মোকামতলা উপজেলা গঠনের প্রসঙ্গ তুলে স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম বলেছেন, আমার ইচ্ছা ছিল যে, এটা আমার সময় যদি হয়, তাহলে ইতিহাসের পাতায় আমার নামটি লেখা থাকবে যে আমার সময় শিবগঞ্জ ভেঙে নতুন একটি উপজেলা হয়েছে। এই ইতিহাসের সাক্ষী হবার কারণেই নতুন উপজেলা করা।
বৃহস্পতিবার (৯ জুলাই) সচিবালয়ের গণমাধ্যম কেন্দ্রে বাংলাদেশ সেক্রেটারিয়েট রিপোর্টার্স ফোরামের (বিএসআরএফ) আয়োজিত ‘বিএসআরএফ সংলাপ’-এ তিনি এসব কথা বলেন।
এ সময় নিজের সম্পদ, পারিবারিক প্রতিষ্ঠান, ছেলের বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড (বিসিবি) থেকে পদত্যাগ, স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের কার্যক্রম এবং স্থানীয় সরকার নির্বাচন নিয়েও তিনি কথা বলেন।
প্রতিমন্ত্রী বলেন, ‘শিবগঞ্জ উপজেলার মানুষের দীর্ঘদিনের দাবি ছিল যে, মোকামতলায় একটি আলাদা উপজেলা করার। আমি এমপি এবং মন্ত্রীর দায়িত্ব নেওয়ার এক মাসের মাথায় মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর বরাবরে ডিও দিয়ে দুই মাসের মাথায় বাংলাদেশের প্রথম যে পাঁচটি উপজেলা হয়—মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর মাননীয় মহাসচিবের ওখানে দুটি, কক্সবাজারে একটি, লক্ষ্মীপুরে একটি এবং আমার নির্বাচনে একটি নতুন উপজেলা হয়—মোকামতলা উপজেলা। এই উপজেলাতে আজ হোক, কাল হোক, কেউ না কেউ করতই। আমার ইচ্ছা ছিল যে, এটা আমার সময় যদি হয়, তাহলে ইতিহাসের পাতায় আমার নামটি লেখা থাকবে যে আমার সময় শিবগঞ্জ ভেঙে নতুন একটি উপজেলা হয়েছে। এই ইতিহাসের সাক্ষী হবার কারণেই নতুন উপজেলা করা।’
তিনি বলেন, ‘আমার উপজেলায় নতুন কিছু ইউনিয়ন ছিল, যেগুলো অনেক বড় বড় ইউনিয়ন। যে ইউনিয়নগুলোকে বিভক্ত করার প্রয়োজন ছিল, সেই ইউনিয়নগুলোকে আমরা বিভক্ত করেছি। আমি নতুন চারটি ইউনিয়ন তৈরি করেছি। ইউনিয়নের নামকরণ নিয়ে হয়তো অনেক প্রশ্ন ছিল, অনেক আলোচনা-সমালোচনা হয়েছে। পরে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে কথা বলে, তার অনুশাসন অনুযায়ী তিনটি ইউনিয়নের নাম পরিবর্তন করে নতুন করে আবার ওই এলাকার জনগণ যেভাবে চাইছে, সেভাবে নামকরণের ব্যবস্থা হয়েছে।’
বগুড়া দীর্ঘদিন উন্নয়নবঞ্চিত ছিল দাবি করে তিনি বলেন, জেলার উন্নয়ন ঘাটতি পূরণে তিনি মন্ত্রী হিসেবে বিভিন্ন জায়গায় চেষ্টা করেছেন।
ব্যক্তিগতভাবে টার্গেট না করার আহ্বান
শুরুতেই ব্যক্তিগতভাবে টার্গেট করা হলে রাষ্ট্রীয় কাজে নিজের মেধার বিকাশ ঘটানো সম্ভব হবে না বলে মন্তব্য করেছেন প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম।
নিজেকে লক্ষ্যবস্তু করা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, আমি তৃণমূল থেকে উঠে এসেছি। কিন্তু আমরা কাজ তো শুরু করেছি। আমাদের কাজ করবার যোগ্যতা আছে কি না, এটা তো কিছুদিন আপনাদের দেখতে হবে। শুরুতেই যদি আমাকে ধাক্কা মারা হয়, শুরুতেই যদি আমাকে টার্গেট করা হয়, তাহলে তো যেটুকু মেধা মহান আল্লাহ আমাকে দিয়েছেন, আপনাদের চেয়ে কম অথবা বেশি বা সমান, এইটুকু মেধার বিকাশ তো আমি রাষ্ট্রীয় কাজে বা আমার মন্ত্রণালয়ে দেখাতে পারব না। এইটুকু সুযোগ তো আমাকে করে দিতে হবে কাজ করার।
নিজের অর্থে প্রতিষ্ঠানের দাবি
এলাকায় নিজের নামে প্রতিষ্ঠিত বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের বিষয়ে মীর শাহে আলম বলেন, উন্নয়নের ব্যাপারে আমার একটা পাগলামো রয়েছে। আমি এলাকার উন্নয়নের ব্যাপারে অনেক চেষ্টা করি, কাজ করি দীর্ঘদিন যাবত। আপনারা জানেন যে, এবার অনেক আলোচনা-সমালোচনা হয়েছে। আমি প্রথম চেয়ারম্যান হওয়ার পরে আমার গ্রামে কিন্তু প্রাইমারি স্কুল করি আমার নামে, ১৯৯৭ সাল, যেটি এখন সরকারি।
তিনি বলেন, ২০০৩ সালে কারিগরি শিক্ষাকে মাথায় রেখে আমি ‘মীর শাহ আলম কারিগরি স্কুল অ্যান্ড কলেজ’ প্রতিষ্ঠা করি। এরপরে আমার নামে ওখানে কৃষি এবং মৎস্য কলেজ রয়েছে, আমার নামে মাদরাসা রয়েছে, ভেটেরিনারি স্কুল রয়েছে। এরপরে মোকামতলা নতুন উপজেলায় আমার নামে নতুন একটি কলেজ রয়েছে, শিবগঞ্জে আরেকটি কলেজ রয়েছে। এই প্রতিষ্ঠানগুলো আমি ১৯৯৭ থেকে ২০২৩ সাল পর্যন্ত নিজের সম্পত্তি, পৈতৃক সম্পত্তি দিয়ে, কোথাও সম্পত্তি কিনে, নিজের অর্থ দিয়ে ঘরবাড়ি তৈরি করে দিয়ে আস্তে আস্তে এই প্রতিষ্ঠানগুলো আমি দাঁড় করিয়েছি। এর মধ্যে অধিকাংশ প্রতিষ্ঠানই আমি বিএনপি করার কারণে এমপিওভুক্ত হয়নি। নতুন করে সরকার আসার পরে আবেদন করেছি, চেষ্টা করছি প্রতিষ্ঠানগুলো যাতে এমপিওভুক্ত হয়। কারণ, দীর্ঘদিন এ সমস্ত প্রতিষ্ঠানের শিক্ষকরা বেতন পাননি; কারণ হচ্ছে আমি।
‘জাতীয় রাজনীতিতে আমার ভূমিকা ছিল’
প্রতিমন্ত্রী বলেন, ‘এটা ঠিক যে জাতীয় রাজনীতিতে আমার কোনো পদ-পদবি ছিল না। কিন্তু জাতীয় রাজনীতিতে আমি অনেক কাজ করেছি। আমার কাজ করার সৌভাগ্য হয়েছে।’
তিনি বলেন, ‘আমার মন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম স্যারের সঙ্গে আমি কাজ করেছি, রিজভী আহমেদের সঙ্গে আমি বহুবার কাজ করেছি এবং জাতীয় রাজনীতিতে প্রকাশ্যে হোক, অপ্রকাশ্যে হোক, আমার বহু ভূমিকা ছিল। যেহেতু আমি ঢাকা শহরেই বসবাস করতাম, ঢাকা শহরই পরিবারসহ আমার বসবাস।’
‘সমালোচনা পরিবার নিতে পারে না’
মীর শাহে আলম বলেন, ‘কয়েকদিন আগে একটা পত্রিকায় দেখলাম, আমি ওই প্রসঙ্গে যেতে চাই না, একটা খুব গুরুত্বপূর্ণ ইস্যুতে হাইড করে কিছু নিউজ করা হয়। এগুলো আসলে হয় কি, আমরা হেয় প্রতিপন্ন মাঝে মাঝে হলে খুব একটা খারাপ লাগে না। কারণ রাজনীতি করি তো; সবাই আমাদের খুশি করবে তা না, কখনও গালি দেবে, কখনও ভালো বলবে। কিন্তু আমাদের সম্বন্ধে নেগেটিভ কিছু গেলে এটা পরিবার নিতে পারে না, আত্মীয়-স্বজনের কাছে এটা খারাপ লাগে।’
তিনি বলেন, ‘আজকে আমাদের সন্তানরা কিছু করলে এটা বিভিন্নভাবে সমালোচিত হয়। যে আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী সাহেবের ছেলে কেন ক্রিকেট বোর্ডে, সালাউদ্দিন সাহেবের ছেলে কেন ক্রিকেট বোর্ডে, বা মির্জা ফখরুল ইসলাম সাহেবের ভাই কেন ক্রিকেট বোর্ডে। আমার নিজেরও সন্তান ক্রিকেট বোর্ডে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হয়ে এসেছিল। যখন সমালোচনা শুরু হয়েছে, আমার সন্তান আমার ওপর খুবই মন খারাপ করেছে। আমি তাকে ডেকে বুঝিয়ে বলেছি, বাবা, এটা নিয়ে নানা কথা হবে, তোমার ব্যবসা-বাণিজ্য এখন অনেক দেখতে হবে, তুমি দয়া করে পদত্যাগ কর।’
তিনি বলেন, ‘যেদিন বোর্ড নির্বাচিত হয়েছে, ফার্স্ট বোর্ড মিটিং করেছে, পরের দিনই আমার কথামতো গিয়ে আমার ছেলে ক্রিকেট বোর্ড থেকে পদত্যাগ করেছে। এই নিউজটা আপনারা কেউ হাইলাইট করেন না যে একজন মন্ত্রী তার সন্তানকে ক্রিকেট বোর্ড থেকে সরিয়ে নিয়ে আসছেন।’
তার ভাষায়, ‘আমাদের সন্তানরা বিরোধী দলের থাকার সময় সরকারের রোষানলে পড়বে, আবার ক্ষমতায় আসার পরে সমালোচকদের রোষানলে পড়বে; তাহলে এরা উচ্চ শিক্ষিত হয়ে, উচ্চ শিক্ষা গ্রহণ করে, রাজনৈতিকভাবে, ব্যবসায়িকভাবে মেধার বিকাশটা তাহলে ঘটাবে কোথায়? এরা সমাজে অবদানটা রাখবে কীভাবে? এই বিষয়গুলো মনে হয় আপনাদের নোটিশে আনা দরকার।’
সম্পদ নিয়ে ব্যাখ্যা, তদন্তের আহ্বান
সম্পদের বিষয়ে তিনি বলেন, নির্বাচনি হলফনামায় তার সব সম্পদের তথ্য রয়েছে। ‘তাহলে সমস্ত হলফনামাকে আপনি হাইড করে একটা চিহ্নকে গোল চিহ্ন দিয়ে যদি বলেন যে, আমি প্রতিমন্ত্রী হওয়ার পর আমার সম্পত্তির পরিমাণ আট গুণ বেড়েছে, তখন কিন্তু কষ্ট লাগে।’
তিনি বলেন, ‘আপনি ওখানে সম্পত্তিতে দেখালেন ৩১ শতক, কিন্তু আমার হলফনামাতে তো সম্পত্তি দেওয়া আছে এক হাজার ৮৩৫ শতক। তাহলে কোথায় এক হাজার ৮৩৫ শতক আর আপনি হাইলাইট করলেন ৩১ শতক। হ্যাঁ, আমার উপজেলায় আমি মন্ত্রী হওয়ার পরে সম্পত্তি কেনা হয়েছে, এ তো আমি অস্বীকার করছি না। আমার কোম্পানির নামে সম্পত্তি আমার সন্তান কিনেছে। নতুন ইন্ডাস্ট্রি করার জন্য সম্পত্তি কেনার প্রয়োজন হলে সম্পত্তি কিনবে না? অবশ্যই কিনবে।’
তিনি আরও বলেন, ‘কিন্তু সেটার আয়ের উৎসটা কী, সেটা আপনারা দেখেন, সেটা তদন্ত করুন। ট্যাক্স অফিস আছে, তারা দেখবে যে সেটা বৈধ না অবৈধ। ব্যক্তিগত নামে তো কোনো সম্পত্তি কেনা হয়নি; রূপসী রাইস অ্যান্ড পুষ্টি মিলের নামে, ফাউন্ডেশনের নামে সম্পত্তি কেনা হচ্ছে, কারণ সেখানে আমরা নতুন ইন্ডাস্ট্রি করব, নতুন ব্যবসা করব।’
টাকার উৎস সম্পর্কে তিনি বলেন, ‘আমি যে ৪২ কোটি টাকা দিয়ে একটা অটো রাইস মিল বিক্রি করলাম, নগদ টাকার উৎস তো এখানেই বের হয়ে আসে। আমি অন্য জায়গায় না-ই গেলাম, আমার অন্যান্য ব্যবসাগুলো নাহয় আমি বাদই দিলাম।’
‘মন্ত্রী আমাকে ছাড়া গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেন না’
মন্ত্রণালয়ের কাজের বিষয়ে প্রতিমন্ত্রী বলেন, ‘আমি আমার মন্ত্রণালয়ে কাজ করছি, খুব স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করি। কারণ আমার সৌভাগ্য যে আমার মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী দলের মহাসচিব। উনি দলের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ ব্যক্তি, আমার পরম শ্রদ্ধেয় মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর এবং শ্রদ্ধেয় স্যার কোনো গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত... আমি ওনার বয়সে অনেক ছোট, নবীন হিসাবে উনি আমাকে ছাড়া কোনো সিদ্ধান্ত নেন না। যেকোনো বিষয়ে উনি আমাকে ডাকেন অথবা খবর দেন, আমি গিয়ে উনার কাছে বসলে উনি বলেন যে আমরা এটা এভাবে করতে চাচ্ছি, আমরা এক সমন্বিতভাবেই পরিচালনা করছি।’
তিনি বলেন, ‘আর আমার নিরাপত্তার জায়গা, ফাইল স্বাক্ষরের শেষ জায়গা হচ্ছে মাননীয় মন্ত্রী। আর উনি হচ্ছেন মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। তাহলে আমার নিরাপত্তা, আমার প্রোটেকশনের দেওয়ালটা তো এখানে আছে, আমি তো ফাইনাল অথরিটি না আমার মন্ত্রণালয়ের। আমার পরেও ফাইলটা তার কাছে যায়। যদি ওখানে কোনো অন্যায় থাকে, নেগেটিভ কিছু থাকে আমার স্বাক্ষরের পরে, তাহলে তো মাননীয় মন্ত্রী সেটা ফেরত দিতে পারবেন বা ওটা এলাউ করবেন না।’
স্থানীয় সরকার নির্বাচনের প্রস্তুতি
স্থানীয় সরকারের পাঁচটি স্তরের নির্বাচনের জন্য চলতি বাজেটে অর্থ বরাদ্দ রয়েছে জানিয়ে মীর শাহে আলম বলেন, নির্বাচন কমিশনও প্রাথমিক প্রস্তুতি শুরু করেছে।
তিনি বলেন, ‘সিটি করপোরেশন, উপজেলা, পৌরসভা, জেলা পরিষদ, ইউনিয়ন—এই নির্বাচনগুলো করার জন্য তারাও প্রাথমিক প্রস্তুতি শুরু করেছে। সব মিলিয়ে এই বছরটি সরকারের এই বড় একটি বাজেট বাস্তবায়নে যেমন একটা চ্যালেঞ্জ হবে, আমাদের সামনে নির্বাচনগুলো আসবে। এখানেও নির্বাচন অবাধ, সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ এবং মানুষের কাছে গ্রহণযোগ্য করবার জন্য সরকারের জন্য একটা চ্যালেঞ্জ হয়েছে।’
বিএসআরএফ সভাপতি মাসউদুল হকের সভাপতিত্বে সংলাপটি সঞ্চালনা করেন সংগঠনের সাধারণ সম্পাদক উবায়দুল্লাহ বাদল।