কাঁচাবাজারে সরকারের পলিথিন নিষিদ্ধের ঘোষণা দেওয়ার পর পেরিয়ে গেছে ১৫ মাসেরও বেশি সময়; কিন্তু বাস্তব চিত্র তার পুরো উল্টো। রাজধানীসহ দেশের প্রায় সব হাট-বাজারেই দেদারছে চলছে নিষিদ্ধ পলিথিনের ব্যবহার। ক্রেতা-বিক্রেতা কারও মধ্যেই নেই কোনো বাছবিচার বা সচেতনতার ছাপ। বাজারে খালি হাতে ঢুকে ক্রেতারা ফিরছেন পলিথিনের ব্যাগভর্তি বাজার নিয়ে।
অথচ দুই দশকের বেশি সময় ধরে আইন থাকলেও পলিথিন আজও বাজার থেকে উধাও হয়নি। অভিযান, জরিমানা আর ঘোষণার বাইরে গিয়ে বিকল্প উৎপাদন, সরবরাহ নিশ্চিত করা এবং শক্তিশালী সিন্ডিকেট ভাঙা না গেলে পলিথিন বন্ধের উদ্যোগ বারবারই মুখ থুবড়ে পড়বে। বিশ্লেষকদের মতে, পরিবেশ রক্ষার এই লড়াইয়ে কেবল আইন নয়, দরকার বাস্তবসম্মত পরিকল্পনা ও রাজনৈতিক সদিচ্ছা।
রাজধানীর বিভিন্ন কাঁচাবাজারে সরেজমিনে ঘুরে দেখা গেছে, মাছ, মাংস, সবজি, ফল, মুদি পণ্য—সবকিছুই বিক্রি হচ্ছে পলিথিনে। বিক্রেতারা বলছেন, পলিথিন সস্তা, সহজলভ্য এবং বিকল্পের তুলনায় ঝামেলাহীন। ক্রেতাদেরও বাড়তি খরচ নেই। ফলে কাগজ, কাপড় বা পাটের ব্যাগ ব্যবহারে কারও আগ্রহ দেখা যাচ্ছে না। তবে বর্তমানে রাজধানীর সুপারশপগুলোতে পলিথিনের ব্যবহার কিছুটা কমেছে।
অন্তর্বর্তী সরকার পলিথিন নিষিদ্ধে অভিযানে যাওয়ার আগে পরিবেশ উপদেষ্টার সঙ্গে অংশীজনদের কয়েক দফা আলোচনা হয়। ব্যবসায়ীদের নির্দিষ্ট সময় দিয়ে পলিথিনবিরোধী অভিযানও চালানো হয় বাজার-কারখানায়। তবে অভিযানের পরও পলিথিনের ব্যবহার নিয়ন্ত্রণে আনতে পারেনি সরকার। বড় মার্কেট, হাট-বাজারসহ অলিগলিতে মিলছে পলিথিন। ক্রেতা-বিক্রেতারা বলছেন, বিকল্প না থাকায় পলিথিন ব্যবহারে বাধ্য হচ্ছেন তারা। অন্যদিকে, পরিবেশ অধিদপ্তরের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, পলিথিন ব্যবহার বন্ধে চেষ্টার কোনো ত্রুটি হচ্ছে না।
আইন আছে, প্রয়োগ নেই
পরিবেশ সুরক্ষায় পলিথিনের উৎপাদন, বিপণন ও বাজারজাতকরণ প্রথম নিষিদ্ধ করা হয় ২০০২ সালে।
পরিবেশ সংরক্ষণ আইন সংশোধনের মাধ্যমে বাংলাদেশ সরকার সে বছর সাধারণ পলিথিন ব্যাগ আইনগতভাবে নিষিদ্ধ করে।
পরে অন্তর্বর্তী সরকার এসে নতুন করে পলিথিন ব্যাগ নিষিদ্ধ করে ২০২৪ সালের ১ অক্টোবর থেকে। ওই দিন থেকে সারা দেশের সুপারশপগুলোতে পলিথিন ব্যাগ ব্যবহার নিষিদ্ধ করা হয়। এরপর ১ নভেম্বর থেকে দেশব্যাপী সব ধরনের হাট-বাজার ও দোকানে পলিথিন উৎপাদন, বিপণন, সরবরাহ ও ব্যবহারের বিরুদ্ধে অভিযান শুরু ঘোষণা দেওয়া হয়। একইসঙ্গে পলিথিন ও পলিপ্রোপাইলিন শপিং ব্যাগের উৎপাদন, মজুদ, পরিবহন ও ব্যবহার নিষিদ্ধ করা হয়। কিন্তু বাস্তবে নিষেধাজ্ঞা কার্যকর থাকছে কাগজে-কলমেই। অভিযানের শুরুতে কিছুটা কড়াকড়ি থাকলেও অল্প সময়ের মধ্যেই তা শিথিল হয়ে পড়ে। কয়েক দিনের ব্যবধানে আবারও দাপটের সঙ্গে বাজারে ফিরে আসে পলিথিন।
পরিসংখ্যান বলছে ভয়াবহতা
গবেষণায় দেখা গেছে, দেশে প্রায় তিন হাজার কারখানায় প্রতিদিন কোটি কোটি পলিথিন ব্যাগ উৎপাদিত হচ্ছে। শুধু ঢাকাতেই প্রতিদিন জমা হয় প্রায় দুই কোটি পলিথিন ব্যাগ। দেশের প্রায় ৮০ শতাংশ মানুষ প্রতিদিন কোনো না কোনোভাবে পলিথিন ও প্লাস্টিক সামগ্রী ব্যবহার করছে। ফলে প্লাস্টিক দূষণে বাংলাদেশ এখন বিশ্বের শীর্ষ দেশগুলোর একটি।
পুরান ঢাকায় প্রকাশ্যে উৎপাদন হচ্ছে পলিথিন
উৎপাদন নিষিদ্ধ হলেও পুরান ঢাকার দেবীদাসঘাট লেন, গণি মিয়ার হাট ও লাড়কিপট্টি এলাকায় শত শত পলিথিন কারখানা চলছে কোনো রাখঢাক না করেই।
স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, এলাকাভিত্তিক শক্তিশালী সিন্ডিকেট প্রশাসনের সঙ্গে সমঝোতা করে এসব কারখানা চালু রেখেছে।
গত বছর চকবাজারে নিষিদ্ধ পলিথিন কারখানায় অভিযান শেষে পরিবেশ অধিদপ্তরের কর্মকর্তাদের ওপর হামলার ঘটনা সেই শক্তিশালী চক্রের বাস্তব চিত্র তুলে ধরে। তখন হামলায় গুরুতর আহত হন অধিদপ্তরের মনিটরিং অ্যান্ড এনফোর্সমেন্ট পরিচালক মুহাম্মদ শওকত আলী।
বিকল্প আসবে কবে
কারওয়ান বাজার, কিচেন মার্কেট, মুসলিম বাজারসহ বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, প্রায় সব দোকানেই পলিথিন ব্যবহার হচ্ছে। বিক্রেতারা বলছেন, বিকল্প না থাকায় পলিথিন ছাড়া ব্যবসা চালানো সম্ভব নয়।
এক সবজি বিক্রেতার ভাষায়, ‘আমি না দিলে কাস্টমার অন্য দোকান থেকে নেবে। পাট বা কাগজের ব্যাগ তো বাজারেই নেই।’
ক্রেতারাও একই কথা বলছেন। তাদের মতে, আইন করে নিষিদ্ধ করলেই হবে না, সহজলভ্য ও সাশ্রয়ী বিকল্প বাজারে আনতে হবে। সুপারশপে পাওয়া বিকল্প ব্যাগের দাম সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে।
পরিবেশ ও জনস্বাস্থ্যে মারাত্মক ঝুঁকি
স্টামফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ও ক্যাপস পরিচালক আহমদ কামরুজ্জামান মজুমদার ইউএনবিকে বলেন, পলিথিন তিনভাবে ক্ষতি করে—মাটি দূষণ, ড্রেন বন্ধ হয়ে জলাবদ্ধতা সৃষ্টি এবং বর্জ্য ব্যবস্থাপনাকে অকার্যকর করে। পোড়ালে বাতাস বিষাক্ত হয়, পানিতে মিশলে পানির গুণগত মান নষ্ট হয়। খাদ্যের সঙ্গে শরীরে ঢুকে ক্যানসারসহ নানা রোগের ঝুঁকিও তৈরি করে।
তার মতে, পলিথিন কমাতে হলে আগে বিকল্প নিশ্চিত করতে হবে। সস্তা, সহজে বহনযোগ্য ও ভেজা পণ্যের উপযোগী না হলে কোনো বিকল্পই কার্যকর হবে না।
প্রস্তুতির ঘাটতিতে ব্যর্থতা
পরিবেশ অধিদপ্তরের সাবেক অতিরিক্ত মহাপরিচালক প্রকৌশলী মো. আবদুস সোবহান ইউএনবিকে বলেন, কোনো প্রস্তুতি ছাড়াই হঠাৎ সিদ্ধান্ত নেওয়াই ব্যর্থতার মূল কারণ। বাজারে বিকল্প নেই, প্রশাসনিক সক্ষমতা সীমিত, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর দুর্বল সমন্বয়—সব মিলিয়ে সরকার এবারও সফল হয়নি।
বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলনের সাধারণ সম্পাদক মো. আলমগীর কবির বলেন, পলিথিন চিরতরে বন্ধ করতে হলে সহজলভ্য ও সস্তা বিকল্প আনতেই হবে। পাটের ব্যাগের দাম দ্বিগুণ হলে সাধারণ মানুষ কখনোই তা গ্রহণ করবে না।
কী বলছে সরকার
পরিবেশ উপদেষ্টা সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান ইউএনবিকে বলেন, পলিথিন নিষিদ্ধে আমরা আইনটি বাস্তবায়নে চেষ্টা করছি। ইতোমধ্যে রাজধানীর সুপারশপগুলোতে পলিথিন দিয়ে পণ্য দিচ্ছে না। এটি আমরা বন্ধ রতে পেরেছি। দেশের সব জায়গা থেকে এই সময়ের মধ্যে এটা বন্ধ করা একটু কঠিন। আমরা একটা জায়গা থেকে শুরু করতে পারলাম। আমরা শুরু করে দিয়ে গেলাম। পরবর্তী নির্বাচিত সরকার এসে বাস্তবায়ন করবে বলে আশা করছি। তবে দেশের সকল হাট-বাজারে বন্ধে আরও সময় লাগবে।
তিনি আরও বলেন, সরকারের অভিযানের পাশাপাশি সকল নাগরিকের সচেতনতা জরুরি। পলিথিনের ক্ষতির দাম তার সস্তা দামের চেয়েও অনেক বেশি। ‘পলিথিনমুক্ত প্রতিদিন’ মানসিকতা গড়ে তুলতে হবে।
পরিবেশ অধিদপ্তরের অতিরিক্ত পরিচালক মো. জিয়াউল হক ইউএনবিকে বলেন, যেকোনোভাবেই হোক পলিথিনের ব্যবহার বন্ধ করতে হবে। আমরা আসলে দুভাবে কাজ করছি—একটি সচেতনতা, অন্যটি মোবাইল কোর্ট; এগুলো সারা দেশেই চলছে। সঙ্গে আমরা সাপ্লাই চেইনটাও বন্ধ করার চেষ্টা করছি। ঢাকা থেকে বিভিন্ন জায়গায় পলিথিন যায়, এ রকম বেশ কিছু ট্রাক আটকানো হয়েছে। কারখানাও বন্ধ করেছিলাম। দ্রুতই এই অভিযান আবার শুরু হবে।