সুনামগঞ্জ-৫ (ছাতক–দোয়ারাবাজার) আসনে প্রায় দুই দশক পর ধানের শীষের ঘরে ফেরার লড়াই এখন নির্বাচনি মাঠে সবচেয়ে আলোচিত ইস্যু। একসময় বিএনপির শক্ত ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত এই আসনে ২০০৬ সালের পর আর কোনোদিন বিএনপির দলীয় প্রার্থী বিজয়ী হতে পারেননি। হারানো আসন পুনরুদ্ধারে এবার ভিন্ন কৌশল ও বাড়তি উদ্যমে মাঠে নেমেছে দলটি।
এই প্রত্যাবর্তনের মুখ্য ভরসা বিএনপির কেন্দ্রীয় কমিটির সহ-সাংগঠনিক সম্পাদক ও তিনবারের সাবেক সংসদ সদস্য কলিম উদ্দিন মিলন। শুরুতে তার সবচেয়ে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছিলেন বিএনপির বিদ্রোহী প্রার্থী, সাবেক উপজেলা চেয়ারম্যান মিজানুর রহমান চৌধুরী। তার অনুসারীদের একটি প্রভাবশালী অংশ এলাকায় ‘ধানের শীষে ভোট যাবে না’—এমন গুঞ্জন ছড়িয়ে দেয়, যা দলের ভেতরে অস্থিরতা তৈরি করে।
তবে দলীয় সিদ্ধান্ত ও তারেক রহমানের নির্দেশে মিজানুর রহমান মাঠ ছাড়ার ঘোষণা দেওয়ার পর পুরো সমীকরণই বদলে গেছে। তার পরপরই পরিস্থিতি ঘুরে গেছে মিলনের দিকে। দুই উপজেলা মিলিয়ে প্রায় ২০০টি কেন্দ্রভিত্তিক নির্বাচন পরিচালনা কমিটি গঠন করে মিলনের নির্বাচন পরিচালনা কাঠামো এখন সংগঠিত ও শক্তিশালী হয়ে উঠেছে।
হাটবাজার, চায়ের দোকান, পাড়া–মহল্লা—সর্বত্র ধানের শীষের পক্ষে গণজোয়ার এখন স্পষ্ট। নেতা-কর্মীরা দিন-রাত ব্যস্ত সময় পার করছেন। পরিচ্ছন্ন ভাবমূর্তি, সততা ও রাজনৈতিক পরিপক্বতা মিলনকে আবারও ভোটারদের আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে নিয়ে এসেছে। তিনবার সংসদ সদস্য হিসেবে অর্জিত অভিজ্ঞতা, উন্নয়ন কর্মকাণ্ডে ভূমিকা এবং ব্যক্তিগত সৌজন্য তাকে সাধারণ মানুষের কাছে গ্রহণযোগ্য করে তুলেছে। তরুণ, কৃষক, শ্রমজীবী ও প্রবাসী—সব শ্রেণির মানুষের কাছেই তিনি এখন ‘হৃদয়ের মানুষের’ প্রতীক।
জেলা বিএনপির নেতা নজরুল ইসলাম বলেন, ‘মিলন ভাই মাঠে থাকলে গরিবের দোরগোড়ায় সাহায্য পৌঁছে যায়। তিনি এলাকার সুখ–দুঃখের মানুষ। এবার তিনিই এগিয়ে আছেন।’
দোয়ারাবাজারের কৃষক মুহরম আলী সুমন বলেন, ‘দুই দশক পর মনে হচ্ছে ধানের শীষের সময় এসেছে। মিলনকে আবার সংসদে দেখতে চাই।’
ত্রিমুখী লড়াই, কওমিপন্থী ভোটে টানাপোড়েন
এবারের নির্বাচনে মাঠে ত্রিমুখী লড়াই জমে উঠেছে। ধানের শীষের প্রার্থী কলিম উদ্দিন মিলনের পাশাপাশি আলোচনায় রয়েছেন জামায়াত-ই-ইসলামীর প্রার্থী মাওলানা আব্দুস সালাম আল মাদানী এবং খেলাফত মজলিসের প্রার্থী মাওলানা আব্দুল কাদির। কওমি মাদরাসাভিত্তিক এলাকাগুলোতে তারা সক্রিয় রয়েছেন। বিশেষ করে সালাম আল মাদানীর শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানভিত্তিক ভোটে প্রভাব আছে বলে স্থানীয়দের ধারণা।
তবে রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, প্রার্থীর সংখ্যা যতই থাকুক, মূল প্রতিদ্বন্দ্বিতা হবে ধানের শীষ ও দাঁড়িপাল্লা প্রতীকের প্রার্থীর মধ্যে।
জামায়াত প্রার্থী মাওলানা সালাম আল মাদানী বলেন, ‘যোগাযোগ, শিক্ষা, চিকিৎসা ও কৃষি—এই চারটি সংকট ছাতক–দোয়ারাবাজারের বড় সমস্যা। নির্বাচিত হলে এগুলো সমাধানই হবে আমার প্রথম অগ্রাধিকার।’
কেন্দ্র থেকে গ্রাম—মিলনের অগ্রযাত্রা
বিদ্রোহী ইস্যুর অবসানের পর বিএনপির ভোটব্যাংক আবারও সংগঠিত হচ্ছে। ছাত্রদল, যুবদল, স্বেচ্ছাসেবক দল, শ্রমিক দল ও কৃষক দলের সমন্বিত তৎপরতা মিলনের প্রচারণায় নতুন গতি এনেছে।
কেন্দ্রীয় ছাত্রদলের সাবেক সহ-সম্পাদক রিপন তালুকদার বলেন, ‘মাঠের চিত্র পুরো বদলে গেছে। ছাতক-দোয়ারাবাজারে ধানের শীষের পক্ষে সুবাতাস বইছে। গ্রাম থেকে মহল্লা—সবখানেই মিলনের গণজোয়ার।’
দীর্ঘদিন পর হাড্ডাহাড্ডি ভোটের আবহে সাধারণ ভোটারদের মধ্যেও আগ্রহ বেড়েছে। অনেকেই বলছেন, এবার প্রতীক নয়, প্রার্থী দেখেই ভোট দেবেন। মানুষের পাশে যিনি থাকবেন, তাকেই ভোট দেবেন। স্বার্থান্বেষী গোষ্ঠীর রাজনীতি, প্রতিশ্রুতির ফানুস আর মুখোমুখি দেখাটাই হবে এবার পরীক্ষার জায়গা।
ছাতকের রজব আলী নামের এক বৃদ্ধ ভোটার বলেন, ‘এবার প্রার্থী দেখেই ভোট দেব। যিনি এলাকার কষ্ট বোঝেন, তাকেই সুযোগ দেওয়া উচিত।’
শেষ মুহূর্তের সমীকরণ
ধানের শীষের প্রার্থী কলিম উদ্দিন মিলন বলেন, ‘সারা সুনামগঞ্জজুড়েই ধানের শীষের গণজোয়ার তৈরি হয়েছে। পাঁচটি আসনেই বিএনপির প্রার্থীরা বিজয়ী হবেন—মানুষের সাড়া সেটাই প্রমাণ করে। আগামী ২২ তারিখ থেকে প্রচারণার নতুন অধ্যায় শুরু হলে সিলেটজুড়ে ধানের শীষের ঢেউ দেখা যাবে।’
মনোনয়ন প্রত্যাহারের শেষ দিন ২০ জানুয়ারি পর্যন্ত কিছু পরিবর্তনের সম্ভাবনা থাকলেও, আপাতত মাঠের চিত্র বলছে—দুই দশকের অপেক্ষা ঘোচাতে সুনামগঞ্জ-৫ আসনে ধানের শীষের সবচেয়ে বড় ভরসা কলিম উদ্দিন মিলন। দলীয় ঐক্য, ভোটারদের আগ্রহ ও বিদ্রোহী সংকট কাটিয়ে ওঠার ফলে এই আসনে নির্বাচনি উত্তাপ এখন তুঙ্গে।
পর্যবেক্ষকদের মতে, দুই দশকের খরা কাটিয়ে ধানের শীষের ভাগ্যে সত্যিই বিজয়ের সূর্য উদিত হচ্ছে কি না, তা আগামী কয়েক দিনেই স্পষ্ট হবে।