দেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের হাওরজুড়ে ২৮ এপ্রিল থেকে আকস্মিক বন্যা পরিস্থিতি সৃষ্টির আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। টানা বৃষ্টি ও উজানের পাহাড়ি ঢলের পূর্বাভাসে কৃষকদের মধ্যে উদ্বেগ বাড়ছে। সম্ভাব্য ক্ষতি এড়াতে দ্রুত পাকা বোরো ধান কেটে ঘরে তোলার তাগিদ দিয়েছে পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো)।
বৃহস্পতিবার (২৩ এপ্রিল) সুনামগঞ্জ পাউবোর নির্বাহী প্রকৌশলী মামুন হাওলাদারের সই করা এক বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়, বাংলাদেশ আবহাওয়া অধিদপ্তর ও বৈশ্বিক আবহাওয়া সংস্থাগুলোর আগামী ৭ দিনের (২৩ এপ্রিল হতে ৩০ এপ্রিল) বৃষ্টিপাতের তথ্য অনুযায়ী, দেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের হাওর অববাহিকা ও তৎসংলগ্ন উজানে স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি বৃষ্টিপাতের পূর্বাভাস রয়েছে। সেক্ষেত্রে ২৪-২৬ এপ্রিল হালকা থেকে মাঝারি, ২৭ এপ্রিল মাঝারি হতে ভারী এবং ২৮ থেকে ৩০ এপ্রিল ভারী হতে অতি ভারী বৃষ্টিপাতের পূর্বাভাস রয়েছে।
উক্ত বৃষ্টিপাতের পূর্বাভাস অনুযায়ী, হাওর অববাহিকার প্রধান নদীগুলো (সুরমা-কুশিয়ারা, ধনু-বৌলাই ও ভুগাই-কংস) এবং অন্যান্য উপ-নদীগুলোর পানি সমতল বৃদ্ধি অব্যাহত থাকবে এবং ২৮ এপ্রিল থেকে নদীগুলোর কোথাও কোথাও বিপদসীমার উপর দিয়ে প্রবাহিত হতে পারে।
পাউবোর বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, বর্তমানে সুনামগঞ্জ শহরের ষোলঘর পয়েন্টে সুরমা নদীর পানি সমতল বিপদসীমার ১ দশমিক ৭৬ মিটার বা ৫ দশমিক ৭৭ ফুট নিচে রয়েছে। ফলে ২৮ এপ্রিল থেকে সুনামগঞ্জ জেলায় আকস্মিক বন্যা পরিস্থিতি সৃষ্টির ঝুঁকি রয়েছে। আকস্মিক বন্যা পরিস্থিতি সৃষ্টি হলে সুনামগঞ্জের হাওরের বোরো ফসল ক্ষয়ক্ষতি হওয়ার সম্ভবনা রয়েছে। ফলে কৃষকদের যেসব জমির ৮০ শতাংশ ধান পাকা সেসব জমির ধান দ্রুত কাটার জন্য বিশেষভাবে অনুরোধ করা হচ্ছে।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ইতোমধ্যে জেলার বিভিন্ন হাওরে আগাম জাতের ধান কাটা শুরু হয়েছে। কৃষকরা কঠোর পরিশ্রম করে ধান কেটে বাড়িতে এনে মাড়াই ও শুকানোর কাজে ব্যস্ত সময় পার করছেন। তবে ফসলরক্ষা বাঁধ ভেঙে যাওয়ার আশঙ্কা, শ্রমিক সংকট, ধানের ন্যায্যমূল্য প্রাপ্তির বিষয়গুলো তাদের দুশ্চিন্তা বাড়িয়ে দিয়েছে।
কৃষকদের অভিযোগ, প্রতি বছরই সময়মতো বাঁধ নির্মাণ শেষ না হওয়া ও অনিয়মের কারণে ঝুঁকি থেকে যায়। ‘হাওর বাঁচাও’ আন্দোলনের নেতারাও একই অভিযোগ তুলে বলেছেন, বিপুল অর্থ ব্যয়ে বাঁধ নির্মাণ হলেও কার্যকর সুরক্ষা নিশ্চিত হচ্ছে না। জেলার ১২টি উপজেলায় চলতি মৌসুমে ২ লাখ ২৩ হাজার ৫১১ হেক্টর জমিতে বোরো আবাদ হয়েছে। অনুকূল আবহাওয়া থাকলে প্রায় ১৪ লাখ টন ধান উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে, যার বাজারমূল্য প্রায় ৫ হাজার কোটি টাকা।
এদিকে পাউবো জানিয়েছে, চলতি বছর ১৪৮ কোটি টাকা ব্যয়ে ৭১০টি প্রকল্পের মাধ্যমে ৬০৩ কিলোমিটার ফসলরক্ষা বাঁধ নির্মাণ করা হয়েছে।
কৃষকরা জানান, ধান ভালো হলেও এখন সবচেয়ে বড় শঙ্কা বাঁধের স্থায়িত্ব।
আঙ্গারুলি হাওরের কৃষক জমির মিয়া বলেন, ‘ফসল ভালো, কিন্তু বাঁধ নিয়ে দুশ্চিন্তা কাটছে না।’
খরচার হাওরের কৃষক লতিফ মিয়া বলেন, ‘ধান কাটছি, তবে পাহাড়ি ঢলে বাঁধ না ভাঙলেই বাঁচি।’
সুনামগঞ্জ কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক মোহাম্মদ ওমর ফারুক জানান, এবার জেলায় লক্ষ্যমাত্রার চেয়েও বেশি আবাদ হয়েছে। আশা করছি, কৃষকরা তাদের কষ্টে ফলানো ফসল কেটে গোলায় তুলতে পারবেন।
তিনি আরও বলেন, আমরা কৃষকদের পরামর্শ দিচ্ছি, ধান ৮০ শতাংশ পেকে গেলে তারা যেন দ্রুত কেটে ফেলেন। আমরা সার্বক্ষণিক তাদের পরামর্শ দিচ্ছি।