গণভোট ও জাতীয় সংসদ নির্বাচন উপলক্ষে রংপুর বিভাগের ৩৩টি আসনে ১ কোটি ৩৪ লাখ ৫৪ হাজার ৪৫৬ ভোটারের জন্য প্রস্তুত করা হয়েছে ৪ হাজার ৫৪৬টি ভোটকেন্দ্র। তবে এর মধ্যে ২ হাজার ৫৬১টি ভোটকেন্দ্রকে ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করেছে প্রশাসন।
ঝুঁকিপূর্ণ ভোটকেন্দ্রগুলোতে কোনো ধরনের অপ্রীতিকর পরিস্থিতি এড়াতে ৬ স্তরের নিরাপত্তাব্যবস্থা গ্রহণ করেছে পুলিশ। এসব কেন্দ্রে গোয়েন্দা নজরদারির পাশাপাশি থাকবে বডি ক্যামেরা পরিহিত পুলিশবাহিনী।
মঙ্গলবার (১০ ফেব্রুয়ারি) দুপুরে রংপুর পুলিশ লাইনসে পুলিশ সদস্যদের নির্বাচনি প্যারেড শেষে জেলা পুলিশ সুপার (এসপি) মারুফাত হুসাইন সাংবাদিকদের এসব তথ্য জানান।
তিনি বলেন, নির্বাচনকে শান্তিপূর্ণ করতে জেলা পুলিশের আওতাধীন ৬৬৯টি কেন্দ্রে পুলিশ মোতায়েনসহ কেন্দ্রের বাইরে ইউনিয়ন ও পৌরসভা এলাকায় ভ্রাম্যমাণ দল, স্ট্রাইকিং ফোর্স, সাব সেক্টর ও সেক্টর ভাগ করে ভোটার, ভোটপ্রত্যাশী ও নির্বাচনে ব্যবহৃত সরঞ্জমাদির নিরাপত্তা দেওয়া হবে। কেন্দ্রগুলোতে গোয়েন্দা পুলিশের নজরদারির পাশাপাশি ৩১৫টি কেন্দ্রে পুলিশের কাছে থাকবে বডি ক্যামেরা।
মারুফাত হুসাইন বলেন, নির্বাচনের মাঠে পুলিশের পাশাপাশি দেশপ্রেমিক সেনাবাহিনী, বিজিবি, এসআইএফ (সাবেক র্যাব), আনসারসহ আইনশৃঙ্খলা বাহিনী কাজ করবে। রংপুর জেলায় ৮৭৩টি ভোটকেন্দ্র রয়েছে। এর মধ্যে জেলা পুলিশের আওতাধীন ৬৬৯টি কেন্দ্র। এসব কেন্দ্রে সিসিটিভি ক্যামেরা স্থাপন করা হয়েছে।
এই পুলিশ কর্মকর্তা আরও বলেন, রংপুর জেলার নির্বাচনি পরিবেশ অত্যন্ত ভালো, এখন পর্যন্ত কোনো বিশৃঙ্খলা হয়নি। আমরা আশা করছি এটি বজায় থাকবে। সেই সঙ্গে ভোটাররা যেন নির্বিঘ্নে ভোটকেন্দ্রে যেতে পারেন, সেটি নিশ্চিত করা হবে।
ঝুঁকিতে ২৫০০ কেন্দ্র, অতিঝুঁকিপূর্ণ ৮২৭টি
পুলিশ সুপার জানান, রংপুর বিভাগের ৩৩টি আসনে ১ কোটি ৩৪ লাখ ৫৪ হাজার ৪৫৬ ভোটারের জন্য প্রস্তুত করা হয়েছে ৪ হাজার ৫৪৬টি ভোটকেন্দ্র। তবে এর মধ্যে ২ হাজার ৫৬১টিকেই ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করেছে প্রশাসন। বিশেষ করে চরাঞ্চল, যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন এলাকা ও কোনো কোনো প্রার্থীর বাড়ির নিকটবর্তী কেন্দ্রগুলো নিয়ে বাড়তি সতর্কতা অবলম্বনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
প্রশাসন সূত্রে জানা যায়, এসব কেন্দ্রে অতীতে ভোটকেন্দ্র দখলের চেষ্টা, সংঘর্ষ, ভয়ভীতি প্রদর্শন ও প্রভাব বিস্তারের অভিযোগ রয়েছে। ফলে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষায় বিশেষ পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছে। ঝুঁকিপূর্ণ এসব কেন্দ্রে এরই মধ্যে বসানো হচ্ছে সিসি টিভি। এছাড়া বাড়তি অস্ত্রধারী পুলিশ, আনসার সদস্য মোতায়েন করা হচ্ছে। থাকছে ভিজিলেন্স টিম ও স্ট্রাইকিং ফোর্স।
পুলিশের রংপুর রেঞ্জ উপ-মহাপুলিশ পরিদর্শক (ডিআইজি) অফিসের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, বিভাগের ৮ জেলার ৩৩টি সংসদীয় আসনে ৩০টি পৌরসভা ও ৫৩৩টি ইউনিয়ন রয়েছে। এর মধ্যে ভোটকেন্দ্র ৪ হাজার ৫৪৬টি। অতিঝুঁকিপূর্ণ ধরা হয়েছে ৮২৭টিকে।
রংপুর রেঞ্জের ডিআইজি আমিনুল ইসলাম বলেন, ঝুঁকিপূর্ণ কেন্দ্রগুলোতে সর্বোচ্চ সতর্কতা নিয়ে দায়িত্ব পালন করবে পুলিশ। প্রতিটি ঝুঁকিপূর্ণ কেন্দ্রে অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন থাকবে। পুলিশ সদস্যদের শরীরে থাকবে বডিওর্ন ক্যামেরা, যার লাইভ মনিটরিং করা হবে ঊর্ধ্বতন পর্যায় থেকে।
রংপুরে ঝুঁকিপূর্ণ কেন্দ্র ২১৬
জেলার ছয়টি সংসদীয় আসনে ৮৭৩টি ভোটকেন্দ্রে এবার জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোট অনুষ্ঠিত হবে। এর মধ্যে ২১৬টি কেন্দ্রকে ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করেছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। বাকি কেন্দ্রগুলো সাধারণ কেন্দ্র হিসেবে বিবেচিত হবে।
ঝুঁকিপূর্ণ কেন্দ্রের মধ্যে রংপুর সিটি করপোরেশন এলাকায় ১২১টি ও ৮ উপজেলায় ৯৫টি ভোটকেন্দ্র রয়েছে। এসব কেন্দ্রে বাড়তি নিরাপত্তা ব্যবস্থা নেওয়ার কথা জানিয়েছে পুলিশ।
পুলিশ সূত্র জানায়, ভোটার সংখ্যা বেশি, ইতোপূর্বে অগ্নিসংযোগ ও ভাঙচুর, সীমানা প্রাচীর না থাকা, প্রার্থী বা রাজনৈতিক দলগুলোর প্রভাবশালী নেতার বাড়িসংলগ্ন কেন্দ্র, দূরবর্তী ও জনবহুল এলাকাসহ বিভিন্ন দিক বিবেচনা করে এসব কেন্দ্র ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।
রংপুর মেট্রোপলিটন পুলিশ (আরপিএমপি) জানিয়েছে, রংপুর জেলার ৬টি সংসদীয় আসনের ৩টি আসনের আংশিক অংশে নির্বাচনি দায়িত্বে থাকবে মেট্রোপলিটন পুলিশ। এসব স্থানের ২০৪টি কেন্দ্রে দায়িত্ব পালনসহ ঝুঁকিপূর্ণ কেন্দ্রে আলাদা নিরাপত্তার ব্যবস্থা করা হয়েছে। এছাড়া নির্বাচনি দায়িত্বে ৩০টি মোবাইল পেট্রোল টিম ও ৭৮টি স্ট্রাইকিং রিজার্ভ ফোর্স কাজ করবে।
এ বিষয়ে রিটার্নিং কর্মকর্তা ও জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ এনামুল আহসান বলেন, রংপুর জেলার সংসদীয় ছয়টি আসনে মোট ভোটার সংখ্যা ২৫ লাখ ৯৯ হাজার ২০২ জন। এর মধ্যে নারী ভোটার ১৩ লাখ ৬ হাজার ৩৩৩ জন এবং পুরুষ ভোটারের সংখ্যা ১২ লাখ ৯২ হাজার ৮৩৮ জন। হিজড়া ভোটার রয়েছেন ৩১ জন। জেলায় মোট ৮৭৩টি কেন্দ্রে ৪ হাজার ৯৮৮টি বুথে ভোটগ্রহণ অনুষ্ঠিত হবে। এতে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের ও স্বতন্ত্র মিলে ৪৪ জন প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন।
প্রস্তুত সেনাবাহিনীর কমান্ডো গ্রুপ
এদিকে রংপুরে যেকোনো ধরনের পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ ও মোকাবিলায় প্রস্তুত রয়েছে সেনাবাহিনীর ৬৬ পদাতিক ডিভিশনের কমান্ডো গ্রুপ। নির্বাচনের দিন বিভাগের প্রত্যন্ত এলাকার যেকোনো কেন্দ্রে বিশৃঙ্খলা ঘটলে তারা হেলি ড্রপ করে পরিস্থিতি মোকাবিলায় কাজ করবেন।
চার জেলায় ৩ হাজার বিজিবি সদস্য মোতায়েন
এ ছাড়াও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ ও শান্তি রক্ষায় রংপুর বিভাগের ৪ জেলায় ৩ হাজার বিজিবি সদস্য মোতায়েন করা হয়েছে।
বিজিবির রংপুর সেক্টর কমান্ডার লেফটেন্যান্ট কর্নেল এসএম শফিকুর রহমান জানান, রংপুর সেক্টরের অধীনে রংপুর, কুড়িগ্রাম, লালমনিরহাট ও গাইবান্ধা জেলায় ২৬টি বেজ ক্যাম্পে ৭৪ প্লাটুন বিজিবি মোতায়েন করা হয়েছে। বিজিবি সদস্যরা নির্বাচনি এলাকার নিশ্ছিদ্র নিরাপত্তা ও চেকপোস্ট স্থাপনসহ মোবাইল ও স্ট্রাইকিং ফোর্স হিসেবে কাজ করছেন। এসব জেলার ঝুঁকিপূর্ণ কেন্দ্রে শান্তি-শৃঙ্খলা বজায় রাখতে বিশেষ নজর দিয়েছে বিজিবি।
নির্বাচনি এলাকায় নিরাপত্তা দিতে বিজিবির তল্লাশি কার্যক্রম চালু রয়েছে। এছাড়া ঝুঁকি বিবেচনায় বিভিন্ন স্থানে ডগ স্কোয়াড স্থাপন করা হয়েছে। টহল ও গোয়েন্দা নজরদারিও বাড়ানো হয়েছে।
এসএম শফিকুর রহমান জানান, রংপুর বিভাগের ৪টি জেলায় ২ হাজার ৫৭২টি ভোটকেন্দ্র রয়েছে। এর মধ্যে ৬০০টি ঝুঁকিপূর্ণ কেন্দ্র। এছাড়া জেলা-উপজেলা পর্যায়ে বিজিবির সমন্বয়ক টিমের প্রতিনিধিরা কাজ করছে।
এদিকে পুলিশ, বিজিবি, সেনাবাহিনী ছাড়াও র্যাব, আনসার ও গ্রাম প্রতিরক্ষা বাহিনী নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করতে কাজ করছে।