাশি বাংলাদেশি অভিবাসী কর্মীদের সুরক্ষা ও অবৈধ অভিবাসন বন্ধের ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেন প্রতিমন্ত্রী। তিনি বলেন, সরকার প্রবাসী বাংলাদেশি ও রেমিটেন্স উপার্জনকারীদের অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে দেখে। তবে দালালচক্রের মাধ্যমে অবৈধ অভিবাসন এখনও গুরুতর উদ্বেগের বিষয়। ইতালি ও স্পেনের মতো দেশে চাকরির মিথ্যা প্রতিশ্রুতি দিয়ে ভূমধ্যসাগরসহ বিপজ্জনক পথে যাওয়ার সময় বাংলাদেশি অভিবাসীরা দালালচক্রের শিকার হচ্ছেন বলে জানান প্রতিমন্ত্রী।
তিনি বলেন, ‘আমরা এই সমস্যা সমাধানে কাজ করছি এবং বর্তমান প্রধানমন্ত্রী সরাসরি পদক্ষেপ নিয়েছেন।’
তিনি আরও বলেন, অবৈধ অভিবাসন মোকাবিলায় পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থা (আইওএম) এবং প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করছে।
প্রথমবারের মতো পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় অবৈধ অভিবাসন ও প্রবাসী বাংলাদেশিদের বিভিন্ন সমস্যা মোকাবিলায় একটি পৃথক মাইগ্রেশন উইং প্রতিষ্ঠা করেছে বলেও জানান তিনি।
তিনি বলেন, আরও কার্যকর কারিগরি প্রশিক্ষণ ও দক্ষতা উন্নয়নের মাধ্যমে দক্ষ কর্মী বিদেশে পাঠানোর ওপরও সরকার গুরুত্ব দিচ্ছে, যার লক্ষ্য নারী-পুরুষ উভয়ের জন্য মর্যাদাপূর্ণ ও বৈধ কর্মসংস্থান নিশ্চিত করা।
অবৈধ অভিবাসন ও দালালচক্রের ঝুঁকি সম্পর্কে সম্ভাব্য অভিবাসীদের সচেতন করতে অনাবাসী বাংলাদেশি সম্প্রদায়ের সহায়তা চান শামা ওবায়েদ।
প্রতিমন্ত্রী বলেন, সরকারি সংস্থাগুলো তৃণমূল পর্যায়ে কাজ শুরু করেছে। অবৈধ অভিবাসন বেশি হয়—এমন জেলাগুলো চিহ্নিত করে সমস্যা মোকাবিলায় স্থানীয় প্রশাসনের সঙ্গে সমন্বয় করা হচ্ছে।
সরকার ভিসা অন অ্যারাইভাল-সংক্রান্ত বিধানসহ ভিসা প্রক্রিয়া সহজ করার কাজ করছে এবং সংশোধিত নীতিটি সংসদে উপস্থাপনের কথা রয়েছে বলেও জানান তিনি।
তিনি বলেন, প্রধানমন্ত্রী যা কিছু করছেন, তার সবকিছুর লক্ষ্য বাংলাদেশকে আরও বিনিয়োগবান্ধব করে তোলা।
সাম্প্রতিক বৈশ্বিক সংঘাত ও নানা ধরনের বাধার পরিপ্রেক্ষিতে অর্থনীতিতে বহুমুখীকরণ, বিশেষ করে জ্বালানি খাতের গুরুত্বের ওপরও জোর দেন প্রতিমন্ত্রী। তিনি ‘ব্লু ইকোনমি’ বা নীল অর্থনীতির ওপর সরকারের গুরুত্বারোপের কথা তুলে ধরে বলেন, এ খাত নিয়ে কাজ করার জন্য পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের একটি পৃথক মেরিটাইম উইং রয়েছে।
এ বছরের বাজেটে নতুন খাত হিসেবে ‘ক্রিয়েটিভ ইকোনমি’ বা সৃজনশীল অর্থনীতি যুক্ত করার বিষয়টিও তুলে ধরেন শামা ওবায়েদ। তিনি বলেন, এই খাত নারী উদ্যোক্তাদের জন্য বিশেষ সুযোগ তৈরি করবে এবং বাংলাদেশের শিল্পকলা, কুটিরশিল্প, হস্তশিল্প ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যকে মূলধারার অর্থনীতিতে নিয়ে আসার পাশাপাশি আন্তর্জাতিকভাবে এগুলোকে তুলে ধরতে সহায়তা করবে।
সেন্টার ফর এনআরবির চেয়ারম্যান এম এস শেকিল চৌধুরী জানান, আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কাছে বাংলাদেশের ইতিবাচক অগ্রগতি তুলে ধরতে সংগঠনটি তাদের বার্ষিক ‘ওয়ার্ল্ড কনফারেন্স সিরিজ’-এর অংশ হিসেবে এই অনুষ্ঠানের আয়োজন করেছে। তিনি বলেন, এই সিরিজের লক্ষ্য বাংলাদেশের সঙ্গে বৈশ্বিক সম্পৃক্ততা আরও গভীর করা এবং প্রবাসী বাংলাদেশিদের দেশে বিনিয়োগে উৎসাহিত করা ও বৈধ চ্যানেলে তাদের আয় দেশে পাঠাতে উৎসাহ দেওয়া।