রংপুরের বদরগঞ্জে প্রায় এক বছর আগে জব্দ করা সরকারি সিলমোহরযুক্ত ১৮৩ বস্তা চাল গুদামে পড়ে থেকে নষ্ট হচ্ছে। উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) একাধিকবার অভিযুক্ত ব্যবসায়ীর বিরুদ্ধে মামলা করার নির্দেশ দিলেও রহস্যজনক কারণে তা কার্যকর করেনি খাদ্য বিভাগ। পাঁচ মাস আগে তৎকালীন ইউএনও বদলি হয়ে যাওয়ার পর বিষয়টি কার্যত ধামাচাপা পড়ে যায়। এদিকে অভিযুক্ত ব্যবসায়ীর সরকারি গুদামে অবাধ যাতায়াত এবং চাল রদবদলের নতুন অভিযোগে জনমনে নানা প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।
ঘটনার প্রেক্ষাপট
জানা গেছে, গত বছরের ২০ মে বদরগঞ্জ সরকারি গুদামের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তার যোগসাজশে ট্রলিযোগে ১৫৬ বস্তা চাল পাচার করে মধুপুর ইউনিয়নের বোর্ডঘরা এলাকার চাল ব্যবসায়ী বাপ্পী সাহার গদিতে নেওয়া হচ্ছিল। ওই সময় গদিঘরের উঠানে ট্রলিভর্তি চাল আটক করেন স্থানীয় ছাত্র সমন্বয়ক ও এলাকাবাসী। খবর পেয়ে তৎকালীন ইউএনও মিজানুর রহমান ঘটনাস্থলে গিয়ে সরকারি সিলমোহরযুক্ত ১৫৩ বস্তা চাল জব্দ করেন।
পরদিন আবারও অভিযান চালিয়ে ওই গদিঘর থেকে আরও ২৭ বস্তা সরকারি চাল জব্দ করা হয়। দুই দিনে জব্দ করা মোট ১৮৩ বস্তা চাল পুনরায় সরকারি গুদামে জমা রাখা হয়। তবে দীর্ঘদিনেও মামলা না হওয়ায় পার পেয়ে যাচ্ছেন অভিযুক্ত ওই ব্যবসায়ী।
খাদ্য বিভাগের রহস্যজনক ভূমিকা
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক স্থানীয় কয়েকজন চালকল মালিকের অভিযোগ, চাল ব্যবসায়ীর বিরুদ্ধে মামলা হলে গুদাম কর্মকর্তা ও উপজেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রকও ফেঁসে যেতে পারেন। মূলত নিজেদের রক্ষা করতেই খাদ্য বিভাগ মামলা করতে টালবাহানা করছে।
তারা আরও জানান, ওই ব্যবসায়ীর দোকান গুদামের পাশেই হওয়ায় তিনি অধিকাংশ সময় গুদামেই অবস্থান করেন। অভিযোগ রয়েছে, গুদাম কর্মকর্তা ও উপজেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক আর্থিক সুবিধা নিয়ে তার মাধ্যমে গুদামের ভালো চাল বাইরে পাচার করে নিম্নমানের চাল ঢোকাচ্ছেন। এ কারণে ওই ব্যবসায়ী কর্মকর্তাদের অত্যন্ত আস্থাভাজন হয়ে উঠেছেন।
অভিযুক্ত ও কর্মকর্তারা যা বলছেন
অভিযুক্ত ব্যবসায়ী বাপ্পী সাহা অবশ্য দাবি করেছেন, চালগুলো তার নিজের কেনা। তৎকালীন ইউএনও তার কোনো কথা না শুনেই চালগুলো জব্দ করে গুদামে নিয়ে গেছেন বলে তিনি অভিযোগ করেন।
বদরগঞ্জ সরকারি গুদামের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি-এলএসডি) রায়হান কবির বলেন, ‘চালগুলো প্রায় এক বছর ধরে গুদামে পড়ে নষ্ট হচ্ছে। মামলা না হওয়ায় এর কোনো সুরাহা করা যাচ্ছে না।’ তবে ব্যবসায়ীর সঙ্গে সখ্যতা বা চাল রদবদলের অভিযোগ তিনি অস্বীকার করেন।
উপজেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক বিপ্লব কুমার সিং বলেন, ‘ইউএনও মামলা করতে বললেও চালগুলো বাস্তবে ওই ব্যবসায়ীর কেনা ছিল। এ কারণেই তার বিরুদ্ধে মামলা করা হয়নি।’
প্রশাসনের অবস্থান
তৎকালীন ইউএনও মিজানুর রহমান মুঠোফোনে জানান, ‘সরকারি সিলমোহরযুক্ত বস্তা জব্দ করার পর আমি খাদ্য নিয়ন্ত্রককে মামলা করার স্পষ্ট নির্দেশ দিয়েছিলাম। চালগুলো ব্যক্তিগত নাকি সরকারের, তা আদালতেই প্রমাণিত হতো। কিন্তু খাদ্য নিয়ন্ত্রক কেন মামলা করেননি, তা আমার বোধগম্য নয়।’
বর্তমান ইউএনও আঞ্জুমান সুলতানা বলেন, ‘আমি এখানে যোগ দেওয়ার পর বিষয়টি সম্পর্কে অবহিত ছিলাম না। এখন বিষয়টি খতিয়ে দেখে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’
রংপুরের জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ রুহুল আমিন জানান, তিনি জেলায় নতুন এসেছেন এবং বিষয়টি তার জানা নেই। তবে দ্রুতই খাদ্য অধিদপ্তরের কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠকে এ বিষয়ে বিস্তারিত খোঁজ নেবেন বলে তিনি আশ্বাস দেন।