জোরপূর্বক শ্রমে উৎপাদিত পণ্যের আমদানি রোধে কার্যকর ব্যবস্থা নিতে ব্যর্থ হওয়ার অভিযোগে বাংলাদেশসহ অন্তত ৬০টি দেশের পণ্যের ওপর অতিরিক্ত শুল্ক আরোপের প্রস্তাব দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র।
মঙ্গলবার (২ জুন) এক ঘোষণায় যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্য প্রতিনিধি দপ্তর (ইউএসটিআর) এই প্রস্তাব প্রকাশ করেছে।
সংস্থাটির দাবি, ১৯৭৪ সালের ট্রেড অ্যাক্টের সেকশন ৩০১-এর আওতায় পরিচালিত তদন্তে দেখা গেছে, এসব দেশ জোরপূর্বক শ্রমে উৎপাদিত পণ্যের আমদানি নিষিদ্ধ করা বা কার্যকরভাবে তা বাস্তবায়নে ব্যর্থ হয়েছে, যা যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্যে বাধা সৃষ্টি করছে এবং মার্কিন শ্রমিকদের জন্য অসম প্রতিযোগিতার পরিবেশ তৈরি করছে।
এ বিষয়ে একটি বিস্তারিত প্রতিবেদনও প্রকাশ করেছে ইউএসটিআর।
যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্য প্রতিনিধি জেমিসন গ্রিয়ার বলেন, ‘আমাদের গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্য অংশীদাররা জোরপূর্বক শ্রমে উৎপাদিত পণ্যের আমদানি বন্ধে যথাযথ পদক্ষেপ নিতে ব্যর্থ হয়েছে, যা গ্রহণযোগ্য নয়। এতে মার্কিন শ্রমিকরা বৈশ্বিক বাজারে অসাম্য প্রতিযোগিতার মুখে পড়ছে।’
তিনি বলেন, ‘আমরা আর এই বৈষম্য মেনে নেব না। কিছু দেশ ইউএসএমসিএ এবং পারস্পরিক বাণিজ্য চুক্তির আওতায় প্রাথমিক পদক্ষেপ নিলেও জোরপূর্বক শ্রমকে উৎসাহিত ও স্থায়ী করে তোলে—এমন বাণিজ্যিক পরিবেশ রোধে আরও কার্যকর ব্যবস্থা নিতে হবে।’
ইউএসটিআরের প্রস্তাব অনুযায়ী, যেসব দেশ জোরপূর্বক শ্রমে উৎপাদিত পণ্যের আমদানি নিষিদ্ধ করেছে, অথবা পারস্পরিক বাণিজ্য চুক্তির মাধ্যমে এ ধরনের নিষেধাজ্ঞা কার্যকর করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে, তাদের পণ্যের ওপর অতিরিক্ত ১০ শতাংশ শুল্ক আরোপ করা হবে।
অন্যদিকে, বাকি দেশগুলোর পণ্যের ওপর অতিরিক্ত সাড়ে ১২ শতাংশ শুল্ক আরোপের প্রস্তাব করা হয়েছে।
এ ছাড়া নির্দিষ্ট কিছু দেশের তৈরি পোশাক ও বস্ত্রপণ্যের জন্য একটি বিশেষ ব্যবস্থা প্রস্তাব করা হয়েছে, যার আওতায় নির্ধারিত পরিমাণ আমদানি কম হারের শুল্কে যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশ করতে পারবে।
ইউএসটিআর জানিয়েছে, প্রস্তাবিত পদক্ষেপ নিয়ে জনমত গ্রহণের জন্য আগামী ৭ জুলাই শুনানি অনুষ্ঠিত হবে। শুনানিতে অংশ নিতে আগ্রহীদের ২২ জুনের মধ্যে আবেদন ও সাক্ষ্যের সারসংক্ষেপ জমা দিতে হবে। লিখিত মতামত জমা দেওয়ার শেষ সময় ৬ জুলাই।
চলতি বছরের ১২ মার্চ ইউএসটিআর স্বপ্রণোদিত হয়ে ৬০টি দেশের বিরুদ্ধে তদন্ত শুরু করে। তদন্তের অংশ হিসেবে জনমত গ্রহণ ও প্রকাশ্য শুনানির আয়োজন করা হয়। এ প্রক্রিয়ায় প্রায় ৬০ জন সাক্ষীর বক্তব্য এবং ৫০০টির বেশি পাল্টাপাল্টি মন্তব্য গ্রহণ করা হয়।
তদন্ত শেষে ইউএসটিআর সিদ্ধান্তে উপনীত হয় যে, সংশ্লিষ্ট প্রতিটি দেশ জোরপূর্বক শ্রমে উৎপাদিত পণ্যের আমদানি নিষিদ্ধ করা এবং সেই নিষেধাজ্ঞা কার্যকরভাবে বাস্তবায়নে ব্যর্থ হয়েছে।
বাংলাদেশসহ ৫৪টি এমন দেশ চিহ্নিত করা হয়েছে, যারা জোরপূর্বক শ্রমে উৎপাদিত পণ্যের আমদানি নিষিদ্ধ করার ব্যবস্থা গ্রহণেই ব্যর্থ হয়েছে। এই তালিকায় রয়েছে বাংলাদেশ, ভারত, চীন, জাপান, যুক্তরাজ্য, অস্ট্রেলিয়া, ব্রাজিল, মালয়েশিয়া, সৌদি আরব, সিঙ্গাপুর, দক্ষিণ কোরিয়া, থাইল্যান্ড, ভিয়েতনাম, সংযুক্ত আরব আমিরাতসহ আরও অনেক দেশ।
অন্যদিকে কানাডা, ইউরোপীয় ইউনিয়ন, ইন্দোনেশিয়া, মেক্সিকো, পাকিস্তান ও ইকুয়েডরকে এমন দেশ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে, যারা নিষেধাজ্ঞা থাকলেও তা কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন করতে ব্যর্থ হয়েছে।
ইউএসটিআরের মতে, জোরপূর্বক শ্রমে উৎপাদিত পণ্যের আমদানি নিষিদ্ধ ও কার্যকরভাবে নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থতা বৈশ্বিকভাবে শ্রম শোষণ নির্মূলের প্রচেষ্টাকে দুর্বল করে। একই সঙ্গে এটি জোরপূর্বক শ্রম ব্যবহারকারী প্রতিষ্ঠানগুলোকে কম খরচে উৎপাদনের সুযোগ দিয়ে বাজারে প্রতিযোগিতার ভারসাম্য নষ্ট করে এবং শ্রম মানদণ্ড মেনে চলা প্রতিষ্ঠানগুলোর লাভজনকতা কমিয়ে দেয়।
এ ছাড়া এই ব্যর্থতা মার্কিন বাজার ও রপ্তানি বাজারে যুক্তরাষ্ট্রের উৎপাদকদের জন্য অন্যায্য প্রতিযোগিতার পরিবেশ সৃষ্টি করছে বলেও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।