আজ ইতিহাসের অনন্য অধ্যায় রচনার ১৬ জুলাই। ২০২৪ সালের আজকের এই দিনে কোটা সংস্কার আন্দোলন চলাকালে রংপুরের বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের সামনে পুলিশের গুলিতে শহিদ হন ইংরেজি বিভাগের মেধাবী শিক্ষার্থী ও আন্দোলনের অন্যতম সমন্বয়ক আবু সাঈদ।
এই দিনে দুই হাত প্রসারিত করে পুলিশের সামনে বুক পেতে দেওয়া সাঈদের সেই ভিডিও ও ছবি দেশ-বিদেশে আলোড়ন সৃষ্টি করে এবং একপর্যায়ে ছাত্র-জনতার আন্দোলন গণঅভ্যুত্থানে রূপ দেয়। পতন হয় এ দেশে ‘ফ্যাসিস্ট’ সরকারের । এর মধ্যে দিয়ে দেশ ফিরে পায় এক গণতান্ত্রিক ধারা । সব শ্রেণি-পেশার মানুষ যেন মুক্তির আনন্দে মেতে উঠে ।
তবে দেশ গণতন্ত্র ফিরে পেলেও আজও শহিদ আবু সাঈদ হত্যার প্রধান আসামিগুলোকে গ্রেপ্তার করতে পারেনি সরকার। আর এজন্য সাঈদের বাবা-মা ও সহযোদ্ধার এখন হতাশ। তাদের প্রশ্ন—বিচার কি আদৌ বাস্তবায়ন হবে?
জুলাই গণঅভ্যুত্থানের প্রথম শহিদ আবু সাঈদ হত্যার দায়ে মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় দুইজনকে মৃত্যুদণ্ড ও ২৮ আসামিকে বিভিন্ন মেয়াদে কারাদণ্ড দিয়েছেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল।
গত ৯ এপ্রিল আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২-এর চেয়ারম্যান বিচারপতি নজরুল ইসলাম চৌধুরীর নেতৃত্বাধীন তিন সদস্যের বিচারিক প্যানেল এ রায় ঘোষণা করেন। এই রায় দ্রুত কার্যকর চান শহিদ আবু সাঈদের বাবা-মা ও সহযোদ্ধারা।
আবু সাঈদের বাবা মকবুল হোসেন বলেন, ‘ছেলেটা নাই। খুব দেখতে ইচ্ছে করছে, আজ ওর কথা খুব মনে পড়ছে।’ এভাবেই বলেই হু হু করে কেঁদে ওঠেন তিনি।
চোখের পানি মুছতে মুছতে তিনি বলেন, ‘ছেলেকে তো আর ফিরে পাব না। ওর হত্যার ঘটনায় আদালত যে রায় দিয়েছে, সেই রায় যদি বেঁচে থাকতে দেখতে পেতাম, তাহলে একটু হলেও মনটা সান্ত্বনা পেত।’ এ সময় তিনি মামলার সকল আসামির দ্রুত ফাঁসি দাবি করে রায় কার্যকর চান।
আবু সাঈদের মা মনোয়ারা বেগম বলেন, ‘প্রত্যেকদিন বাবাটার কবরের কাছে যাই, বাবাটার মুখটা খালি ভাসি ওঠে। বিশ্ববিদ্যালয় গেইলে যে কয়দিন আইসে (আসত) না, সেই কয়দিন সকাল-সন্ধ্যা ফোন দিত। এখন আর কেউ ফোন করে বলে না, “মা কেমন আছো।” আদরের ছাওয়া (ছেলে) নাই, বুকে কষ্ট চাপা দিয়া আছি।’
তিনি আরও বলেন, ‘বাবাটা সংসারের হাল ধরার কথা ছিল, মোর (আমার) বাবাটা অনেক বড় চিন্তা থাকি (থেকে) দেশের জন্য জান দিছে। বাবাটাকে যারা মারি (মেরে) ফেলাইছে, সবার ফাঁসি চাই।
গুলিবিদ্ধ আবু সাঈদকে বাঁচাতে সর্বপ্রথম এগিয়ে আসা সিয়াম আহসান আয়ান আক্ষেপ করে বলেন, তিনি সংসারের কথা, বাবা-মা, ভাই-বোনের কথা চিন্তা না করে, নিজের জীবনের কথা চিন্তা না করে দেশের জন্য জীবন উৎসর্গ করলেন। অথচ তার মামলার রায় হতে অনেক সময় লাগল। সেই রায় দ্রুত কার্যকর করতে কোনো পদক্ষেপ দেখছি না। রায়টা দ্রুত কার্যকর হোক—এই প্রত্যাশা করি সরকারের কাছে।
শহিদ আবু সাঈদের সহযোদ্ধা ও বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের শিক্ষার্থী শামসুর রহমান সুমন অভিযোগ করেন, জুলাই বিপ্লবের দুই বছরপূর্তিতে এসেও প্রথম শহিদের মামলার রায় কার্যকর হয় না। রায় হয়েছে, রায়টা দ্রুত কার্যকর হোক—এই কামনা করি।
মিছিলের সামনে থেকে নেতৃত্ব দেন আবু সাঈদ। বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীদের সম্মিলিত বিক্ষোভ মিছিলটি বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে প্রবেশের চেষ্টা করলে এতে পুলিশ ও ছাত্রলীগের নেতা-কর্মীরা বাধা দেয়। একপর্যায়ে তাদের সঙ্গে আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের তুমুল সংঘর্ষ বাঁধে।
রণক্ষেত্রে পরিণত হয় বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাস ও আশপাশের এলাকা। আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের ছত্রভঙ্গ করতে টিয়ার শেল, রাবার বুলেট ও কয়েক রাউন্ড গুলি ছোড়ে পুলিশ। এ সময় আবু সাঈদ একাই অবিচল দাঁড়িয়ে তা মোকাবিলার চেষ্টা করেন।
পুলিশের সামনে বুক উঁচিয়ে দুই হাত প্রসারিত করে দেওয়া আবু সাঈদকে লক্ষ্য করে গুলি ছোড়ে পুলিশ। একসময় গুলিবিদ্ধ হয়ে মাটিতে লুটিয়ে পড়েন তিনি। তাৎক্ষণিকভাবে রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হলে কর্তব্যরত চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন। পরদিন সকালে রংপুরের পীরগঞ্জে বাবনপুর গ্রামের বাড়িতে তাকে দাফন করা হয়।