বরিশাল শের-ই-বাংলা মেডিকেল কলেজ (শেবাচিম) হাসপাতালে নার্সদের দায়িত্ব অবহেলা এবং ভুল চিকিৎসায় দুই রোগীর মৃত্যুর অভিযোগ উঠেছে।
রবিবার (১৫ মার্চ) সকালে হাসপাতালের চতুর্থ তলার নাক-কান-গলা বিভাগের মহিলা ওয়ার্ডে এ ঘটনা ঘটে। এ ঘটনায় জড়িতদের বিরুদ্ধে চাকুরি বিধি অনুযায়ী যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ করার কথা জানিয়েছেন হাসপাতাল প্রশাসন।
নিহতরা হলেন— বরিশাল মেট্রোপলিটন এলাকার সারসী গ্রামের মৃত বাবুল হাওলাদারের স্ত্রী হেলেনা বেগম (৪৮) এবং পটুয়াখালীর কলাপাড়া ইউনিয়নের মহিপুর থানাধীন ডাবলুগঞ্জ ইউনিয়নের মন্নান তালুকদারের স্ত্রী শেফালি বেগম (৬০) ।
হাসপাতালের প্রশাসনিক শাখা ও নাক-কান গলা ওয়ার্ডের সংশ্লিষ্ট সূত্র থেকে জানা যায়, ওই ওয়ার্ডে চিকিৎসা নিতে গত ২৩ ফেব্রুয়ারি ভর্তি হন হেলেনা বেগম এবং ৮ মার্চ ভর্তি হন শেফালি বেগম। এর মধ্যে হেলনা বেগম থাইরয়েডে আক্রান্ত ছিলেন এবং শেফালি বেগম মুখের ভেতর টিউমার অপসারণ করার জন্য ভর্তি হন।
নিহতদের স্বজনরা জানান, আজ (রবিবার) সকালে তাদের উভয়ের শরীরে অস্ত্রোপচারের জন্য কিছু ইনজেকশন দেন নার্সরা। এরপরই তাদের শরীরে কিছু সমস্যা দেখা দেয় এবং কিছু সময় বাদে দুজনেরই মৃত্যু হয়।
হেলেনার ছেলে ইব্রাহিম বলেন, নার্স ইনজেকশন দেওয়ার পরই আমার সুস্থ মা অসুস্থ হয়ে যান এবং মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েন। বিষয়টি আমরা হাসপাতাল প্রশাসনকে জানিয়েছি।
তিনি আরও বলেন, ‘আমরা কোনো মামলায় যাচ্ছি না। একে তো আমরা মা হারিয়েছি, তার ওপর মামলা দিয়ে আর হয়রান হতে চাই না।’
অপরদিকে, শেফালি বেগমের মেয়ে খাদিজা বেগম বলেন, আমার মা সুস্থ ছিলেন, কিন্তু সকালে নার্স এসে কয়েকটা ইনজেকশন দেওয়ার পরই অসুস্থ হয়ে পড়েন। বিষয়টি নার্সদের জানানো হলেও তারা কোনো ভ্রূক্ষেপ করেননি, সুস্থ করার জন্য কোনো উদ্যোগ নেননি। চোখের সামনে সুস্থ মা অসুস্থ হয়ে মুহূর্তেই মারা গেলেন, আর মায়ের মৃত্যুর পরে নার্সদের টনক নড়ে। আমি এ ঘটনার সুষ্ঠু বিচার চাই এবং দোষীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি চাই।
এদিকে উভয়ের স্বজনরা বলছেন, হাসপাতাল পরিচালক ঘটনার পর ওয়ার্ডে যান। প্রাথমিকভাবে খতিয়ে দেখে তিনি বিষয়টি যে নার্সদের অবহেলা তা নিশ্চিতও হয়েছেন। আমরা তার কাছেই বিচারের দায়িত্ব তুলে দিয়েছি। বিচার না হলে ভবিষ্যতে এ রকম ঘটনা অন্য রোগীর সঙ্গে ঘটবে এবং অন্য কোনো সন্তান তার মাকে অকালে হারাবে।
এ বিষয়ে ওয়ার্ডে দায়িত্বরত নার্স হেলেন অধিকারী নিজেকে অসুস্থ দাবি করে বলেন, তিনি ইনজেকশনের কোনো ভায়েল ভাঙেননি, ভেঙেছেন মলিনা হালদার। তাই তিনি এ বিষয়ে কিছু জানেন না, শুধু ইনজেকশন পুশ করেছেন দুজন রোগীর শরীরে। তবে মৃত ওই দুই রোগীর সঙ্গে যা ঘটেছে তা দুঃখজনক এবং তাদের সঙ্গে অন্যায় হয়েছে বলে জানান তিনি।
মলিনা হালদার বলেন, নিয়ম মেনে চিকিৎসকের ব্যবস্থাপত্র অনুযায়ী অপারেশন থিয়েটারে যাওয়ার আগে যেসব ইনজেকশন দেওয়ার কথা, তাই দিয়েছি। পরে রোগী দুজনের অবস্থা খারাপ হলে কর্তব্যরত চিকিৎসককে মোবাইলে বিষয়টি জানান বলে দাবি করেন তিনি।
তিনি আরও বলেন, ওই সময় কর্তব্যরত চিকিৎসক যে ধরনের ইনজেকশন দিতে বলেছেন, তাই দিয়েছি। কোনো রোগী মৃত্যুবরণ করুক সেটা আমরা চাই না। গত ২৬ বছরে কোনো ভুল করিনি, এবার এমন হলো কীভাবে তা বুঝতে পারছি না।
এ বিষয়ে বরিশাল শেবাচিম হাসপাতালে দায়িত্বপ্রাপ্ত নার্সিং তত্ত্বাবধায়ক খাদিজা বেগম বলেন, সকালে হাসপাতালে এসেই বিষয়টি শুনতে পেয়েছি। কীভাবে কী হয়েছে তা এখনও সঠিকভাবে জানতে পারিনি।
কোনো রোগীর মৃত্যু কাম্য নয় জানিয়ে তিনি বলেন, একই ওয়ার্ডে দুজন রোগীর মৃত্যু অবশ্যই দায়িত্বে অবহেলা। এ ঘটনায় হাসপাতাল পরিচালক যে ব্যবস্থা নেবেন তাতে আমাদের পূর্ণ সমর্থন থাকবে এবং সার্বিক সহযোগিতাও করব।
এই বিষয়ে হাসপাতাল পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল ডা. এ কে এম মশিউল মুনীর বলেন, আজ ওই দুই রোগীরই শরীরের অস্ত্রোপচার হওয়ার কথা ছিল। এক্ষেত্রে কিছু ওষুধ রয়েছে, যেগুলো অপারেশন থিয়েটারে নেওয়ার আগে দিতে হয় এবং কিছু ওষুধ অপারেশন থিয়েটারে নেওয়ার পর দিতে হয়। অ্যানেসথেটিক ড্রাগ দেওয়ার পরে রোগীর এমন কিছু পরিবর্তন ঘটে যা মেশিনের মাধ্যমে কাজ করাতে হয়, কিন্তু ওই ওষুধ সেবিকারা অপারেশন থিয়েটারে না নিয়ে আগে ওয়ার্ডে বসে দিয়েছেন। ফলে কিছু সময় পরে রোগীরা মৃত্যুবরণ করেন। এটি অবশ্যই পেশাদারত্বে জায়গা থেকে দায়িত্ব অবহেলা এবং শাস্তিযোগ্য অপরাধ।
তিনি বলেন, দায়িত্ব অবহেলা, খামখেয়ালিপনা তো অবশ্যই আছে। বিষয়টি নিয়ে আমরা বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য স্বাস্থ্য অধিদপ্তরকে জানিয়েছি। সেই সঙ্গে রোগীর স্বজনরা ইচ্ছে করলে মামলাও দিতে পারেন। সেক্ষেত্রে স্বজনদের সহযোগিতা করা হবে। আর ঘটনাটি ভুল হোক বা যাই হোক, শক্তভাবে দেখা না হলে ভবিষ্যতে আবার পুনরাবৃত্তি ঘটবে।