সরকার শুরু থেকেই শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণের চেষ্টা করছে এবং ভারতের কাছেও এ বিষয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে অনুরোধ জানানো হয়েছে। তাকে ফিরিয়ে এনে বিচারিক প্রক্রিয়া সম্পন্ন করাই আমাদের লক্ষ্য বলে জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রীর তথ্য ও সম্প্রচারবিষয়ক উপদেষ্টা ডা. জাহেদ উর রহমান।
তিনি বলেছেন, শেখ হাসিনার বক্তব্য গণমাধ্যমে প্রচারের ওপর যে নিষেধাজ্ঞা রয়েছে, সেটি সরকারের সিদ্ধান্ত নয়, আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের (আইসিটি) নির্দেশনা। তাই সরকার কেবল আদালতের আদেশ বাস্তবায়নের দায়িত্ব পালন করছে।
মঙ্গলবার (১৪ জুলাই) সচিবালয়ে তথ্য অধিদপ্তরের (পিআইডি) সম্মেলন কক্ষে সরকারের বিভিন্ন কার্যক্রমের অগ্রগতি নিয়ে আয়োজিত সাপ্তাহিক ব্রিফিংয়ে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে তিনি এ কথা বলেন।
শেখ হাসিনাকে ফেরা নিয়ে সরকার বিষয়টাকে কীভাবে দেখছে এমন প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রীর তথ্য উপদেষ্টা বলেন, শেখ হাসিনাকে ফিরিয়ে আনার বিষয়ে সরকারের অবস্থান স্পষ্ট। আমরা শুরু থেকেই তাকে প্রত্যর্পণ করার আনুষ্ঠানিক চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি। তিনি দেশে ফিরলে আমরা তাকে স্বাগত জানাব। তবে 'স্বাগত জানানো'র অর্থ এই নয় যে আমরা তাকে রাজনৈতিকভাবে বরণ করছি; বরং আমরা তার জন্য আইনের শাসন ও ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে চাই। আদালতে তার মৃত্যুদণ্ড হয়েছে, তাই তাকে ফিরিয়ে এনে বিচারিক প্রক্রিয়া সম্পন্ন করাই আমাদের লক্ষ্য।
তিনি বলেন, শেখ হাসিনা যদি দুই দেশের পারস্পরিক যোগাযোগের মাধ্যমে দেশে ফিরে আসেন, তবে তা অত্যন্ত ভালো। দেশে ফিরে তিনি আইনি প্রক্রিয়ার মুখোমুখি হবেন। বর্তমানে আইসিটিতে বিদেশি আইনজীবী নিয়োগের সুযোগ রয়েছে। তিনি চাইলে পৃথিবীর সবচেয়ে নামকরা আইনজীবীদের এনেও নিজের পক্ষে লড়াই করতে পারেন। বিচার প্রক্রিয়াকে সম্পূর্ণ স্বচ্ছ করতে সেখানে পর্যবেক্ষক রাখার এবং ভিডিও ক্যামেরায় ধারণের আধুনিক ব্যবস্থা করা হয়েছে। অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময় আইসিটি আইনকে এতটাই আধুনিক ও যুগোপযোগী করা হয়েছে যে পুরো বিচার প্রক্রিয়া একেবারে স্বচ্ছতার সঙ্গে চলবে। এ দেশের জনগণ চায় তার অপরাধের সুনির্দিষ্ট বিচার হোক এবং আদালতে তার মৃত্যুদণ্ড দেওয়ার যে রায় রয়েছে, তা যেন বহাল থাকে। জনগণ সেই রায় কার্যকর হতে দেখতে চায়।
উপদেষ্টা বলেন, তিনি (শেখ হাসিনা) যদি আদালতে নিজেকে নির্দোষ প্রমাণ করতে পারেন, কিংবা আদালত যদি তাকে অন্য কোনো শাস্তি দেন বা খালাস দেন—আমরা তা মেনে নেব। ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার প্রক্রিয়াটি এমনই হওয়া উচিত। মূলত এই কারণেই আমরা তাকে দেশে ফিরিয়ে আনতে চাই এবং তার আসাকে স্বাগত জানাচ্ছি, কারণ আমরা আইনের শাসন ও ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। যিনি আমাদের এই রাষ্ট্রটিকে ধ্বংস করে ফেলেছেন বলে আমরা মনে করি, আমরা তাকেও আত্মপক্ষ সমর্থনের পূর্ণ সুযোগ দিয়ে একটি সুষ্ঠু বিচারের মুখোমুখি করতে চাই।
জাহেদ উর বলেন, ভূ-রাজনৈতিক (জিওপলিটিক্যাল) দৃষ্টিকোণ থেকে এটিকে আমি বড় কোনো ইস্যু বলে মনে করি না। আসলে, আমরা এতক্ষণ ধরে যাকে নিয়ে আলোচনা করছি, তিনি এখন দেশের রাজনীতিতে সম্পূর্ণ অপ্রাসঙ্গিক একজন মানুষ। ব্যক্তিগতভাবে আমি মনে করি, বিভিন্ন মহলে বা মাধ্যমে তার কথা বারবার আসায় তিনি এখন এক ধরনের প্রাসঙ্গিকতা পাচ্ছেন। শুধু আমি নই, এমনকি আওয়ামী লীগের প্রতি যাদের সামান্যতম সহানুভূতি আছে, তারাও বিশ্বাস করেন না যে এ দেশে তার আর কোনো রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ রয়েছে।
উপদেষ্টা বলেন, আমাদের চারপাশে যে সাধারণ মানুষ বা রাজনৈতিকভাবে সচেতন ব্যক্তিরা রয়েছেন, তারাও মনে করেন না যে এ দেশে তার আর কোনো রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ আছে। সুতরাং, তার ফিরে আসার বিষয়টিকে আমি কোনো চাপ বা সংকট বলে মনে করি না। আমরা কেন চাপে পড়ব? আমরা তো নিজেই তাকে ফিরিয়ে আনার জন্য আনুষ্ঠানিকভাবে চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি। আমরা যদি চাইতাম তিনি ওখানেই থাকুন, আর তিনি হুট করে চলে আসছেন—তাহলে হয়তো চাপের একটি প্রশ্ন আসত। কিন্তু বাস্তব চিত্রটি তেমন নয়। শুধু পূর্ববর্তী অন্তর্বর্তীকালীন সরকারই নয়, বর্তমান নির্বাচিত সরকারের পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রীও নিশ্চিত করেছেন যে আমরা ভারতের কাছে আনুষ্ঠানিকভাবে শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণ চেয়েছি। কাজেই, এ বিষয়ে সরকারের ওপর কোনো চাপ সৃষ্টি হওয়ার সুযোগ নেই
তিনি বলেন, তিনি ঠিক কীভাবে দেশে ফিরবেন, সেই প্রক্রিয়াটি দ্বিপাক্ষিক আলোচনার মাধ্যমে নির্ধারিত হবে। তিনি সেখানে কীভাবে অবস্থান করছেন, তা সংশ্লিষ্ট রাষ্ট্রের বিষয়। তিনি যদি দেশে ফিরতে চান, তবে সেই রাষ্ট্র আমাদের সরকারের সঙ্গে যোগাযোগ করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করবে। এটি একটি নিয়মতান্ত্রিক ও প্রশাসনিক বিষয় যা আটকে থাকবে না। সরকারের নীতিগত অবস্থান হলো তাকে দেশে ফিরিয়ে আনা এবং আইনের মুখোমুখি করে ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা। সুতরাং, তিনি যদি নিজে থেকে আসতে চান, তবে স্বাভাবিক নিয়মেই সরকার তাকে সব ধরনের আইনি ও প্রশাসনিক সহযোগিতা প্রদান করবে।
জাহেদ উর রহমান বলেন, শেখ হাসিনার বক্তব্য গণমাধ্যমে প্রচার নিয়ে অনেকেই সরকারের অবস্থান জানতে চাইছেন। কিন্তু বিষয়টি সরকারের নীতিগত সিদ্ধান্ত নয়, বরং আদালতের আদেশ। নির্বাহী বিভাগ হিসেবে আদালতের নির্দেশনা কার্যকর করা সরকারের সাংবিধানিক দায়িত্ব।
তিনি বলেন, এই আদেশ সরকার দেয়নি, আদালত দিয়েছে। কেউ যদি মনে করেন, এই সিদ্ধান্তে সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা ক্ষুণ্ন হচ্ছে, তাহলে আদালতেই তা চ্যালেঞ্জ করার সুযোগ রয়েছে। আদালত যদি নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করেন, তাহলে সেটি আর বহাল থাকবে না।
তথ্য উপদেষ্টা বলেন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের বাস্তবতায় বিভিন্ন বক্তব্য ছড়িয়ে পড়ছে। তবে আদালতের নির্দেশনা অমান্য না করার বিষয়ে সবাইকে সচেতন থাকতে হবে। রাষ্ট্রের আইনের প্রতি সম্মান দেখানোই সবার দায়িত্ব বলে তিনি মন্তব্য করেন।