সিলেটে আদালত চত্বরে শিশু ফাহিমা ধর্ষণচেষ্টা ও হত্যা মামলার প্রধান আসামি জাকির হোসেনের ওপর আবারও হামলা হয়েছে। হামলাকারীরা এ সময় জাকিরকে মারধর করেন। পরে পুলিশ লাঠিচার্জ করে তাদের সরিয়ে দেয়।
বৃহস্পতিবার (২৩ জুলাই) সকালে জাকিরকে সিলেট নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালে নেওয়ার সময় আদালত প্রাঙ্গণেই এ হামলার ঘটনা ঘটে।
এর আগে, ২৩ জুন একইভাবে আদালত চত্বরে জাকিরকে মারধর করেন ফাহিমার স্বজন ও প্রতিবেশিরা।
আদালত সূত্রে জানা যায়, আজ (বৃহস্পতিবার) সকাল ১০টার দিকে পুলিশের প্রিজন ভ্যানে করে কারাগার থেকে জাকিরকে আদালতে আনা হয়। আগে থেকেই আদালত চত্বরে অপেক্ষায় ছিলেন শিশু ফাহিমার স্বজন ও প্রতিবেশিরা। প্রিজন ভ্যান থেকে জাকিরকে আদালত ভবনে নেওয়ার সময় তারা সংঘবদ্ধ হামলা চালান। এ সময় পুলিশের হেফাজতে থাকা জাকিরকে মারধর করেন তারা। পরে পুলিশ লাঠিচার্জ করে হামলাকারীদের সরিয়ে দেয়।
তবে হামলায় সম্পৃক্ততার অভিযোগ অস্বীকার করে ফাহিমার এক চাচা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, আমরা রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবীর ওপর ক্ষুব্ধ। তিনি আসামিদের পক্ষে কথা বলছেন। এতে ন্যায়বিচার নিয়ে আমরা শঙ্কিত।
বারবার আদালত চত্বরে হামলার ঘটনায় পুলিশের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন ওঠেছে।
তবে সিলেট মহানগর পুলিশের অতিরিক্ত উপ কমিশনার মো. মনজুরুল আলম বলেন, জাকিরকে যথেষ্ট পুলিশি পাহারার মাধ্যমেই আদালতে আনা-নেওয়া করা হয়। তারপরও কীভাবে হামলার ঘটনা ঘটল, আমি খোঁজ নিয়ে দেখছি।
মামলার বিবরণে উল্লেখ করা হয়, গত ১১ মে রাতে ফাহিমাকে ধর্ষণচেষ্টা ও হত্যার অভিযোগে তার প্রতিবেশী জাকির হোসেনকে (৩০) গ্রেপ্তার করে পুলিশ। গ্রেপ্তারের পর থেকে তিনি সিলেট কেন্দ্রীয় কারাগারে আটক রয়েছেন।
এদিকে, শিশু ফাহিমা ধর্ষণচেষ্টা ও হত্যার ঘটনার মাত্র এক মাস পাঁচ দিনের মাথায় আদালতে অভিযোগপত্র দাখিল করা হয়েছে।
অভিযোগপত্রে ধর্ষণচেষ্টা ও হত্যার দায়ে জাকির হোসেনকে অভিযুক্ত করা হয়েছে। আর মরদেহ গুমে সহযোগিতার অভিযোগে আসামি করা হয়েছে তার দুই ভাই জয়নাল ও কালামকে। অভিযুক্তরা ফাহিমার প্রতিবেশী ও সম্পর্কে চাচা। তাদের মধ্যে জাকিরকে ঘটনার পরই গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। পরে বিক্ষুব্ধ এলাকাবাসী দুই দফা জাকিরদের বাড়ি ভাঙচুর করে।
নিহত ফাহিমা আক্তার (৪) সিলেট সদর উপজেলার কান্দির গাঁও ইউনিয়নের সোনাতলা গ্রামের দিনমজুর রাইসুল হকের মেয়ে ছিল।
হত্যার ঘটনায় গ্রেপ্তার মো. জাকির হোসেন (৩০) একই গ্রামের পশ্চিম পাড়া ধন রায়ের চক এলাকার বাসিন্দা।
মামলার এজাহার সূত্রে আরও জানা গেছে, গত ৬ মে বাড়ি থেকে নিখোঁজ হয় শিশু ফাহিমা। এর দুদিন পর গত ৮ মে ভোর ৪টার দিকে ফাহিমার মরদেহ ঘরের সামনে নুরুল হক নামের একজনের মালিকানাধীন ডোবায় ফেলে পানিতে ডুবিয়ে রাখার চেষ্টা করেন জাকির। পরে মরদেহ ডোবার পানিতে ভেসে ওঠায় আসামি মরদেহটি পানি থেকে তুলে ডোবার পশ্চিম পাশে উঠানের পূর্ব পাশে বাঁশ ও নারিকেল গাছের নিচে রেখে দেন। এরপর স্থানীয়দের সহযোগিতায় পুলিশ মরদেহ উদ্ধার করে ওসমানী মেডিকেল কলেজ মর্গে পাঠায়।
গ্রেপ্তারের পর পুলিশের কাছে ও আদালতে ১৬৪ ধারায় এ ঘটনার লোমহর্ষক বর্ণনা দেন জাকির।
তবে, সম্প্রতি আদালতে তোলার সময় উপস্থিত গণমাধ্যমকর্মীদের কাছে জাকির অভিযোগ করেছেন, পুলিশ জোর করে তার জবানবন্দি আদায় করে।
এর আগে, গত ১২ মে জাকিরকে গ্রেপ্তারের পর সংবাদ সম্মেলনে সিলেট মহানগর পুলিশের উপ-কমিশনার (উত্তর) মোহাম্মদ সাইফুল ইসলাম জানান, ৬ মে সকালে ফাহিমাকে একটি দোকান থেকে সিগারেট এনে দিতে পাঠানো হয়। শিশুটি সিগারেট এনে দেওয়ার পর তাকে নিজের ঘরে ডেকে নেন জাকির। এ সময় তার স্ত্রী বাড়িতে ছিলেন না। ঘরের দরজা বন্ধ করে শিশুটিকে ধর্ষণের চেষ্টা করা হয় বলে জিজ্ঞাসাবাদে জানায় আসামি। তবে ধর্ষণ সংঘটিত হয়েছিল কি না, তা মেডিকেল প্রতিবেদন হাতে পাওয়ার পর নিশ্চিত হওয়া যাবে বলে জানায় পুলিশ।
পুলিশের দাবি, আসামির জবানবন্দি অনুযায়ী, একপর্যায়ে শিশুটি অজ্ঞান হয়ে গেলে তাকে গলা টিপে হত্যা করা হয়। মরদেহ প্রথমে ঘরের ভেতরে একটি ব্রিফকেসে লুকিয়ে রাখা হয়। এলাকায় খোঁজাখুঁজি শুরু হলে পরে মরদেহ সরিয়ে বাড়ির পেছনে রাখা হয়। সেখান থেকে দুর্গন্ধ বের হতে শুরু করলে গভীর রাতে পাশের একটি ডোবায় মরদেহ ফেলে দেওয়ার চেষ্টা করা হয়। তবে মরদেহ পানিতে না ডোবায় পাশেই রেখে পালিয়ে যান অভিযুক্ত জাকির।
সংবাদ সম্মেলনে আরও জানানো হয়, অভিযুক্তের দেখানো মতে হত্যাকাণ্ডে ব্যবহৃত চাদর ও ব্রিফকেস উদ্ধার করেছে পুলিশ। এসব আলামত জব্দ করে তদন্তের অংশ হিসেবে পরীক্ষা করা হবে। এই হত্যার ঘটনায় সিলেটজুড়ে ব্যাপক চাঞ্চল্য সৃষ্টি হয়। ফাহিমা হত্যাকারীদের বিচার দাবিতে আন্দোলনে নামেন স্থানীয়রা।
স্থানীয় সংসদ সদস্য ও বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির এবং বিরোধী দলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমান ফাহিমার বাড়িতে গিয়ে দ্রুত বিচারের আশ্বাস দেন।