এই প্রথমবারের মতো পোস্টার ছাড়াই শুরু হয়েছে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের প্রচার-প্রচারণা। নির্বাচন কমিশনের (ইসি) নতুন আচরণবিধির কারণে চিরাচরিত পোস্টার, মাইকিং ও দৃশ্যমান প্রচারণা না থাকায় ভোটারদের মধ্যে বিভ্রান্তি তৈরি হয়েছে। একদিকে নির্বাচনের আমেজ কমে গেছে, অন্যদিকে পোস্টারনির্ভর ছাপাখানা ব্যবসায় নেমে এসেছে বড় ধরনের স্থবিরতা। পরিবেশ সুরক্ষার যুক্তিতে নেওয়া এ সিদ্ধান্তকে কেউ দেখছেন ইতিবাচক পরিবর্তন হিসেবে, আবার কেউ বলছেন এতে সাধারণ ভোটারদের জন্য প্রার্থী চেনা কঠিন হয়ে পড়েছে।
চিরচেনা নির্বাচনি দৃশ্যপট বদলে গেছে
নির্বাচন এলেই রাস্তার মোড়, অলিগলি, দেওয়াল কিংবা গাছপালা ছেয়ে যায় পোস্টারে; এটাই দেশের চিরায়ত নির্বাচনি দৃশ্যপট। তবে এই প্রথমবার সেই চিরচেনা দৃশ্য আর চোখে পড়ছে না।
নির্বাচনি আচরণবিধিতে সব ধরনের পোস্টার ব্যবহার নিষিদ্ধ করেছে নির্বাচন কমিশন। ইসির এই সিদ্ধান্তে কার্যত মাথায় হাত পড়েছে পোস্টারনির্ভর ছাপাখানা ব্যবসায়ীদের।
ছাপাখানা শিল্পে স্থবিরতা
ছাপাখানার মালিকরা বলছেন, গত তিন–চার দিন ধরে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের প্রচার-প্রচারণা শুরু হলেও তাদের হাতে কোনো কাজ নেই। পোস্টার ছাপানোর কোনো অর্ডার পাচ্ছেন না তারা।
সংশ্লিষ্ট এসব ব্যবসায়ী লাখ-লাখ টাকার কাগজ কিনে বসে আছেন। নির্বাচন সামনে রেখে যেখানে সাধারণত কয়েক কোটি টাকার পোস্টার ছাপার কাজ হতো, এবার তা পুরোপুরি বন্ধ। ফলে রীতিমতো ধস নেমেছে এই খাতে।
রাজধানীর ফকিরাপুল ও ঢাকার বাংলাবাজার এলাকায় ছাপাখানার সংখ্যা তুলনামূলক বেশি। এসব এলাকায় মূলত পোস্টার, লিফলেট ও হ্যান্ডবিল ছাপার কাজ বেশি হয়। কিন্তু নির্বাচনি প্রচার শুরু হলেও গত কয়েক দিনে এলাকাগুলো ঘুরে দেখা গেছে, ছাপাখানাগুলো অনেকটাই নিস্তব্ধ।
নতুন আচরণবিধি ও নিষেধাজ্ঞা
আচরণবিধিতে সংশোধন এনে গত ১০ নভেম্বর গেজেট জারি করে নির্বাচন কমিশন। নতুন বিধিমালায় বলা হয়েছে, এ নির্বাচনে ভোটের প্রচারণায় রাজনৈতিক দল ও প্রার্থীরা কোনো ধরনের পোস্টার ব্যবহার করতে পারবেন না। ফলে এবারই প্রথমবারের মতো পোস্টার ছাড়া নির্বাচনি প্রচারণায় নামছেন প্রার্থীরা।
তবে পোস্টার নিষিদ্ধ হলেও লিফলেট, হ্যান্ডবিল ও ফেস্টুন ব্যবহার করা যাবে। এসব লিফলেট, বিলবোর্ড বা ফেস্টুনে রাজনৈতিক দলের ক্ষেত্রে দলীয় প্রধান ছাড়া অন্য কারও ছবি ব্যবহার করা যাবে না।
গত বুধবার (২১ জানুয়ারি) দিনগত রাত ১২টার পর থেকে শুরু হওয়া ভোটের প্রচারণা আগামী ১০ ফেব্রুয়ারি সকাল সাড়ে ৭টা পর্যন্ত চালাতে পারবেন প্রার্থীরা।
ভোটারদের মধ্যে আমেজহীনতা ও বিভ্রান্তি
পোস্টার না থাকায় জাতীয় নির্বাচনের প্রচারণা অনেকটাই জৌলুস হারিয়েছে বলে মনে করছেন ভোটাররা। অনেকেই বলছেন, নির্বাচনের কোনো দৃশ্যমান আমেজই তারা পাচ্ছেন না। পোস্টার না থাকায় বিভিন্ন দলের কিংবা স্বতন্ত্র প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীদের চিনতেও সমস্যা হচ্ছে।
রাজধানীর নতুন বাজার এলাকার বাসিন্দা রুহুল আমিন ইউএনবিকে বলেন, ‘জাতীয় নির্বাচনে পোস্টার ছাড়া কেমন জানি অচেনা অচেনা নির্বাচন মনে হচ্ছে। পোস্টার-ফেস্টুন এতদিন একটা কমন বিষয় ছিল। এবার না থাকায় যারা বাইরে খুব একটা চলাফেরা করেন না বা নির্বাচন নিয়ে যাদের আগ্রহ কম, তারা প্রার্থী চিনতে সমস্যায় পড়ছেন। ভোটের প্রচারণার কোনো আমেজই নেই।’
বসুন্ধরা আবাসিক এলাকার বাসিন্দা শফিকুল ইসলাম ইউএনবিকে বলেন, ‘জাতীয় নির্বাচন হচ্ছে—এটা টিভিতে প্রচারণা দেখে বোঝা যায়। কিন্তু চিরাচরিত পোস্টার বা মাইকিং চোখে পড়ছে না। ভোটের তেমন কোনো আমেজ দেখছি না।’
অন্যদিকে বনশ্রীর বাসিন্দা নাঈম ইউএনবিকে বলেন, ‘পোস্টার ছাড়া নির্বাচন একদিক থেকে ভালো। শহর পরিষ্কার থাকে। তবে পোস্টারবিহীন প্রথম নির্বাচন হওয়ায় একটা ভিন্নতা লাগছে। নিউজ মিডিয়ার মাধ্যমে কে কোন দলের প্রার্থী, সেটা জানতে পারছি।’
প্রযুক্তি ও মাইক ব্যবহারে কড়াকড়ি
নতুন বিধিমালায় প্রযুক্তি ও পরিবেশ সুরক্ষার বিষয়েও কঠোরতা আনা হয়েছে। নির্বাচনি প্রচারে ড্রোন বা কোয়াডকপ্টারের ব্যবহার পুরোপুরি নিষিদ্ধ। দলের সাধারণ সম্পাদক বা সমপর্যায়ের নেতারা হেলিকপ্টার ব্যবহার করতে পারবেন, তবে আকাশ থেকে লিফলেট বা অন্য কোনো প্রচারসামগ্রী ছড়ানো যাবে না।
কোনো ভোটকেন্দ্রের ১৮০ মিটারের মধ্যে ভোটার স্লিপ বিতরণ নিষিদ্ধ করা হয়েছে। স্লিপের আকার সর্বোচ্চ ১২ সেন্টিমিটার গুণ ৮ সেন্টিমিটার নির্ধারণ করা হয়েছে। ভোটার স্লিপ দেওয়ার প্রথার আইনগত ভিত্তিও দেওয়া হয়েছে আচরণবিধিতে। প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থী বা তার পক্ষে অন্য কোনো ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠান ভোটার স্লিপ বিতরণ করতে পারবে। তবে স্লিপে প্রার্থীর নাম, ছবি, পদের নাম ও প্রতীক উল্লেখ করা যাবে না।
মাইক ব্যবহারের ক্ষেত্রেও সময়সীমা নির্ধারণ করা হয়েছে। দুপুর ২টা থেকে রাত ৮টা পর্যন্ত মাইক ব্যবহার করা যাবে এবং শব্দসীমা সর্বোচ্চ ৬০ ডেসিবেল রাখতে হবে।
নির্বাচন কমিশনের বক্তব্য
এ বিষয়ে নির্বাচন কমিশন সচিব আখতার আহমেদ ইউএনবিকে বলেন, পোস্টার ব্যবহার বিষয়ে রাজনৈতিক দলগুলোর কাছ থেকে মতামত নেওয়া হয়েছিল। শুধু একটি রাজনৈতিক দল এর বিরোধিতা করেছে, বাকিরা পোস্টার ব্যবহার বন্ধের বিষয়ে একমত হয়েছেন।
তিনি আরও বলেন, ‘এই নির্বাচনে আমরা বেশিরভাগ রাজনৈতিক দলের সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন করেছি। এ ছাড়া পরিবেশবিদ ও সরকারের পরিবেশ মন্ত্রণালয় থেকেও আপত্তি ছিল। এসব বিষয় বিবেচনায় নিয়ে নির্বাচনে পোস্টার নিষিদ্ধ করা হয়েছে।’