দেশের প্রাকৃতিক ভারসাম্য রক্ষা এবং হাওর ও জলাভূমি সংরক্ষণে কঠোর অবস্থান নিয়েছে সরকার। বুধবার (১৪ জানুয়ারি) রাতে জারি করা হয়েছে ‘বাংলাদেশ হাওর ও জলাভূমি সংরক্ষণ অধ্যাদেশ, ২০২৬।’
এই অধ্যাদেশের মাধ্যমে হাওর ও জলাভূমি উন্নয়ন অধিদপ্তরকে শক্তিশালী করার পাশাপাশি জলাভূমি দখল, ভরাট এবং পরিবেশের ক্ষতিসাধনকারীদের জন্য জেল ও মোটা অঙ্কের জরিমানার বিধান রাখা হয়েছে।
অধিদপ্তরের নতুন ক্ষমতা ও মহাপরিকল্পনা
নতুন এই আইনের আওতায় হাওর ও জলাভূমি উন্নয়ন অধিদপ্তরকে সুনির্দিষ্ট কার্যাবলী বুঝিয়ে দেওয়া হয়েছে। জেলা প্রশাসকদের তালিকার ভিত্তিতে সরকার গেজেট প্রকাশের মাধ্যমে হাওর ও জলাভূমির চূড়ান্ত তালিকা প্রকাশ করবে। ‘মহাপরিকল্পনা’ প্রণয়ন করবে, যা জলাভূমির সুরক্ষা ও সমন্বিত ব্যবস্থাপনায় কাজ করবে। যেকোনো উন্নয়ন প্রকল্প গ্রহণের আগে এখন থেকে হাওড় ও জলাভূমি উন্নয়ন অধিদপ্তরের মতামত নেওয়া বাধ্যতামূলক করা হয়েছে।
সরকার চাইলে বিশেষ সুরক্ষার প্রয়োজনে যেকোনো হাওর বা জলাভূমিকে ‘সংরক্ষিত এলাকা’ হিসেবে ঘোষণা করতে পারবে। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের মতামতের ভিত্তিতে এই প্রক্রিয়া সম্পন্ন হবে বলে অধ্যাদেশে জানানো হয়েছে।
অপরাধ ও দণ্ড
নতুন এই অধ্যাদেশে হাওর ও জলাভূমি রক্ষায় অপরাধের ধরনভেদে কঠোর শাস্তির ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। বিশেষ করে, যারা অবৈধভাবে হাওর ও কান্দার জমি দখল, ভরাট, অননুমোদিত খনন কিংবা জলাভূমির পানির স্বাভাবিক প্রবাহ ব্যাহত করে কোনো অবকাঠামো নির্মাণ করবেন, তাদের জন্য অনধিক ২ বছরের কারাদণ্ড অথবা সর্বোচ্চ ১০ লাখ টাকা অর্থদণ্ড কিংবা উভয় দণ্ডের বিধান রাখা হয়েছে। একই সাজা কার্যকর হবে যদি কেউ যথাযথ কর্তৃপক্ষের অনুমতি ছাড়া মাটি, বালু, পাথর বা অন্য কোনো প্রাকৃতিক সম্পদ আহরণ করেন।
মৎস্য ও জলজ প্রাণী রক্ষায়ও সরকার শূন্য সহনশীলতা নীতি গ্রহণ করেছে। নিষিদ্ধ জাল, বিষটোপ বা বৈদ্যুতিক শক দিয়ে মাছ ধরা এবং হাওর এলাকার পরিযায়ী পাখি শিকার বা জলাবন ধ্বংস করলে অপরাধীকে ২ বছরের জেল ও ৫ লাখ টাকা পর্যন্ত জরিমানা করা হতে পারে।
এছাড়া, যদি মাছের প্রজনন বিঘ্নিত হয় এমনভাবে প্রাকৃতিক সম্পদ আহরণ করা হয়, তবে তার জন্য ১ বছরের জেল বা ৫ লাখ টাকা জরিমানার বিধান রাখা হয়েছে।
পরিবেশ দূষণ রোধে এই আইনে বলা হয়েছে, যদি কেউ এমন কোনো কাজ করেন যার ফলে হাওরের পানি ও মাটি দূষিত হয়, তবে তাকে ২ বছরের কারাদণ্ড বা ২ লাখ টাকা অর্থদণ্ড প্রদান করা হবে।
এ ছাড়াও, অধিদপ্তরের জারি করা কোনো বিশেষ সুরক্ষা আদেশ বা নির্দেশনা লঙ্ঘন করলে এবং সংরক্ষিত এলাকা হিসেবে ঘোষিত জায়গায় বিধিনিষেধ অমান্য করলেও দোষী ব্যক্তিকে ২ বছরের জেল ও ৫ থেকে ১০ লাখ টাকা পর্যন্ত অর্থদণ্ড ভোগ করতে হবে।
যদি কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের কারণে জলাভূমির প্রতিবেশ ব্যবস্থার ক্ষতি হয়, তবে অধিদপ্তরের মহাপরিচালক সেই ক্ষতির পরিমাণ নির্ধারণ করে তা আদায়ের নির্দেশ দিতে পারবেন। একইসঙ্গে ক্ষতিগ্রস্ত এলাকা সংশোধনের জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশও দিতে পারবেন, যা পালন করা বাধ্যতামূলক।
বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, এই অধ্যাদেশ বাস্তবায়িত হলে দেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের হাওর ও জলাশয়গুলোর জীববৈচিত্র্য রক্ষা পাবে এবং অবৈধ দখলদারদের দৌরাত্ম্য কমবে।