ইউরোপীয় ইউনিয়নের নির্বাচন পর্যবেক্ষণ মিশনের (ইইউ ইওএম) উপ-প্রধান পর্যবেক্ষক ইনতা লাসে বলেছেন, বাংলাদেশের আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচনে একটি নিরপেক্ষ প্রতিবেদন উপস্থাপনের জন্য নির্বাচনি প্রক্রিয়ার সামগ্রিক চিত্রটি সামষ্টিকভাবে দেখা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তিনি জোর দিয়ে বলেছেন, এটি বাংলাদেশের জন্য একটি ঐতিহাসিক মুহূর্ত।
শনিবার (১৭ জানুয়ারি) রাজধানীর একটি হোটেলে নির্বাচন নিয়ে আয়োজিত একটি অনুষ্ঠানে তিনি এসব কথা বলেন।
ইনতা লাসে বলেন, নির্বাচন হওয়া পর্যন্ত আমাদের পর্যবেক্ষণ করতে দিন। সেইসঙ্গে একটি সামগ্রিক মূল্যায়ন সম্পন্ন হওয়া পর্যন্ত আপনারা অপেক্ষা করুন।
এ সময় তিনি উল্লেখ করেন, আমরা সবাই জানি, বিশ্বের কোথাও শতভাগ নিখুঁত নির্বাচন হয় না।
বন্ধুত্ব ও সহযোগিতার মনোভাব নিয়ে আমাদের মূল্যায়ন ও সুপারিশসহ প্রতিবেদনটি ভবিষ্যতে বাংলাদেশের নির্বাচনি প্রক্রিয়ার উন্নয়নে সাহায্য করবে বলে মন্তব্য করেন তিনি।
এই নির্বাচন পর্যবেক্ষক জানান, আজ (শনিবার) বাংলাদেশে নিযুক্ত ইউরোপীয় ইউনিয়নের নির্বাচনি পর্যবেক্ষণ মিশন দেশের ৬৪টি প্রশাসনিক জেলায় ৫৬ জন দীর্ঘমেয়াদি পর্যবেক্ষক মোতায়েন করেছে। তিনি বলেন, দীর্ঘমেয়াদি পর্যবেক্ষকরা আমাদের মিশনের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অংশ। তাদের পর্যবেক্ষণ এবং অন্তর্দৃষ্টি নির্বাচনি প্রক্রিয়ার নিরপেক্ষ ও তথ্যভিত্তিক মূল্যায়নের মূল ভিত্তি হিসেবে কাজ করবে।
এ সময় পর্যবেক্ষকদের উদ্দেশে লাসে বলেন, আপনারাই মাঠে কাজ করছেন, বাস্তবতা দেখছেন এবং প্রতিটি জেলার পরিস্থিতি কীভাবে বিকশিত হচ্ছে তা ঢাকায় কেন্দ্রীয় পর্যবেক্ষকদের জানাচ্ছেন। আমরা মাঠ পর্যায় থেকে আপনাদের প্রতিবেদন ও মূল্যায়নের অপেক্ষায় আছি।
তিনি আরও বলেন, আমি জানি যে মাঠে পর্যবেক্ষকদের অনেক দীর্ঘ সময় কাজ করতে হবে, তবে এটি ফলপ্রসূ হবে বলে আমার বিশ্বাস। তাদের পর্যবেক্ষণ ও অভিজ্ঞতার ভিত্তিতেই নির্বাচন প্রক্রিয়া নিয়ে নিরপেক্ষ ও তথ্যভিত্তিক মূল্যায়ন করা হবে।
ইনতা লাসে বলেন, আমাদের পর্যবেক্ষকরা ২ জনের একেকটি দল হয়ে কাজ করবেন এবং তাদের পর্যবেক্ষণ এলাকায় ভোটার, নির্বাচন কর্মকর্তা, প্রার্থী ও রাজনৈতিক দলের প্রতিনিধিদের পাশাপাশি নাগরিক পর্যবেক্ষক ও তরুণ কর্মীদের সঙ্গেও সাক্ষাৎ করবেন। তারা শুধু শহরেই নয়, ছোট শহর ও গ্রামাঞ্চলেও এসব কার্যক্রম পরিচালনা করবেন।
ইইউ কর্মকর্তারা জানান, পর্যবেক্ষকরা ইউরোপীয় ইউনিয়নের সদস্যরাষ্ট্রসমূহ, কানাডা, নরওয়ে ও সুইজারল্যান্ড থেকে এসেছেন। তাদের মাঠপর্যায়ে মোতায়েনের আগে বাংলাদেশের নির্বাচনি প্রক্রিয়া, রাজনৈতিক পরিবেশ, আইনি কাঠামো এবং গণমাধ্যম ও সামাজিক প্রেক্ষাপট সম্পর্কে সম্যক ধারণা এবং বিস্তারিত দিকনির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
বাংলাদেশ সরকারের আমন্ত্রণে এই মিশনটি নির্বাচন পর্যবেক্ষণে নিয়োজিত হয়েছে। মিশনের নেতৃত্বে রয়েছেন ইউরোপীয় পার্লামেন্টের সদস্য ও প্রধান পর্যবেক্ষক ইভারস ইয়াবস। তিনি গত ১১ জানুয়ারি ঢাকায় এক সংবাদ সম্মেলনের মাধ্যমে আনুষ্ঠানিকভাবে এই মিশনের কার্যক্রম শুরু করেন।
নির্বাচন ঘনিয়ে আসার সঙ্গে সঙ্গে এই মিশনটিকে আরও জোরদার করা হবে। তখন আরও ৯০ জন স্বল্পমেয়াদী পর্যবেক্ষক এই মিশনে যুক্ত হবেন।
পূর্ণ সক্ষমতায় ইউরোপীয় ইউনিয়নের ২৭টি সদস্যরাষ্ট্র ছাড়াও কানাডা, নরওয়ে ও সুইজারল্যান্ডের প্রায় ২০০ জন পর্যবেক্ষক এই মিশনে অংশ নেবেন। এর মধ্যে ঢাকাভিত্তিক ১১ সদস্যের একটি মূল বিশ্লেষক দল, ৫৬ জন দীর্ঘমেয়াদি পর্যবেক্ষক, নির্বাচনের ঠিক আগে মোতায়েনযোগ্য ৯০ জন স্বল্পমেয়াদি পর্যবেক্ষক এবং ইইউ সদস্যরাষ্ট্র ও অংশীদার দেশগুলোর কূটনৈতিক মিশন থেকে পর্যবেক্ষকেরা থাকবেন। ইউরোপীয় পার্লামেন্টের একটি প্রতিনিধিদল মিশনকে আরও শক্তিশালী করবে।
নির্বাচনের দুই দিন পর, অর্থাৎ আগামী ১৪ ফেব্রুয়ারি নির্বাচন পর্যবেক্ষণ নিয়ে একটি প্রাথমিক বিবৃতি দেবে ইইউ মিশন। ওইদিন ঢাকায় একটি সংবাদ সম্মেলন করার কথা রয়েছে তাদের। তার দুই মাসের মধ্যে ভবিষ্যৎ নির্বাচনের জন্য সুপারিশসহ একটি পূর্ণাঙ্গ চূড়ান্ত প্রতিবেদন প্রকাশ ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে উপস্থাপন করবে তারা।
ইউরোপীয় ইউনিয়নের নির্বাচন পর্যবেক্ষণ মিশন কঠোর আচরণবিধি অনুসরণ করে কাজ করে। এ ক্ষেত্রে নিরপেক্ষতা বজায় রাখা এবং কোনো ধরনের হস্তক্ষেপ না করাই তাদের মূলনীতি। ২০০৫ সালে জাতিসংঘের তত্ত্বাবধানে অনুমোদিত ‘আন্তর্জাতিক নির্বাচন পর্যবেক্ষণ নীতিমালা’ অনুযায়ী তাদের মিশনের কার্যক্রম পরিচালিত হয়।