একই মাঠে ৫২ জাতের ধান। কোনো জাতের গাছ লম্বা, কোনোটি শীষের গঠনে আলাদা। কোনো জাত খরাসহিষ্ণু, আবার কোনোটি জলমগ্ন পরিবেশেও টিকে থাকতে পারে।
সারি সারি ধানগাছের পাশে নামফলক দেখে বিভিন্ন জাতের বৈশিষ্ট্য পর্যবেক্ষণ করছেন কৃষকরা। এভাবে ধানের ফলন ও বৈশিষ্ট্য দেখে নিজেদের জমির উপযোগী জাত বেছে নেওয়ার সুযোগ পাচ্ছেন তারা।
সুনামগঞ্জের শান্তিগঞ্জ উপজেলার সদরপুর গ্রামে বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউটের (ব্রি) উদ্যোগে গড়ে তোলা হয়েছে ব্যতিক্রমী এই ‘রাইস গার্ডেন’।
এলএসটিডি প্রকল্পের অর্থায়নে চলতি আমন মৌসুমে স্থাপন করা এ প্রদর্শনীর উদ্দেশ্য, হাওরের জমি ও পরিবেশের উপযোগী ধানের জাত সম্পর্কে কৃষকদের ধারণা দেওয়া এবং উন্নত জাত চাষে তাদের উৎসাহিত করা।
সিলেট-সুনামগঞ্জ আঞ্চলিক মহাসড়কের পাশে গড়ে ওঠা প্রদর্শনীতে রয়েছে উচ্চফলনশীল, স্বল্পমেয়াদি, জিংকসমৃদ্ধ, সুগন্ধি ও উন্নত রান্নার বৈশিষ্ট্যসম্পন্ন বিভিন্ন জাতের ধান। সেই সঙ্গে রয়েছে খরা, বন্যা ও জলমগ্নতা-সহনশীল জাত।
প্রতিটি জাতের পাশে পরিচিতিমূলক সাইনবোর্ড থাকায় কৃষকরা ধানের বৃদ্ধি, গাছের উচ্চতা ও শীষের গঠন সরাসরি পর্যবেক্ষণ করতে পারছেন।
কৃষক সাহেল বলেন, ‘একসঙ্গে এত জাতের ধান জীবনে কখনও দেখিনি। অনেক ধানের নামও আগে শুনিনি। এখন চোখের সামনে এসব ধানের বেড়ে ওঠা দেখছি।’
তিনি আরও বলেন, ‘এখান থেকে দেখে আমাদের জমির জন্য যেটা ভালো ও উচ্চফলনশীল হবে, সেটাই চাষের জন্য বেছে নেব।’
প্রদর্শনীতে আসা অন্য কৃষকরাও জানান, আগে তারা পরিচিত জাতের ধানই বেশি চাষ করতেন। এখানে এসে নতুন নতুন জাত সম্পর্কে জানতে পারছেন।
কোন জাতের ফলন ভালো এবং কোনটি তাদের এলাকার জন্য উপযোগী, তা দেখে সিদ্ধান্ত নিতে পারবেন বলে মনে করছেন তারা।
উপযুক্ত জাত বেছে নিতে পারলে ফলন বাড়বে এবং লাভবান হবেন বলেও আশা কৃষকদের।
ধানের জাত প্রদর্শনের পাশাপাশি রোগবালাই দমন, সুষম সার প্রয়োগ, বায়োকোটেড ইউরিয়া ও সৌরবিদ্যুৎচালিত আলোকফাঁদ ব্যবহার নিয়েও কাজ করছে ব্রির সুনামগঞ্জ আঞ্চলিক কার্যালয়।
কৃষিশ্রমিকের সংকট মোকাবিলায় রাইস ট্রান্সপ্লান্টার, উইডার ও কম্বাইন হারভেস্টারের ব্যবহারও প্রদর্শন করা হচ্ছে।
এছাড়া কৃষকদের প্রশিক্ষণ, পরামর্শ ও বীজ সরবরাহে সহযোগিতা দেওয়া হচ্ছে।
প্রদর্শনীতে রয়েছে ব্রি ধান ১১২, ১১১, ১১০, ১০৯, ১০৩, ৯৫, ৯৪, ৯৩, ৯১, ৯০, ৮০, ৭৯, ৭৮, ৭৭, ৭৬, ৭৫, ৭৩, ৭২, ৭১, ৭০, ৬৬, ৬২, ৫৭, ৫১, ৫২, ৫৩, ৫৪, ৫৬, ৪৯, ৪৬, ৪৪, ৩৮, ৩৯, ৪০, ৪১, ৩৭, ৩৪, ৩৩, ৩২, ৩০ ও ৩১; বিনা ধান ২৫, ২৩, ২২, ১১, ১০, ৫, ৪ ও ৩; এবং হাইব্রিড ধান ৪ ও ৬।
হাওরের কৃষিতে প্রাকৃতিক প্রতিকূলতা মোকাবিলা করে উৎপাদন বাড়ানো বড় চ্যালেঞ্জ। এ ক্ষেত্রে এলাকার পরিবেশের উপযোগী জাত নির্বাচন ও আধুনিক চাষপ্রযুক্তির ব্যবহার গুরুত্বপূর্ণ।
এ প্রদর্শনীর মাধ্যমে কৃষকরা বিভিন্ন জাতের বৈশিষ্ট্য সম্পর্কে সরাসরি ধারণা পাওয়ার পাশাপাশি উন্নত চাষপদ্ধতি সম্পর্কেও জানতে পারছেন।
ব্রি সুনামগঞ্জ আঞ্চলিক কার্যালয়ের প্রধান ও ঊর্ধ্বতন বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ড. মো. রেজওয়ান ভূঁইয়া বলেন, ৫২টি ধানের জাত নিয়ে স্থাপিত রাইস গার্ডেন থেকে কৃষকরা তাদের এলাকার উপযোগী জাত নির্বাচন করতে পারবেন।
এছাড়া সার, আগাছা, রোগবালাই ব্যবস্থাপনাসহ বিভিন্ন প্রযুক্তি নিয়ে গবেষণা চলছে বলেও জানান তিনি।
এসব উদ্যোগ হাওরে ধানের উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি ও দেশের খাদ্যনিরাপত্তায় ভূমিকা রাখবে বলে আশা প্রকাশ করেন ব্রির এই কর্মকর্তা।