দেশে গত জুলাই মাসে ৪৫৮টি সড়ক দুর্ঘটনায় ৪১৬ জন নিহত এবং ৬২৯ জন আহত হয়েছেন। নিহতদের মধ্যে ৫৭ জন নারী ও ৪৮ জন শিশু। একই সময়ে ১৫৯টি মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় ১৩৮ জন নিহত হয়েছেন, যা মোট নিহতের ৩৩ দশমিক ১৭ শতাংশ। এছাড়া দুর্ঘটনায় ১০৬ জন পথচারী এবং ৫১ জন যানবাহনের চালক ও সহকারী নিহত হয়েছেন।
বৃহস্পতিবার (৬ আগস্ট) রোড সেফটি ফাউন্ডেশনের এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য জানানো হয়েছে। ৯টি জাতীয় দৈনিক, ১৭টি জাতীয় ও আঞ্চলিক অনলাইন নিউজ পোর্টাল, বিভিন্ন ইলেকট্রনিক মিডিয়া এবং নিজস্ব তথ্যের ভিত্তিতে তৈরি জুলাই মাসের সড়ক দুর্ঘটনা প্রতিবেদন প্রকাশ করা হয়েছে বলে বিজ্ঞপ্তিতে জানিয়েছে সাংগঠনটি।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, জুলাই মাসে ১৩টি নৌ-দুর্ঘটনায় ৯ জন নিহত ও ১১ জন আহত হয়েছেন। এছাড়া ২৯টি রেল ট্র্যাক দুর্ঘটনায় ২৪ জন নিহত এবং ১৮ জন আহত হয়েছেন।
যানবাহনভিত্তিক নিহতদের মধ্যে মোটরসাইকেল চালক ও আরোহী ১৩৮ জন (৩৩.১৭ শতাংশ), থ্রি-হুইলারের যাত্রী ৯৪ জন (২২.৫৯ শতাংশ), স্থানীয়ভাবে তৈরি যানবাহনের যাত্রী ২৬ জন (৬.২৫ শতাংশ), বাসের যাত্রী ২১ জন, ট্রাক, কাভার্ডভ্যান, পিকআপ ও ট্রলির আরোহী ১৯ জন, মাইক্রোবাস ও অ্যাম্বুলেন্সের আরোহী ৭ জন এবং রিকশা ও বাইসাইকেল আরোহী ৫ জন নিহত হয়েছেন।
দুর্ঘটনার মধ্যে ১৬৯টি (৩৬.৮৯ শতাংশ) জাতীয় মহাসড়কে, ১৫৫টি (৩৩.৮৪ শতাংশ) আঞ্চলিক সড়কে, ৬১টি (১৩.৩১ শতাংশ) গ্রামীণ সড়কে, ৬৬টি (১৪.৪১ শতাংশ) শহরের সড়কে এবং ৭টি (১.৫২ শতাংশ) অন্যান্য স্থানে ঘটেছে।
দুর্ঘটনার ধরন বিশ্লেষণে দেখা যায়, ১২৩টি মুখোমুখি সংঘর্ষ, ১৬৪টি নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে, ১০৮টি পথচারীকে চাপা বা ধাক্কা দেওয়া, ৫৪টি যানবাহনের পেছনে আঘাত করা এবং ৯টি অন্যান্য কারণে ঘটেছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দুর্ঘটনায় মোট ৭১১টি যানবাহন সম্পৃক্ত ছিল। এর মধ্যে মোটরসাইকেল ১৭২টি, থ্রি-হুইলার ১৩১টি, বাস ১২৪টি, ট্রাক ৯২টি এবং অন্যান্য বিভিন্ন ধরনের যানবাহন রয়েছে।
সময়ভিত্তিক বিশ্লেষণে দেখা যায়, সবচেয়ে বেশি দুর্ঘটনা ঘটেছে সকালে (২৮.৮২ শতাংশ)। এছাড়া রাতে ১৯.৪৩ শতাংশ, দুপুরে ১৭.২৪ শতাংশ, বিকালে ১৪.৮৪ শতাংশ, সন্ধ্যায় ১২.২২ শতাংশ এবং ভোরে ৭.৪২ শতাংশ দুর্ঘটনা ঘটেছে।
বিভাগভিত্তিক পরিসংখ্যানে ঢাকা বিভাগে সবচেয়ে বেশি ১৩৩টি দুর্ঘটনায় ১২৫ জন নিহত হয়েছেন। সবচেয়ে কম দুর্ঘটনা ঘটেছে বরিশাল বিভাগে, যেখানে ২৮টি দুর্ঘটনায় ২৪ জন নিহত হয়েছেন। রাজধানী ঢাকায় ৩৪টি দুর্ঘটনায় ১৮ জন নিহত এবং ৪৭ জন আহত হয়েছেন।
নিহতদের পেশাগত পরিচয়ের মধ্যে পুলিশ সদস্য, বিজিবি সদস্য, শিক্ষক, সাংবাদিক, চিকিৎসক, প্রকৌশলী, আইনজীবী, ব্যাংক ও বীমা কর্মকর্তা-কর্মচারী, এনজিও কর্মী, রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মী, ব্যবসায়ী, বিক্রয় প্রতিনিধি, ইমাম ও খাদেম, পোশাক শ্রমিক, কৃষি শ্রমিকসহ বিভিন্ন পেশার মানুষ রয়েছেন। নিহতদের মধ্যে বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ৫৩ জন শিক্ষার্থীও রয়েছেন।
রোড সেফটি ফাউন্ডেশন সড়ক দুর্ঘটনার প্রধান কারণ হিসেবে ত্রুটিপূর্ণ যানবাহন ও সড়ক, বেপরোয়া গতি, চালকদের অদক্ষতা ও বেপরোয়া মানসিকতা, মহাসড়কে স্বল্পগতির যান চলাচল, তরুণদের বেপরোয়া মোটরসাইকেল চালানো, ট্রাফিক আইন অমান্য, দুর্বল ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা, বিআরটিএর সক্ষমতার ঘাটতি এবং গণপরিবহন খাতে চাঁদাবাজির বিষয়গুলো চিহ্নিত করেছে।
সংস্থাটি সড়ক নিরাপত্তা কাউন্সিল পুনর্গঠন, বিআরটিএ, বিআরটিসি ও ডিটিসিএর কাঠামোগত সংস্কার, মোটরযানে আধুনিক নিরাপত্তা প্রযুক্তির বাধ্যতামূলক ব্যবহার, মেয়াদোত্তীর্ণ যানবাহন প্রত্যাহার, রাজধানীতে আধুনিক বাস সার্ভিস চালু, দক্ষ চালক তৈরির উদ্যোগ বৃদ্ধি, মহাসড়কে সার্ভিস রোড নির্মাণ, সব রেলক্রসিংয়ে গেটকিপার নিয়োগ, সড়ক নিরাপত্তা বিষয়ে সচেতনতা বৃদ্ধিতে বাজেট বরাদ্দ এবং সমন্বিত যোগাযোগ মন্ত্রণালয় গঠনের সুপারিশ করেছে।
রোড সেফটি ফাউন্ডেশন বলেছে, সময়োপযোগী নীতিমালা প্রণয়ন, প্রযুক্তি ও অবকাঠামোর উন্নয়ন এবং সড়ক ব্যবহারকারীদের শিক্ষা ও সচেতনতা বৃদ্ধির মাধ্যমে নিরাপদ সড়ক ব্যবস্থা গড়ে তোলা সম্ভব। তবে এ জন্য সরকারের রাজনৈতিক সদিচ্ছা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।