নৌপথে আসন্ন ঈদযাত্রাকে কেন্দ্র করে অতিরিক্ত ভাড়া আদায়ের বিরুদ্ধে কঠোর হুঁশিয়ারি দিয়েছেন নৌপরিবহনমন্ত্রী শেখ রবিউল আলম। তিনি বলেছেন, অনুমোদিত ভাড়ার বাইরে এক টাকাও বেশি নেওয়া হলে সংশ্লিষ্ট নৌযানের রুট পারমিট ও লাইসেন্স বাতিলসহ মালিক-চালকের বিরুদ্ধে কঠোর আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
বৃহস্পতিবার (২৬ ফেব্রুয়ারি) দুপুরে নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের সভাকক্ষে নৌপরিবহন, সড়ক পরিবহন ও সেতু এবং রেলপথ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বপ্রাপ্ত মন্ত্রীর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত প্রস্তুতিমূলক সভায় এ নির্দেশনা দেওয়া হয়।
মন্ত্রী বলেন, ঈদকে কেন্দ্র করে নৌপথে যাত্রীচাপ বহুগুণ বৃদ্ধি পায়। এ সময় যাত্রীদের নিরাপদ, সুশৃঙ্খল ও নির্বিঘ্ন যাতায়াত নিশ্চিত করা সরকারের অগ্রাধিকার। তিনি জানান, বিআইডব্লিউটিএ অনুমোদিত ভাড়ার তালিকা সব নদীবন্দর, টার্মিনাল, ঘাট ও নৌযানে দৃশ্যমানভাবে প্রদর্শন নিশ্চিত করতে হবে।
তিনি স্পষ্ট করে বলেন, লঞ্চে অতিরিক্ত যাত্রী বা মালামাল বহন সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ থাকবে এবং কোনোভাবেই ছাদে যাত্রী ওঠানো যাবে না। অতিরিক্ত ভাড়া আদায় বা অতিরিক্ত যাত্রী-মালামাল বহনের অভিযোগ প্রমাণিত হলে রুট পারমিট ও লাইসেন্স বাতিলসহ সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে। এ লক্ষ্যে ফেরিঘাট, লঞ্চঘাট ও স্পিডবোট ঘাটে নিয়মিত ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করা হবে।
নৌদুর্ঘটনা প্রতিরোধে ১৬ মার্চ থেকে ২৫ মার্চ পর্যন্ত দিনরাত সার্বক্ষণিক বালুবাহী বাল্কহেড ও ডিঙি নৌকা চলাচল বন্ধ থাকবে। রাতের বেলায় স্পিডবোট চলাচল নিষিদ্ধ থাকবে এবং দিনের বেলায় যাত্রীদের লাইফ জ্যাকেট পরা নিশ্চিত করতে কঠোর নজরদারি থাকবে।
১৭ মার্চ থেকে ২৪ মার্চ পর্যন্ত নিত্যপ্রয়োজনীয় ও দ্রুত পচনশীল পণ্যবাহী ট্রাক ছাড়া সাধারণ ট্রাক ও কাভার্ড ভ্যান ফেরিতে পারাপার বন্ধ রাখা হবে, যাতে যাত্রী পরিবহন নির্বিঘ্ন রাখা যায়।
ঢাকার জিরো পয়েন্ট থেকে সদরঘাট পর্যন্ত সড়ক ১৫ রমজান থেকে ঈদের পর তৃতীয় দিন পর্যন্ত যানজটমুক্ত রাখতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। সদরঘাট এলাকায় ট্রাফিক পুলিশ, নৌপুলিশ, আনসার ও কমিউনিটি পুলিশ সমন্বিতভাবে দায়িত্ব পালন করবে।
অভ্যন্তরীণ নৌপথে ফিটনেসবিহীন নৌযান ও ফেরি চলাচল নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয়েছে। নির্ধারিত সময়সূচি অনুযায়ী নৌযান চলাচল নিশ্চিত করতে বলা হয়েছে এবং সিরিয়াল ভঙ্গ বা অনিয়মের ক্ষেত্রে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে। নদীর মাঝপথ থেকে যাত্রী ওঠানো বন্ধে কঠোর নজরদারি থাকবে।
নৌপথে ডাকাতি, চাঁদাবাজি ও যাত্রী হয়রানি প্রতিরোধে বিশেষ করে রাতের বেলায় টহল জোরদার করা হবে।
যাত্রী নিরাপত্তা জোরদারে ১৫ রমজান থেকে ঈদের পর তৃতীয় দিন পর্যন্ত প্রতিটি লঞ্চে ন্যূনতম চারজন আনসার সদস্য মোতায়েন থাকবে। জেলা প্রশাসন, উপজেলা প্রশাসন, জেলা পুলিশ, নৌপুলিশ ও কোস্টগার্ডের সমন্বয়ে ঘাটভিত্তিক ভিজিল্যান্স টিম গঠন করা হবে। পাশাপাশি কেন্দ্রীয়ভাবে মনিটরিং টিম গঠন করে সার্বিক পরিস্থিতি তদারকি করা হবে।
দুর্ঘটনা মোকাবেলায় উদ্ধারকারী নৌযান প্রস্তুত রাখা এবং গুরুত্বপূর্ণ নদীবন্দরে ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সকে সর্বোচ্চ প্রস্তুত থাকার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। প্রয়োজনে ভাসমান নৌ-ফায়ার স্টেশন স্থাপন করা হবে।
চাঁদপুরের মেঘনা ও ডাকাতিয়া নদীর মোহনায় ঘূর্ণাবর্ত এলাকা চিহ্নিতকরণসহ অন্যান্য নৌরুটে নাব্য চ্যানেল মার্কিং নিশ্চিত করা হবে। সব নৌচ্যানেল ও ফেরি রুট সচল রাখতে প্রয়োজনীয় খনন, পন্টুন স্থাপন ও ঘাট উন্নয়ন জোরদার করা হবে।
যাত্রীসেবা উন্নয়নের অংশ হিসেবে নদীবন্দর ও টার্মিনালে পানীয় জল, স্যানিটেশন, মোবাইল চার্জিং, ব্রেস্ট ফিডিং কর্নারসহ নারী, শিশু ও প্রতিবন্ধী যাত্রীদের জন্য বিশেষ সুবিধা নিশ্চিত করা হবে। সদরঘাটসহ সব নদীবন্দর পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখা এবং ধূমপান নিয়ন্ত্রণে সচেতনতামূলক কার্যক্রম জোরদার করা হবে।
ঈদ উপলক্ষে ঢাকা ও গাজীপুর মহানগর এলাকায় গার্মেন্টস ও নিটওয়্যার খাতের শ্রমিকদের পর্যায়ক্রমে ছুটি দেওয়ার অনুরোধ জানানো হয়েছে, যাতে একযোগে অতিরিক্ত যাত্রীচাপ সৃষ্টি না হয়। লঞ্চ ও ফেরিঘাট থেকে দেশের অভ্যন্তরে যাত্রীদের যাতায়াত সহজ করতে বিআরটিসির ফিডার বাস সার্ভিস চালুর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
মন্ত্রী বলেন, ঈদযাত্রায় কোনো ধরনের অনিয়ম বা বিশৃঙ্খলা সহ্য করা হবে না। জরুরি প্রয়োজনে জাতীয় জরুরি সেবা ৯৯৯ এবং যাত্রীসেবা সংক্রান্ত বিষয়ে বিআইডব্লিউটিএ’র হটলাইন ১৬১১৩ নম্বরে যোগাযোগ করতে অনুরোধ জানানো হয়েছে।
সভায় সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী, সচিব, ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা, অধীন দপ্তর ও সংস্থার প্রধান এবং জেলা প্রশাসন, বাংলাদেশ পুলিশ, কোস্টগার্ড, নৌপুলিশ ও ফায়ার সার্ভিসের প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন।