বাংলাদেশে নিযুক্ত ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) রাষ্ট্রদূত ও প্রতিনিধিদলের প্রধান মাইকেল মিলার বলেছেন, জ্বালানি নিরাপত্তা একটি সংজ্ঞায়িত ইস্যু। আর এই কারণেই একটি কৌশলগত অগ্রাধিকার হিসেবে নবায়নযোগ্য জ্বালানি প্রসারের প্রচেষ্টাকে ত্বরান্বিত করতে কাজ করছে ইইউ ও বাংলাদেশ।
সেমাবার (২০ এপ্রিল) ঢাকায় আয়োজিত ‘বাংলাদেশে নবায়নযোগ্য জ্বালানির প্রসার, নকশা থেকে বাস্তবায়ন’ শীর্ষক এক উচ্চপর্যায়ের অনুষ্ঠানে বক্তব্য দেওয়ার তিনি এ কথা বলেন। ইউরোপীয় ইউনিয়নের ব্যাংক, ইউরোপীয় ইনভেস্টমেন্ট ব্যাংক, ঢাকাস্থ ইউরোপীয় ইউনিয়ন প্রতিনিধিদল এবং বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ের বিদ্যুৎ বিভাগের যৌথ অংশীদারত্বে এই অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়।
এতে বাংলাদেশ সরকার, ইউরোপীয় ইউনিয়ন, ইউরোপীয় ইনভেস্টমেন্ট ব্যাংক, টিম ইউরোপ, অন্যান্য আন্তর্জাতিক অংশীদার, আর্থিক প্রতিষ্ঠান, নিয়ন্ত্রক সংস্থা এবং বেসরকারি খাতের জ্যেষ্ঠ প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন।
রাষ্ট্রদূত বলেন, আজ আমরা যা দেখছি তা হলো বাংলাদেশের জ্বালানি নিরাপত্তা এবং বিনিয়োগযোগ্যতা নিশ্চিত করার জন্য আমাদের সম্মিলিত সংকল্প।
তিনি জানান, বাংলাদেশ রিনিউয়েবল এনার্জি ফ্যাসিলিটি (বিআরইএফ) হলো ইইউর গ্লোবাল গেটওয়ের একটি অন্যতম উদ্যোগ, যা বিশ্বজুড়ে আমাদের অংশীদারদের সঙ্গে নিরাপদ, টেকসই এবং বিশ্বস্ত নেটওয়ার্ক ও সংযোগের উন্নয়নকে উৎসাহিত করে।
ঢাকাস্থ ইইউ দূতাবাস আজ (মঙ্গলবার) জানিয়েছে, জ্বালানি খাতে ইইউ গ্লোবাল গেটওয়ের একটি প্রধান উদ্যোগ বিআরইএফের অধীনে এটি আয়োজন করা হয়েছিল। এই উদ্যোগটি বাংলাদেশের জ্বালানি নিরাপত্তা, জলবায়ু লক্ষ্যমাত্রা এবং পরিবেশবান্ধব রূপান্তরকে এগিয়ে নিতে বৃহৎ পরিসরে নবায়নযোগ্য জ্বালানি বিনিয়োগ ত্বরান্বিত করছে।
সরকারি খাতের জন্য ইইউর আর্থিক অবদানের পরিমাণ ৩৯৫ মিলিয়ন ইউরো। এর মধ্যে রয়েছে ৩৫০ মিলিয়ন ইউরোর সার্বভৌম ইইউ-গ্যারান্টিযুক্ত ইআইবি ঋণ এবং ৪৫ মিলিয়ন ইউরোর ইইউ ব্লেন্ডিং গ্রান্ট (অনুদান)। এই অনুদানের মধ্যে ৬ মিলিয়ন ইউরো রাখা হয়েছে প্রকল্পের ব্যাংকযোগ্যতা নিশ্চিত করতে এবং ঝুঁকি কমাতে।
এছাড়া জার্মানি ৫০ মিলিয়ন ইউরো অর্থায়ন করছে। সেই সঙ্গে ১ দশমিক ৫ মিলিয়ন ইউরোর কারিগরি সহায়তা প্রদান করছে।
বিআরইএফের মাধ্যমে বায়ু ও সৌরশক্তিতে মোট প্রায় ৭০০ মিলিয়ন ইউরোর বিনিয়োগ করা হবে। এর ফলে ৭৫০ মেগাওয়াট পর্যন্ত নতুন নবায়নযোগ্য বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা তৈরি হবে, গ্রিডের সক্ষমতা ও বিকেন্দ্রীকরণ উন্নত হবে এবং একই জমিতে শক্তি ও কৃষি এবং ব্যাটারি এনার্জি স্টোরেজ সিস্টেমের মতো উদ্ভাবনী ক্ষেত্রগুলোকে উৎসাহিত করা হবে।
অনুষ্ঠানে বাংলাদেশে ইইউ প্রতিনিধিদলের কো-অপারেশন প্রধান মিশাল ক্রেজা স্বাগত বক্তব্য দেন।
এ সময় বিদ্যুৎ বিভাগের অতিরিক্ত সচিব (পরিকল্পনা) নূর আহমেদ উল্লেখ করেন, সরকার, ইউরোপীয় ইউনিয়ন, ইউরোপীয় ইনভেস্টমেন্ট ব্যাংক এবং টিম ইউরোপের মধ্যকার এই সহযোগিতা একটি পরিচ্ছন্ন, নিরাপদ এবং শক্তিশালী জ্বালানি ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করার সম্মিলিত অঙ্গীকারকে প্রতিফলিত করে।
তিনি বলেন, প্রয়োজনীয় বিনিয়োগ, বিশেষজ্ঞ জ্ঞান এবং কারিগরি সহায়তা জোগাড় করতে এই ধরনের সহযোগিতা অপরিহার্য।
ইআইবির দক্ষিণ এশিয়ার আঞ্চলিক প্রতিনিধি মাইকেল স্টিডল বলেন, বাংলাদেশের স্বল্প-কার্বন জ্বালানি ভবিষ্যতের যাত্রায় সমর্থন দিতে পেরে ইআইবি গর্বিত। তিনি বলেন, বাংলাদেশ রিনিউয়েবল এনার্জি ফ্যাসিলিটি হলো দেশের গ্রিন এনার্জি রূপান্তরের একটি ভিত্তিপ্রস্তর। এর কারিগরি সহায়তা অংশটি বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ; এটি নিশ্চিত করে যে প্রকল্পগুলো যথাযথভাবে প্রস্তুত, বিনিয়োগযোগ্য এবং উচ্চতর কারিগরি, পরিবেশগত ও সামাজিক মানদণ্ডসম্পন্ন।
বাংলাদেশে নিযুক্ত জার্মান রাষ্ট্রদূত ড. রুয়েডিগার লোটস বলেন, বাংলাদেশ রিনিউয়েবল এনার্জি ফ্যাসিলিটি হলো বাংলাদেশ সরকার, ইউরোপীয় ইউনিয়ন এবং এর সদস্য দেশগুলোর মধ্যে, বিশেষ করে জার্মানির জন্য জ্বালানি খাতে একটি যুগান্তকারী সহযোগিতা।
তিনি বলেন, ‘আমি আপনাদের সৌর, বায়ু এবং অন্যান্য নবায়নযোগ্য জ্বালানি উৎসগুলোর শক্তি কাজে লাগাতে সাহসের সঙ্গে এগিয়ে যাওয়ার জন্য আন্তরিকভাবে উৎসাহিত করি।’
অনুষ্ঠানে বিআরইএফ এবং এর কারিগরি সহায়তা প্রকল্পের ওপর একটি উপস্থাপনা পেশ করা হয়। এটি বৃহৎ পরিসরে নবায়নযোগ্য জ্বালানি বিনিয়োগ ত্বরান্বিত করতে এবং বাংলাদেশের জলবায়ু বিষয়ক অঙ্গীকারগুলো পূরণে সহায়তা করার জন্য তৈরি করা হয়েছে।
জিওপিএ টেকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক এবং কারিগরি সহায়তা কনসালটেন্ট কনসোর্টিয়ামের লিড পার্টনার ড. আন্দ্রেয়াস ওয়াইস বলেন, বিআরইএফের কারিগরি সহায়তা প্রদানকারী কনসোর্টিয়ামের লিড পার্টনার হিসেবে বাংলাদেশের টেকসই জ্বালানি ভবিষ্যতের উচ্চাভিলাষী যাত্রায় সহায়তা করতে পেরে জিওপিএ টেক গর্বিত।
তিনি বলেন, বিআরইএফ-টিএ-এর মাধ্যমে আমরা হাতেকলমে বিশেষজ্ঞ জ্ঞান এবং ব্যবহারিক সমাধান প্রদান করতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ, যা প্রকল্পগুলোকে বিনিয়োগযোগ্য করতে, উদ্ভাবন বাড়াতে এবং প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা শক্তিশালী করতে সাহায্য করবে।