তথ্য ও সম্প্রচারমন্ত্রী জহির উদ্দিন স্বপন দাবি করেছেন, শেখ হাসিনা সরকারের আমলে ২০২২ সালের ফুটবল বিশ্বকাপ সম্প্রচারস্বত্ব বিটিভিকে কিনতে ৯৮ কোটি টাকা ব্যয় করতে হয়েছিল। অথচ এবার সরকার সরাসরি ফিফার কাছ থেকে সম্প্রচারস্বত্ব কিনে সাব-লাইসেন্সিংয়ের মাধ্যমে প্রায় পুরো খরচই তুলে এনেছে।
বর্তমানে সরকারের ঘাটতি মাত্র ৪ থেকে ৫ কোটি টাকা, সেটিও আলোচনার মাধ্যমে সমন্বয়ের চেষ্টা চলছে বলে জানিয়েছেন তিনি।
রবিবার (১৯ জুলাই) সচিবালয়ে তথ্য অধিদপ্তরের সম্মেলনকক্ষে বিশ্বকাপ ফুটবল সম্প্রচার নিয়ে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে এসব কথা বলেন তথ্যমন্ত্রী।
মন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশের কোটি কোটি ফুটবলপ্রেমীর জন্য বিশ্বকাপ সম্প্রচারের ব্যবস্থা করা সরকারের দায়িত্ব। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নির্দেশ ছিল, দেশের মানুষকে খেলা দেখাতে হবে, তবে রাষ্ট্রের ওপর অতিরিক্ত আর্থিক চাপ সৃষ্টি করা যাবে না। সেই নির্দেশনা অনুযায়ী, ফিফার সঙ্গে সরাসরি দরকষাকষি করে ৩৮ লাখ ৫০ হাজার ডলারে মিডিয়া স্বত্ব কেনা হয়েছে।
তিনি বলেন, এরপর দেশের চারটি প্রতিষ্ঠানের কাছে সাব-লাইসেন্সিং করে অধিকাংশ অর্থ আদায় করা হয়েছে। ফলে সরকারের প্রকৃত ঘাটতি মাত্র ৪ থেকে ৫ কোটি টাকা। এখনও সাব-লাইসেন্সধারীদের সঙ্গে রাজস্ব ভাগাভাগির বিষয়ে আলোচনা চলছে। সেটি সফল হলে এই ঘাটতিও আর থাকবে না বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি।
২০২২ সালের বিশ্বকাপ সম্প্রচারের প্রসঙ্গ তুলে জহির উদ্দিন স্বপন বলেন, সে সময় ফিফার কাছ থেকে একটি সিঙ্গাপুরভিত্তিক প্রতিষ্ঠান সম্প্রচারস্বত্ব কিনেছিল। পরে বাংলাদেশের তমা কনস্ট্রাকশন নামে একটি প্রতিষ্ঠান সেই স্বত্ব নিয়ে বিটিভির কাছে ৯৮ কোটি টাকায় বিক্রি করে। একই সঙ্গে স্যাটেলাইট সম্প্রচারস্বত্ব ২২ কোটি টাকা এবং ডিজিটাল সম্প্রচারস্বত্ব ১৭ কোটি টাকায় বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের কাছে বিক্রি করা হয়। সব মিলিয়ে প্রায় ১৪০ কোটি টাকার লেনদেন হয়েছিল।
তিনি বলেন, ফিফা পেয়েছিল মাত্র ৩২ লাখ ডলার, বাকি অর্থ মধ্যস্বত্বভোগীদের কাছে গেছে। জনগণের করের ৯৮ কোটি টাকা ব্যয় করে বিটিভি সম্প্রচারস্বত্ব কিনেছিল। ২০২২ সালের বিশ্বকাপ দেখানোর নামে কীভাবে দুর্নীতি ও রাষ্ট্রীয় অর্থের অপচয় হয়েছে, ২০২৬ সালের বিশ্বকাপ সম্প্রচারের সঙ্গে তুলনা করলেই তা পরিষ্কার হবে।
তথ্যমন্ত্রী বলেন, বর্তমান সরকার সরাসরি ফিফার কাছ থেকে সম্প্রচারস্বত্ব কিনেছে। মাঝখানে কোনো মধ্যস্বত্বভোগী ছিল না। ফলে অল্প ব্যয়ে দেশের মানুষকে বিশ্বকাপ দেখানো সম্ভব হয়েছে। ভবিষ্যতে আরও প্রযুক্তিগত উন্নয়ন এবং অর্থনৈতিকভাবে লাভজনকভাবে বিশ্বকাপ সম্প্রচারের পরিকল্পনা নেওয়া হবে।
তিনি বলেন, এই প্রক্রিয়ায় বিটিভি, তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়, বাংলাদেশ ফুটবল ফেডারেশন এবং ক্রীড়া সাংবাদিকদের সহযোগিতা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে।
সংবাদ সম্মেলনে বিটিভির মহাপরিচালক মাহবুব বলেন, বিটিভির ইতিহাসে এবারই প্রথম প্রায় নামমাত্র ব্যয়ে বিশ্বকাপ সম্প্রচার সম্ভব হয়েছে। এখনও রাজস্ব ভাগাভাগির কিছু বিষয় বাকি রয়েছে। সেটি সম্পন্ন হলে সরকারের আর কোনো ঘাটতি থাকবে না বলে আশা করা হচ্ছে।
তিনি বলেন, বিশ্বকাপ সম্প্রচারের জন্য বিটিভির নিজস্ব অনুষ্ঠান প্রচারের সময় ব্যবহার করা হয়েছে। সেই সময়ের আর্থিক মূল্য হিসাব করলে পুরো আয়োজন লাভজনক অবস্থানে চলে যাবে। বিটিভির প্রকৌশলী ও কারিগরি কর্মীরা অত্যন্ত দক্ষতার সঙ্গে সম্প্রচার পরিচালনা করেছেন এবং বিটিভির প্রযুক্তিগত সক্ষমতা নিয়ে প্রচলিত নেতিবাচক ধারণা ভুল প্রমাণ করেছেন।
ভারপ্রাপ্ত সচিব শাহ আলম বলেন, বিশ্বকাপ সম্প্রচারের সময় বিভিন্ন ধরনের হ্যাকিংয়ের চেষ্টা হয়েছিল। তবে বিটিভি এবং সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের প্রকৌশলীরা সেগুলো সফলভাবে প্রতিরোধ করেছেন। ফলে যেসব প্রতিষ্ঠান বৈধভাবে সম্প্রচারস্বত্ব পেয়েছিল, তারাই সম্প্রচার করতে পেরেছে।
এক প্রশ্নের জবাবে ২০২২ সালের বিশ্বকাপ সম্প্রচারে অনিয়মের অভিযোগে তদন্তের বিষয়ে তথ্যমন্ত্রী বলেন, আইন তার নিজস্ব গতিতে চলছে এবং চলবে। সরকার আইনি প্রক্রিয়াকে সহযোগিতা করবে।
বিটিভির মহাপরিচালক বলেন, এ বিষয়ে বিটিভির অভ্যন্তরীণ প্রাথমিক তদন্ত শুরু হয়েছে। পাশাপাশি দুর্নীতি দমন কমিশনেও (দুদক) একটি প্রাথমিক তদন্ত প্রক্রিয়া চলছে বলে তার জানা আছে।
পরে তথ্যমন্ত্রী বলেন, বিভাগীয় তদন্ত চলছে। বিভাগীয় তদন্ত শেষ হওয়ার পর প্রয়োজন হলে তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয় বা বিটিভির পক্ষ থেকে দুদকের সঙ্গে যোগাযোগ করা হবে।
সংবাদ সম্মেলনে এক সাংবাদিক ব্রাজিল ও আর্জেন্টিনা জাতীয় ফুটবল দলকে বাংলাদেশে এনে প্রীতি ম্যাচ আয়োজনের বিষয়ে জানতে চাইলে মন্ত্রী বলেন, এটি একটি ভালো প্রস্তাব। বিষয়টি বাংলাদেশ ফুটবল ফেডারেশনের সঙ্গে আলোচনা করে বাস্তবায়নের সম্ভাবনা বিবেচনা করা হবে।
ক্রীড়াবিদ তৈরিতে সরকারের পরিকল্পনা সম্পর্কে তিনি বলেন, ক্রীড়াকে পেশাদার পর্যায়ে উন্নীত করতে সরকার কাজ করছে। প্রতিভাবান খেলোয়াড়দের ছোটবেলা থেকেই চিহ্নিত করে রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতার আওতায় আনার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি জাতীয় পর্যায়ে কৃতি ক্রীড়াবিদদের সম্মাননা এবং স্পোর্টস কার্ড চালুর পরিকল্পনাও রয়েছে।
বিটিভির ভূমিকা নিয়ে এক প্রশ্নের জবাবে জহির উদ্দিন স্বপন বলেন, জনমত গঠন এবং ইতিবাচক মূল্যবোধ প্রতিষ্ঠায় বাংলাদেশ টেলিভিশনের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। দীর্ঘমেয়াদি সামাজিক ও সাংস্কৃতিক মূল্যবোধসম্পন্ন বিষয়গুলো নিয়ে বিটিভিকে আরও কার্যকরভাবে কাজে লাগানো হবে।
সংবাদ সম্মেলনে প্রধান তথ্য কর্মকর্তা সৈয়দ আবদাল আহমদ উপস্থিত ছিলেন।