বিগত তিন বছরে দেশের অভ্যন্তরীণ ও বৈশ্বিক নানা চ্যালেঞ্জের কারণে দেশে ৪০০টির বেশি পোশাক কারখানা বন্ধ হয়ে গেছে বলে জানিয়েছেন বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির।
বৃহস্পতিবার (৩ সেপ্টেম্বর) জাতীয় সংসদে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর সংসদ সদস্য মো. রুহুল আমিনের এক প্রশ্নের লিখিত জবাবে মন্ত্রী এ তথ্য জানান।
বাণিজ্যমন্ত্রী বলেন, ‘২০২৩ সালের জুলাই থেকে ২০২৬ সালের জুন পর্যন্ত বাংলাদেশ গার্মেন্টস ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিজিএমইএ) সদস্য ২৮২টি ও বাংলাদেশ নিটওয়্যার ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিকেএমইএ) সদস্য ১২০টি কারখানা বন্ধ হয়েছে।’
বিজিএমইএর ২২ জুন প্রকাশিত একটি প্রতিবেদনের কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, কারখানাগুলো বন্ধ হওয়ার পেছনে আটটি প্রধান কারণ রয়েছে। এগুলো হলো—কোভিড-১৯ মহামারি; রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ; মধ্যপ্রাচ্যে ইসরায়েল-ফিলিস্তিন সংঘাত ও যুক্তরাষ্ট্র-ইরান সংঘাত; বৈশ্বিক অর্থনৈতিক মন্দা; বাংলাদেশে রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা; অর্থ পাচারের কারণে ব্যাংকিং খাতে তারল্য সংকট; ভারত, ভিয়েতনাম ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের মধ্যে মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি; এবং সহজে সরাসরি তদারকি করতে চাওয়ার কারণে বিদেশি ক্রেতাদের ছোট ও মাঝারি কারখানায় ক্রয়াদেশ দিতে অনীহা।
বৈশ্বিক পোশাক বাজারে বাংলাদেশের অংশীদারত্ব ধরে রাখতে সরকার বিভিন্ন পদক্ষেপ নিচ্ছে বলেও জানান মন্ত্রী। তবে তিনি সতর্ক করে বলেন, বাংলাদেশ স্বল্পোন্নত দেশের (এলডিসি) তালিকা থেকে উত্তরণের পর উন্নত দেশগুলোর দেওয়া বিভিন্ন বাণিজ্য সুবিধার আওতায় অগ্রাধিকারমূলক বাজারসুবিধা হারাবে, যার ফলে ১৭ দশমিক ৫ বিলিয়ন ডলারের রপ্তানি ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির বলেন, বাংলাদেশ ইতোমধ্যে জাপানের সঙ্গে অর্থনৈতিক অংশীদারত্ব চুক্তি (ইপিএ) সই করেছে এবং দক্ষিণ কোরিয়ার সঙ্গে ব্যাপক অর্থনৈতিক অংশীদারত্ব চুক্তি (সিইপিএ) নিয়ে আলোচনা করছে।
তিনি আরও বলেন, ইউরোপীয় ইউনিয়ন, আঞ্চলিক সমন্বিত অর্থনৈতিক অংশীদারত্ব (আরসিইপি) জোটভুক্ত দেশগুলো, সংযুক্ত আরব আমিরাত, সিঙ্গাপুর, ইন্দোনেশিয়া, চীন ও অন্যান্য সম্ভাবনাময় রপ্তানি বাজারের সঙ্গে ইপিএ, সিইপিএ বা মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি সইয়ের উদ্যোগও চলছে।
বিএনপির সংসদ সদস্য মো. জাহান্দার আলী মিহার আরেক প্রশ্নের জবাবে বাণিজ্যমন্ত্রী বলেন, ২০২৬-২৭ অর্থবছরে পোশাক খাতের রপ্তানি আয়ের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে ৪৪ দশমিক ৫০৫ বিলিয়ন ডলার। চলতি বছরের জুলাইয়ে এ খাত থেকে ৩ দশমিক ৮৮৬৭২ বিলিয়ন ডলার আয় হয়েছে।
এছাড়া জামায়াতের সংসদ সদস্য আবদুল বাতেনের এক সম্পূরক প্রশ্নের জবাবে মন্ত্রী বলেন, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের বাণিজ্য ঘাটতি আরও বেড়েছে। বর্তমানে দুই দেশের দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্যের পরিমাণ প্রায় ১৩ বিলিয়ন ডলার বলেও জানান তিনি।
তিনি আরও বলেন, ওই সময়ে বাংলাদেশ ভারত থেকে ১ দশমিক ৮৯ বিলিয়ন ডলারের পণ্য রপ্তানি করেছে। বাকি অংশ ছিল প্রতিবেশী দেশটি থেকে আমদানি।
চীনের সঙ্গেও বাংলাদেশের উল্লেখযোগ্য বাণিজ্য ঘাটতি রয়েছে উল্লেখ করে বাণিজ্যমন্ত্রী বলেন, তবে সরকার কোনো একটি দেশের সঙ্গে বাণিজ্য ঘাটতি আলাদাভাবে মোকাবিলার পরিবর্তে সামগ্রিক রপ্তানি সক্ষমতার দিকে গুরুত্ব দিতে চায়।
তিনি আরও বলেন, ‘আমাদের লক্ষ্য হওয়া উচিত সামগ্রিক রপ্তানি সক্ষমতা বাড়ানো।’
তিনি জানান, রপ্তানি বাড়ানোর সম্ভাবনা রয়েছে—এমন খাত হিসেবে চামড়া, পাট, জাহাজ নির্মাণ, লাইট ইঞ্জিনিয়ারিং ও সেমিকন্ডাক্টরকে সরকার চিহ্নিত করেছে। এসব খাতের রপ্তানি সক্ষমতা জোরদার করতে নীতিগত সহায়তা ও নতুন বিনিয়োগ আকর্ষণের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।
ভারতের বাজারে বাংলাদেশের রপ্তানি বাড়ানোর সুযোগ রয়েছে জানিয়ে মন্ত্রী আরও বলেন, ভারতের পক্ষ থেকে কিছু বাধা রয়েছে। তবে গত দুই বছরে দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্যে বাংলাদেশও কিছু বাধা তৈরি করেছে।
মুক্তাদির জানান, সম্প্রতি ভারতের একটি ব্যবসায়ী প্রতিনিধিদল বাংলাদেশে সফর করেছে এবং অবকাঠামো উন্নয়নে বাংলাদেশি ব্যবসায়ীদের সঙ্গে একটি টাস্কফোর্স গঠনের প্রস্তাব দিয়েছে। সরকার এই প্রস্তাবে আগ্রহ দেখিয়েছে।
ভারত থেকে বাংলাদেশের বেশি আমদানির কারণ ব্যাখ্যা করে মন্ত্রী বলেন, এসব আমদানির বেশির ভাগই করেছে বেসরকারি খাত, সরকার নয়। ব্যবসায়ীরা যেসব উৎস থেকে প্রতিযোগিতামূলক দামে পণ্য পেতে পারেন, সেখান থেকেই আমদানি করেন বলে তিনি জানান।
বিএনপির সংসদ সদস্য লুৎফুর রহমানের এক প্রশ্নের জবাবে মন্ত্রী সংসদে যে পরিসংখ্যান উপস্থাপন করেন, তাতে দেখা যায়, ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের বাণিজ্য ঘাটতি ২০২১ অর্থবছরে ছিল ৭ দশমিক ৩১৪ বিলিয়ন ডলার, ২০২২ অর্থবছরে ১১ দশমিক ৬৯৯ বিলিয়ন ডলার, ২০২৩ অর্থবছরে ৭ দশমিক ৭১৭ বিলিয়ন ডলার, ২০২৪ অর্থবছরে ৭ দশমিক ৪৩১ বিলিয়ন ডলার ও ২০২৫ অর্থবছরে ৭ দশমিক ৮৬০ বিলিয়ন ডলার।
এছাড়া চট্টগ্রাম-১৩ আসনের সংসদ সদস্য সারওয়ার জামাল নিজামের এক প্রশ্নের জবাবে মুক্তাদির বলেন, ভোজ্যতেলের চাহিদা মেটাতে বাংলাদেশ প্রায় পুরোপুরি আমদানিনির্ভর। তিনি বলেন, বর্তমানে দেশে বছরে আনুমানিক ২২ লাখ থেকে ২৫ লাখ টন ভোজ্যতেলের প্রয়োজন হয়।